পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার বুক চিরে বয়ে গেছে সন্ধ্যা নদী। কাউখালীর আমড়াজুড়ি ইউনিয়নকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছে এ নদী। ইউনিয়নের ৬টি ওয়ার্ড নদীর পশ্চিম পাশে, একটি উত্তর পাড়ে ও পূর্ব পাড়ে রয়েছে দুইটি ওয়ার্ড। এরমধ্যে ৫ নম্বর ওয়ার্ডটি ফেরিঘাট, সরকারি রাস্তা, বাজার, মাদরাসা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ অংশ নিয়ে গঠিত।

ভাঙনে আমড়াজুড়ি এলাকাটি হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত স্থায়ী নদী রক্ষাবাঁধ না দেওয়া হলে যতটুকু নদীতে বিলীন হওয়া বাকি আছে খুব শিগগির ততটুকু বিলীন হয়ে যাবে। এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, আমড়াজুড়ির অবস্থান সন্ধ্যা নদীর মোহনায় হওয়ায় পানির চাপে মানছে না কোনো কিছুই। যার কারণে জিওব্যাগ স্থাপন করেও সমাধান হয়নি। কাজের অনুমতি পেলে দ্রুত এ ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সন্ধ্যা নদীর আমড়াজুড়ি ফেরিঘাট এলাকাটি নদীর মোহনায় অবস্থান করায় প্রতিনিয়ত একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে নদীগর্ভে। জমির মালিকগণ নতুন করে বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হারানোর শঙ্কায় ভুগছেন। রাস্তা, ঘাট এলাকা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এই ভাঙনের কারণে অনেকটা বিলীন হয়ে গেছে। যেটুকু বাকি আছে সেটুকু নিয়ে নদীরক্ষা বাঁধের আশায় বুক বাঁধছেন ভাঙনকবলিত এলাকাবাসী।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, আমড়াজুড়ি এলাকাটির ৫০ মিটার দৈর্ঘ্যজুড়ে বন্যার কারণে নদীতীর ভাঙনের মুখে পড়ে। পরে সেখানে তীর রক্ষার্থে জিওব্যাগ ফেলে অস্থায়ীভাবে নদীতীর প্রতিরক্ষামূলক কাজ সম্পন্ন করা হয়। জায়গাটি ভাঙনের পরে পরিদর্শন শেষে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন শাহ আলম জানান, আমড়াজুড়িবাসী দীর্ঘদিন ধরে নদী ভাঙনের কবলে পড়ে আছে। আমাদের ৭০/৭৫ টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নদী ভাঙনের কবলে। আমরা চাই সরকার আমাদের দিকে এই বিষয়টিতে নজর দিক। আমরা স্থায়ী বাঁধ পেলে একটু ভালো থাকতে পারি।

স্থানীয় দোকানদার ইকবাল হোসেন তালুকদার জানান, আমাদের এখানে প্রচণ্ড নদী ভাঙন চলছে। মাস ছয়েক আগে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড এখানে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করেছিল। সেটা টেকেনি এবং ভেঙে নেমে গেছে। আমাদের এখানে যদি স্থায়ী বাঁধ না দেওয়া হয় সব নদীগর্ভে হারিয়ে যাবে। এখানে স্কুল, মাদরাসা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, কলেজ, মসজিদ-মন্দির ও ফেরিঘাট রয়েছে। ৩/৪টি গ্রামের সংযোগস্থল সড়ক ও জনপথের সরকারি রাস্তাটি সেটিও ভাঙনের মুখে।

এলাকাবাসী আব্দুল মন্নান জানান, এই পর্যন্ত ৫০/৬০ ঘর নেমে গেছে। আমাদের দোকান ছিল প্রায় নদীর মাঝখানে। দোকানের জায়গা পরিবর্তনের পরেও দোকান টিকিয়ে রাখতে পারি নাই। পানি উন্নয়ন বোর্ড বস্তা ফেলেছিল সেগুলো ভেসে গেছে। এখন আমরা যেভাবে থাকতে পারি সেই ব্যবস্থাটুকু করে দেন।

দোকানদার শামিম হোসেন বাবু জানান, নদী ভাঙন থেকে বাঁচতে দোকান সরাতে সরাতে এখন দোকান সরানোর জায়গা নাই। নদী ও রাস্তার ভাঙন ঠেকাতে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার, চেয়ারম্যানরা নদীতীরে বাঁধের ব্যবস্থা করেছিলেন সেটাও চলে গেছে। সরকারি রাস্তাটির মাধ্যমে ঝালকাঠিসহ বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে আমাদের সংযোগ। এই রাস্তাটি বিলীন হলে অনেক মানুষ পথে বসে যাবে, তাদের আয়ের আর কোনো জায়গা থাকবে না।

নদী ভাঙনের কবলে পড়া জমির মালিক হিরেন লাল মৃধা জানান, আমার আড়াই কাঠা জমি নদীগর্ভে গেছে। নিজের বেশির ভাগ জমি নেমে গেছে, বাকি আছে অল্প একটু। স্থানীয় বাজারের জন্য দান করা শিশির প্রফেসরের এক বিঘার ওপরে জমি নদী ভাঙনে হারিয়ে গেছে। নদীরক্ষা বাঁধ হলে স্থানীয় জমিগুলো নদীগর্ভে যাওয়া থেকে রক্ষা পাবে।

দোকানি এনায়েত তালুকদার জানান, দোকানপাট যা নেমে গেছে সেগুলোতো হারিয়েই গেছে। যেগুলো বাকি আছে সেগুলো নেমে যাওয়ার পথে। পাড়ে দোকান দেওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনেকবার বলা হয়েছে কোনো কাজ হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ড দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এলাকাই বিলীন হয়ে যাবে।

স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান জানান, আমড়াজুড়ি ঘাট এলাকাটি ২০২১ সালের বন্যায় ৫০ মিটারজুড়ে নদীতীর ভাঙনের মুখে পড়ে। পরবর্তীতে সেখানে নদীতীর রক্ষার্থে জিওব্যাগ ফেলে তীর প্রতিরক্ষামূলক কাজ সম্পন্ন করা হয়। পরে পানির চাপে ও ঢেউয়ের কারণে তীরটি আবার ভেঙে নেমে যায়। জায়গাটি ভাঙনের পরে পরিদর্শন শেষে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দেওয়া হয়।

এমএসআর