বাজেট সাপোর্টে বিশ্বব্যাংকের কাছে আরও ঋণ চাইলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। রোববার (৫ ডিসেম্বর) রাজধানীর হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট হার্টউইগ শ্যেফারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সভায় এ ঋণ চান তিনি। 

সভায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান, অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব অংশ নেন। এতে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেন অর্থমন্ত্রী এবং বিশ্বব্যাংকের পক্ষে নেতৃত্ব দেন হার্টউইগ শ্যেফার। 

বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্সি মিয়াং টেম্বন, বিশ্বব্যাংকের আঞ্চলিক পরিচালক (দক্ষিণ এশিয়া) যৌবিদা খেরুস আলাউয়া, সেশিলে ফ্রুমান, দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সংযুক্তি ও সহযোগিতাবিষয়ক কর্মকর্তা সভায় উপস্থিত থেকে আলোচনায় অংশ নেন।

বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট হার্টউইগ শ্যেফারকে বাংলাদেশ সফরের জন্য ধন্যবাদ জানান অর্থমন্ত্রী। বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের অব্যাহত সহযোগিতার জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। 

অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের রফতানি আয় ২৪ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৫ থেকে ৪৬ বিলিয়ন ডলার, ঋণ-জিডিপির অনুপাত এখনো ৪০ শতাংশের নিচে রয়েছে। মূল্যস্ফীতি বিশ্বের অন্য সব দেশের মতো বাংলাদেশে বাড়লেও এখনও ৬ শতাংশের নিচে রয়েছে। রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে প্রায় ১৭ শতাংশ। খেলাপি ঋণ ৮ দশমিক ১ শতাংশে নেমে এসেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারে ঋণস্থিতি বেড়েছে প্রায় ৯ দশমিক ৫ শতাংশ। ব্যাংকের ঋণের সুদের হার ৭ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। 

তিনি বলেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ভিত যথেষ্ট মজবুত রয়েছে। করোনা পরবর্তী পরিস্থিতিতে এমন অর্থনৈতিক সক্ষমতা ধরে রাখা বিরল। 

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৩৮ বছরের মাথায় ১০০ বিলিয়ন ডলার জিডিপির মাইলফলক স্পর্শ করে। আর স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির অব্যবহিত পূর্বে বাংলাদেশ আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় ও সাহসী নেতৃত্বে মাত্র ১২ বছরের মাথায় তা চারগুণ বেড়ে ৪১১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে গিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দূরদর্শী নেতৃত্বে অর্থনীতি যে কোভিড-১৯ মোকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, এর জন্য সবচেয়ে বড় কৃতিত্বের অধিকারী দেশের সাধারণ মানুষ, যারা অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট হার্টউইগ শ্যেফার কোভিড-১৯ থেকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় ভালো করছে এবং কোভিড মোকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
 
ঢাকাকে অধিকতর নান্দনিক শহরে রূপ দেওয়া এবং এতে যোগাযোগ সহজীকরণের লক্ষ্যে আহ্বান করা ফ্ল্যাগশিপ প্রজেক্টের অগ্রগতি সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী জানতে চাইলে হার্টউইগ শ্যেফার বলেন, প্রকল্পের আশানুরূপ অগ্রগতি রয়েছে। অচিরেই এ বিষয়ে সুখবর পাওয়া যাবে।

প্রচলিত নিয়মে প্রকল্পের বিপরীতে ঋণ দেওয়ার কারণে অনেক সময় দেখা যায় যে, প্রকল্প প্রস্তুত থাকে না এবং সেগুলো প্রস্তুত করতে কালক্ষেপণ হয়ে মন্থর গতি তৈরি হয়। এ মন্থর গতি থেকে উত্তরণের জন্য অর্থমন্ত্রী বিশ্বব্যাংককে অনুরোধ করেন, যাতে বাজেট সাপোর্ট আকারে প্রকল্প ঋণ দেওয়া হয়, তাহলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেসব প্রকল্প প্রস্তুত আছে, সেসব প্রকল্পের জন্য অর্থছাড় করা সম্ভব হবে এবং প্রকল্পের গতি ত্বরান্বিত হবে।

চলমান করোনা অতিমারিজনিত কারণে দেশের ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমবাজার, আর্থিক ও সামাজিক খাত সচল রাখার লক্ষ্যে বর্তমান ২০২১-২০২২ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের প্রোগ্রামেটিক রিকভারি অ্যান্ড রেসাইলেন্স ডেভেলপমেন্ট পলিসি ক্রেডিট প্রকল্পের আওতায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বাজেট সাপোর্ট হিসাবে দ্রুত ছাড়করণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিশ্বব্যাংককে অনুরোধ করা হয়েছে। এ প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় শর্তাবলীর অধিকাংশই ইতোমধ্যে পূরণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট শর্তাবলীও সহসাই পূরণ করা সম্ভব হবে মর্মে অর্থসচিব সভাকে অবহিত করেন।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব বলেন, করোনা পরিস্থিতির ভেতরেও চলমান অনেক প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যাদি সভায় তুলে ধরেন। ২০২১-২০২২ অর্থবছরে পাইপলাইনভুক্ত বিভিন্ন প্রকল্প প্রকিয়াকরণ, অনুমোদন ও সইকরণের অগ্রগতি বিষয়ে তিনি সভায় আলোচনা করেন এবং এক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি আইডি-১৮ এর আওতায় বাংলাদেশ কোর আইডি থেকে পাঁচ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং স্কেল আপ ফ্যাসিলিটি থেকে আরও দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সক্ষমতা দেখিয়েছে, যা আইডিএভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে একক সর্বোচ্চ পরিমাণ। চলমান করোনা পরিস্থিতিতে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সক্ষমতা প্রদর্শন করায়, বাংলাদেশকে বিগত বছরগুলোর তুলনায় আইডিএ ১৯ ও আইডিএ ২০ এর আওতায় কোর আইডিএ থেকে অন্তত আরও ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দের অনুরোধ করেন।

হার্টউইগ শ্যেফার প্রকল্প ডিজাইন, প্রসেসিং, অনুমোদন ও বাস্তবায়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে আরও গতিশীলতা আনয়নের জন্য সুপারিশ করেন। তিনি এ লক্ষ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও বিশ্বব্যাংকের সমন্বয়ে যথাসময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে সভায় প্রস্তাব পেশ করেন।  

অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য দ্রুত ঋণ মঞ্জুরের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হার্টউইগ শ্যেফারের সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি যথাসময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণের ক্ষেত্রে সরকার ও বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতার উপর গুরুত্বরোপ করেন। তিনি আগামীতে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় বিশ্বব্যাংকের অব্যাহত সহযোগিতার জন্য আহ্বান জানান।

এসআর/আরএইচ