এয়ার ট্রান্সশিপমেন্টের অনুমতি না থাকায় প্রতি বছর শত কোটি টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশ / ফাইল ছবি

এয়ার ট্রান্সশিপমেন্টের অনুমতি নেই বাংলাদেশের। এ কারণে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় কোনো দেশে আকাশপথে পাঠানো যায় না কোনো পণ্য। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও নীতিমালা না থাকায় হাত ফসকে যাচ্ছে শত শত কোটি টাকা, আয় বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশের এয়ারলাইন্সগুলো।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যে পরিমাণ জায়গা আর জনবল রয়েছে তা দিয়েই ট্রান্সশিপমেন্ট কার্গোর মাধ্যমে অতিরিক্ত আয় সম্ভব। তবে অদৃশ্য কারণে বাংলাদেশ এখনও এয়ার ট্রান্সশিপমেন্ট ব্যবস্থার অনুমোদন পায়নি।

এয়ার ট্রান্সশিপমেন্ট কার্গো বলতে প্রতিবেশী দেশ বা অন্য একটি দেশ থেকে কার্গোবোঝাই পণ্য তৃতীয় কোনো দেশে পরিবহনের প্রক্রিয়া বোঝায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট দিল্লিতে গেল। দিল্লি থেকে ঢাকায় আসার সময় সেই ফ্লাইটে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে পাঠানো কার্গোপণ্য নিয়ে এলো। বাংলাদেশ থেকে বিমানের যে ফ্লাইটটি সিঙ্গাপুর যাবে, সেই ফ্লাইটে ওই পণ্যগুলো পাঠিয়ে দেওয়াই হলো এয়ার ট্রান্সশিপমেন্ট।

দুবাই রুটের কোনো ফ্লাইট দুবাই থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিলে শুধু ঢাকার জন্যই কার্গোপণ্য পরিবহন করতে পারে। অথচ তারা চাইলে ফ্লাইটের অবশিষ্ট জায়গায় পার্শ্ববর্তী দেশ অথবা ঢাকার সঙ্গে যেসব দেশের ফ্লাইট রয়েছে সেসব দেশের পণ্যগুলো বহন করতে পারে। কিন্তু অনুমতি না থাকায় জায়গা থাকা সত্ত্বেও পণ্য পরিবহন করতে পারছে না অনেক ফ্লাইট

বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশ পয়েন্ট টু পয়েন্ট কার্গোপণ্য পরিবহনের সুযোগ পায়। অর্থাৎ দুবাই রুটের কোনো ফ্লাইট দুবাই থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিলে শুধুমাত্র ঢাকার জন্যই কার্গোপণ্য পরিবহন করতে পারে। অথচ তারা চাইলে ফ্লাইটের অবশিষ্ট জায়গায় পার্শ্ববর্তী দেশ অথবা ঢাকার সঙ্গে যেসব দেশের ফ্লাইট রয়েছে সেসব দেশের পণ্যগুলো বহন করতে পারে। কিন্তু অনুমতি না থাকায় জায়গা থাকা সত্ত্বেও পণ্য পরিবহন করতে পারছে না অনেক ফ্লাইট।

অদৃশ্য কারণে বাংলাদেশ এখনও এয়ার ট্রান্সশিপমেন্ট ব্যবস্থার অনুমোদন পায়নি, বলছেন সংশ্লিষ্টরা / ফাইল ছবি

বাংলাদেশে বর্তমানে দুটি দেশীয় এয়ারলাইন্স আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করছে। একটি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, অপরটি হচ্ছে বেসরকারি মালিকানার ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। বর্তমানে ইউএস-বাংলার বহরে ১৬টি এবং বিমানের বহরে রয়েছে ২১টি এয়ারক্রাফট।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে থাকা এয়ারক্রাফটগুলোর মধ্যে বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর, বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার ও বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার রয়েছে। এগুলো দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ বেশ কয়েকটি রুটে ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ ফ্লাইটে প্রবাসীকর্মীরা যাত্রী হিসেবে যান। বাংলাদেশ থেকে যত প্রবাসী বিদেশে যান সেই তুলনায় দেশে ফেরার সংখ্যা অনেক কম থাকে। দেশে ফেরা অধিকাংশ ফ্লাইট মোট আসনের ৩০ থেকে ৪০ ভাগ যাত্রী নিয়ে আসে। বাকি আসনগুলো ফাঁকা থাকে। যাত্রী না থাকায় থাকে না পর্যাপ্ত ব্যাগেজ। ফলে উড়োজাহাজের লাগেজ চেম্বারের অধিকাংশ জায়গা থাকে ফাঁকা। এই ফাঁকা জায়গায় এয়ার ট্রান্সশিপমেন্টের পণ্য এনে আয় বাড়ানোর ‍সুযোগ ছিল। কিন্তু অনমতি নেই বলে এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এয়ারলাইন্সগুলো। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব দেশের বিমানবন্দরগুলো বিশ্বের বড় বড় ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে পরিণত হয়েছে তাদের চেয়ে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অনেক ভালো। অল্পকিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলে বাংলাদেশও ট্রান্সশিপমেন্টের বড় হাবে পরিণত হতে পারে

নাম প্রকাশ না করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এক কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিমানের বহরে থাকা ড্রিমলাইনারসহ বেশ কয়েকটি উড়োজাহাজের কার্গো ক্যাপাসিটি অনেক বেশি। বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর প্রায় ১৮ টন এবং বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার প্রায় ২৫ টন পণ্য বহন করতে পারে। গত এক মাসে গড়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে ফিরতি ফ্লাইটে মাত্র ৪০-৪৫ ভাগ সিটে যাত্রী ছিল। যাত্রীদের জিনিসপত্র রাখার চেম্বার প্রায় পুরোটাই ছিল ফাঁকা। প্রতিদিন এভাবে স্পেস ফাঁকা নিয়ে দেশে ফিরছে ফ্লাইটগুলো।

বিমান বাংলাদেশের পাশাপাশি দেশীয় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করছে / ছবি- সংগৃহীত

একই অবস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সেরও। এয়ারলাইন্সটি বর্তমানে ঢাকা থেকে কলকাতা, চেন্নাই, মালে, মাস্কাট, দোহা, দুবাই, কুয়ালালামপুর, সিঙ্গাপুর রুটে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করছে। ফিরতি পথে অল্প সংখ্যক যাত্রী পেলেও কার্গো ক্যাপাসিটি কাজে লাগাতে পারছে না তারা।

ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হয়ে শত কোটি আয় করছে বিশ্বের অনেক বিমানবন্দর

বিশ্বে বর্তমানে এয়ার ট্রান্সশিপমেন্ট কার্গোর হাব হিসেবে বছরে শত শত কোটি টাকা আয় করছে বেশ কয়েকটি বিমানবন্দর। সেই তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মেমফিস ইন্টারন্যাশনাল বিমানবন্দর, হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, প্যারিসের শার্ল দ্য গল বিমানবন্দর, জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দর, লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর, নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামের স্কিফুল বিমানবন্দর ও ইউরোপের লুক্সেমবার্গ বিমানবন্দর।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব দেশের বিমানবন্দরগুলো বিশ্বের বড় বড় ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে পরিণত হয়েছে তাদের চেয়ে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অনেক ভালো। অল্পকিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলে বাংলাদেশও ট্রান্সশিপমেন্টের বড় হাবে পরিণত হতে পারে। ভারত থেকে বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ট্রান্সশিপমেন্ট কার্গোর মাধ্যমে তৃতীয় দেশের জন্য পণ্য আসছে। সুনির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনা করলেই আকাশপথেও এই ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব। এতে বাংলাদেশের এয়ারলাইন্সগুলো শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারবে।

সুযোগ পেলে সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর, ব্যাংককের মতো ডেস্টিনেশন থেকে সহজেই পণ্য আনা-নেওয়া করা যায়, বলছেন সংশ্লিষ্টরা / ছবি- সংগৃহীত

যেভাবে লাভবান হবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের কাজ করছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা কার্গোপণ্যের ব্যবস্থাপনাসহ লাগেজ হ্যান্ডেলিংয়ের দায়িত্ব তাদের। যদি এয়ার ট্রান্সশিপমেন্ট কার্গো চালু হয় সেক্ষেত্রে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজস্ব বাড়বে বিমানের। এছাড়া ঢাকা থেকে বর্তমানে ১৭টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে যাচ্ছে বিমানের ফ্লাইটগুলো। সেসব রুটে যদি ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে পণ্য পৌঁছানো যায় তাহলে দিগুণ রাজস্ব আসবে।

এ বিষয়ে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পুরো সময় একটা এয়ারলাইন্সের জন্য অফ সিজন। এ সময় যাত্রী পাওয়া যায় না বললেই চলে। উইন্টারকে পিক সিজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে সিজন বা অফ সিজন যা-ই থাকুক না কেন সারা বছর প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় একই থাকে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের অন্যতম সুযোগ হচ্ছে কার্গো ক্যারি করা। পিক সিজনে আমরা যদি তিন বা চার টন কার্গোপণ্য আনতে পারি, সেক্ষেত্রে অফ-পিক সিজনে আমরা ছয় থেকে আট টন কার্গোপণ্য বহন করতে পারি। সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর, ব্যাংককের মতো ডেস্টিনেশন থেকে আমরা সহজেই পণ্য আনা-নেওয়া করতে পারি। এয়ার ট্রান্সশিপমেন্ট কার্গো সেক্ষেত্রে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে আনবে, অতিরিক্ত রাজস্ব আয়ের সুযোগ বাড়বে।

এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য (কাস্টমস : নিরীক্ষা, আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য) জাকিয়া সুলতানা ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিমানবন্দর ব্যবহার করে ট্রান্সশিপমেন্টের সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি সিভিল এভিয়েশনের এখতিয়ারভুক্ত। আমি যতটুকু জানি, আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো প্রস্তাব আসেনি। প্রস্তাব এলে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট করে কার্গো ট্রান্সশিপমেন্টের দিকে নজর দিতে বলছেন বিশেষজ্ঞরা / ফাইল ছবি

বিশিষ্ট এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের নবগঠিত পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান কাজী ওয়াহিদুল আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, এয়ার ট্রান্সশিপমেন্ট কার্গো বাংলাদেশি এয়ারলাইন্সের জন্য খুবই ভালো একটা সুযোগ। তবে স্থান সংকুলানের কারণে এটি এখনো করা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, বর্তমানে বিমানবন্দরে ডেস্টিনেশন কার্গো (অন্য দেশ থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে আসা পণ্য) রাখার জায়গা হচ্ছে না। কোটি কোটি টাকার সম্পদ রোদে পুড়ে আর বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হচ্ছে। কার্গো ভিলেজ নেই, কার্গো শেড নেই, সুনির্দিষ্ট কার্গো ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম নেই। পৃথিবীর সব দেশের বিমানবন্দরগুলোতে অটোমেটিক কার্গো ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম রয়েছে, আছে ট্র্যাকিং সিস্টেমও। আমাদের সামান্য কার্গো ওয়্যারহাউজ আছে, সেগুলোর চেয়ে বেশি মাল বাইরে পড়ে থাকে।

বিমান বাংলাদেশ একমাত্র গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং এজেন্সি। বিমানের নিজেরই সক্ষমতা নেই। যে কার্গোগুলো দেশে আসে এবং দেশের বাইরে যায়, সেগুলোও আমরা প্রোপারলি হ্যান্ডেল করতে পারি না। আমরা ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট করে কার্গো ট্রান্সশিপমেন্টের দিকে নজর দিতে পারি— বলেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম।

এআর/এমএআর/