পদ্মা সেতু

চলতি বছরের ডিসেম্বরেই পদ্মা বহুমুখী সেতুর সব কাজ শেষ করা হবে। তারপর তিন মাসের মধ্যে অর্থাৎ আগামী বছরের মার্চ মাসে পদ্মা বহুমুখী সেতু চালু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আনুষঙ্গিক সব প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব হলে আগামী বছরের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস বা ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মবার্ষিকীর দিবসে সেতু যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হতে পারে। বাংলাদেশ সেতু বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ সেতু বিভাগের সর্বশেষ তথ্যানুসারে, ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতুর কাজ হয়েছে ৮৪ দশমিক ৫০ শতাংশ। মূল সেতুর কাজ হয়েছে ৯২ দশমিক ৫০ শতাংশ।

সরকার বলেছিল, আগামী বছর জুনের মধ্যে পুরো কাজ শেষ করার পর সেতু যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। পদ্মা নদীর ভাঙন, ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা, নকশা সংশোধন ও করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

পদ্মা সেতুর স্বপ্ন সকলের চোখের সামনে ফুটে গেছে। এটা আমাদের জাতীয় সক্ষমতার প্রকাশ।  সেতু নির্মাণে অবিচল ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার সাহসী নেতৃত্বের সোনালি ফসল দেশের মানুষ দেখতে পাচ্ছে

ওবায়দুল কাদের, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী

মূল সেতুর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ লিমিটেড বলছে, আগামী বছর ২৩ এপ্রিলের মধ্যে মূল সেতুর কাজ শেষ করা সম্ভব হবে। তবে বাংলাদেশ সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে সব কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ রজব আলী বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে সব কাজ শেষ করা হবে। কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকলে কিছুদিন পরীক্ষামূলক চালু করা হবে। তারপর আনুষ্ঠানিকভাবে সেতু চালু করা হবে। এক্ষেত্রে রেলপথ তৈরির কাজও যুক্ত। কারণ একই দিনে ট্রেনও চলাচল করবে। এজন্য সমন্বিতভাবে কাজ করতে হচ্ছে।

জানা গেছে, সেতুর ওপর দিকে যান চলাচলের জন্য দুই হাজার ৯১৭টি কংক্রিটের স্ল্যাবের মধ্যে বসানো হয়েছে ২ হাজার ৪৩টি। দোতলা সেতুর নিচ তলায় রেলপথ বসানো হবে। এজন্য স্ল্যাব বসানো হয়েছে ২ হাজার ৪০১টি। এই মেগা প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে আগামী জুনে। এই মেয়াদ দুই বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে সেতু বিভাগ। অনুমোদন পেলে মেয়াদ বাড়বে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা।

কুয়াশা ভেদ করে বিশ্বের বিস্ময় বাংলাদেশের পদ্মা সেতু সব পাখা মেলে প্রস্ফুটিত হয়েছে। করোনাকালেই পদ্মা সেতুর সর্বশেষ স্প্যান বসানো গত বছরের ১০ ডিসেম্বর। সর্বশেষ স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় সেতুর বড় কাজের ইতি ঘটে। সেদিন বসানো হয়েছে সেতুর ৪১তম স্প্যান। তাতে মাওয়া ও জাজিরা যুক্ত হয়ে গেছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার সঙ্গে সারা দেশের সরাসরি যোগাযোগস্থাপন হলো। তবে এই সেতু চালু করতে এখন বিভিন্ন ধরনের কাজ চলছে।

মূল নদীতে মুন্সিগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে ১২ ও ১৩ নম্বর খুঁটির ওপর বসানো হয়েছে ৪১তম স্প্যান ‘টু-এফ’। বাংলাদেশ সেতু বিভাগের সচিব বেলায়েত হোসেন জানান, আগামী বছর মার্চে পদ্মা সেতু চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এজন্য আমাদের প্রস্তাব থাকবে।

ডিসেম্বরের মধ্যে সব কাজ শেষ করা হবে। কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকলে কিছুদিন পরীক্ষামূলক চালু করা হবে। তারপর আনুষ্ঠানিকভাবে সেতু চালু করা হবে

সৈয়দ রজব আলী, পদ্মা সেতু প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অবশ্য পদ্মা সেতু এলাকায় পরিদর্শন করেছেন ১৭০ বার। তিনি তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন,‘পদ্মা সেতুর স্বপ্ন সকলের চোখের সামনে ফুটে গেছে। এটা আমাদের জাতীয় সক্ষমতার প্রকাশ।  সেতু নির্মাণে অবিচল ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার সাহসী নেতৃত্বের সোনালি ফসল দেশের মানুষ দেখতে পাচ্ছে।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ জানায়, ৪২টি খুঁটির সঙ্গে স্প্যানগুলো জোড়া দেওয়ার মাধ্যমে পুরো সেতু দৃশ্যমান হয়েছে। সেতুর ৪০টি স্প্যান স্থাপনে তিন বছর দুই মাস লেগেছে। পদ্মা সেতুর মূল কাঠামো (স্প্যান) স্টিলের। পদ্মার মূল সেতু অর্থাৎ নদীর অংশের দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। মাওয়া ও জাজিরার দুই পারে চার কিলোমিটার সেতু বা ভায়াডাক্ট নির্মাণ করা শেষ হয়েছে। দোতলা সেতুর স্প্যানের ওপর দিয়ে চলবে সড়ক পরিবহন। সড়কপথ ২২ মিটার চওড়া, চার লেনের। নিচের তলায় চলবে ট্রেন।২০০১ সালের ৪ জুলাই পদ্মা সেতু নির্মাণে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০৪ সালে মাওয়া-জাজিরা প্রান্তে পদ্মা সেতু নির্মাণের পরামর্শ দেয় জাইকা। ২০০৭ সালে একনেকে পাস হয় পদ্মা সেতু প্রকল্প। প্রথমে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। কয়েক দফায় বেড়ে তা হয় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা।

মূল সেতুর কাজ ২০১৪ সালের নভেম্বরে শুরু হয়। এর  কাজ করেছে চীনের চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি। নভেম্বর পর্যন্ত মূল সেতুর ৯১ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। নদীশাসনের কাজও শুরু হয় ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে। কাজ করছে সিনোহাইড্রো করপোরেশন। নভেম্বর পর্যন্ত নদীশাসনের কাজ হয়েছে ৭৬ শতাংশ। দুই পাড়ে সংযোগ সড়ক, টোল প্লাজা ও অবকাঠামো নির্মাণের কাজ বহু আগে শেষ হয়ে গেছে।

পিএসডি/ওএফ