গত পাঁচ দিনে শৈশব পাড়ি দিয়ে কৈশোরে পা দিয়েছে এবারের অমর একুশের বইমেলা। করোনার ভয়ে শুরু থেকেই মেলায় বয়োবৃদ্ধদের উপস্থিত কম। তবে শিক্ষার্থী ও তরুণ-তরুণীদের পদচারণায় অনেকটা মুখরিত মেলা প্রাঙ্গণ। তাদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তরুণ প্রজন্মের লেখকদের বই ও তাদের অটোগ্রাফ সংগ্রহ। সোমবার (২২ মার্চ) প্রাণের মেলার পঞ্চম দিনেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। 

এদিন মেলায় অংশ নিতে নারায়ণগঞ্জ থেকে এসেছে মোবারক হোসেন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা। দল বেঁধে প্রবেশ করে তারা ঘুরে বেড়িয়েছে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ। কিনেছে নিজের পছন্দের লেখকের অটোগ্রাফসহ বই।  

এবার মেলার উদ্বোধনী দিনেও অনেক স্টল ও প্যাভিলিয়নের কাজ শেষ হয়নি। গত পাঁচ দিনে সেই ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর হয়েছে। সুসজ্জিত ও বিকশিত হয়েছে মেলার সৌন্দর্য। অন্যদিকে করোনার কারণে মেলা প্রথম দুই দিন খুব বেশি না জমলেও একেবারেই থেমে ছিল না গ্রন্থানুরাগীদের আনাগোনা। ধীরে ধীরে বাড়ছে ক্রেতা-দর্শনার্থীর পদচারণা। গল্প-কবিতা কিংবা উপন্যাসের সঙ্গে গড়ে উঠছে পাঠকের সখ্য। কেউ বা ঢুঁ মারছেন প্রবন্ধ, ইতিহাস বা রাজনীতিবিষয়ক মননশীল বইয়ের জগতে। তাইতো স্বল্প পাঠকের আগমনেও স্নিগ্ধতা ছড়াচ্ছে প্রাণের মেলা।

সাব্বির আহমেদ, তন্ময় হালদার, সৌরভ শিকদার ও পার্থ ভট্টাচার্য নামের চার তরুণ জানায়, করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অলস সময় কাটছে। তবে আজ বইমেলার কারণে আলস সময়টিই হয়ে উঠেছে সুসময়। শিক্ষকরাই তাদের নিয়ে এসেছেন মেলায়, ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন পুরো মেলা প্রাঙ্গণ।

কী কী বই সংগ্রহ করলেন? জানতে চাইলে সৌরভ বলেন, সায়েন্স ফিকশনের বই পড়তে আমার ভালো লাগে। তাই মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘বনবালিকা’ নামের বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী কিনেছি। অন্যদের মধ্যে কেউ কিনেছেন হরিশংকর জলদাসের ‘প্রান্তজনের গল্প’, আনিসুল হকের কাব্যগ্রন্থ ‘তুই কি আমার দুঃখ হবি’, আফসান চৌধুরী সম্পাদিত ‘মুজিবনগর: কাঠামো ও কার্যবিবরণ’সহ বিভিন্ন গদ্য-পদ্য ও প্রবন্ধগ্রন্থ।

এ চার বন্ধুর মতোই এখন বইমেলায় সরব উপস্থিতি জানান দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজপড়ুয়াদের আনাগোনায় মুখর মেলা প্রাঙ্গণ। পাঠক বা দর্শনার্থী হিসেবে তারাই রাঙিয়ে তুলেছে মেলা। আড্ডা থেকে বইয়ের বিকিকিনি সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছেন তারা।

মেলায় অংশগ্রহণকারী তাম্রলিপি প্রকাশনীর প্রকাশক তারিকুল ইসলাম রনি বলেন, আমাদের প্যাভিলিয়নে যত বই বিক্রি হচ্ছে তার বেশিরভাগই সংগ্রহ করছে শিক্ষার্থীরা। সৃজনশীল থেকে মোটিভেশনাল সব ধরনের বইয়ে তাদের ঝোঁক রয়েছে। আর কেউ কেউ বই না কিনলেও গল্প-আড্ডায় মেলা প্রাঙ্গণ মাতিয়ে রাখছে। মহামারির এই অসময়ে মেলায় পেশাজীবী মানুষ তেমন চোখে পড়ছে না।

মেলার নতুন বই

বাংলা একাডেমির জনসংযোগ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার মেলায় নতুন বই এসেছে ১৩৯টি। সবচেয়ে বেশি এসেছে উপন্যাসের বই ২৮টি। এছাড়া নতুন গল্পগ্রন্থ এসেছে ২০টি, প্রবন্ধ ১৩টি, কবিতা ৫০টি, গবেষণাবিষয়ক ২টি, ছড়ার বই ৩টি, শিশুসাহিত্য ২টি, জীবনী ৩টি, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ৪টি, নাটক ২টি, বিজ্ঞান বিষয়ক ১টি, ইতিহাস বিষয়ক ২টি, বঙ্গবন্ধুবিষয়ক ৪টি, ধর্মীয় বই ১টি এবং অন্যান্য বই ৪টি। 

উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে বিভাস থেকে বেরিয়েছে মহাদেব সাহার কাব্যগ্রন্থ ‘পৃথিবী, তোমার দুঃখ ঘুচে যাবে’। অনন্যা থেকে প্রকাশিত হয়েছে মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত প্রবন্ধগ্রন্থ ‘বাংলাদেশ চর্চা (পঞ্চদশ খণ্ড) ও অধ্যাপক ননী গোপাল সরকারের প্রবন্ধগ্রন্থ ‘বঙ্গবন্ধু সমগ্র’। অন্য প্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে মৌরী মরিয়মের উপন্যাস ‘ফানুস’। কথাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে শাকুর মজিদের স্মৃতিকথা বিষয়ক গ্রন্থ ‘ছাত্রকাল ট্রিলজি’। আগামী  থেকে বেরিয়েছে অধ্যাপক অরূপ রতন চৌধুরীর বঙ্গবন্ধুবিষয়ক গ্রন্থ ‘বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’, মঈনুল আহসান সাবেরের উপন্যাস ‘কবেজ লেঠেল’। কথাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে ঝর্না রহমানের গল্পগ্রন্থ ‘জলপরী ও নূহের নৌকা’। আগামী থেকে বেরিয়েছে হাসনাত আবদুল হাইয়ের নাটক ‘হ্যাম-বেথ’, আনোয়ারা সৈয়দ হকের উপন্যাস ‘আমার রেণু’। বিভাস থেকে প্রকাশিত হয়েছে মহাদেব সাহার কাব্যগ্রন্থ ‘মুজিব কবিতাসমগ্র’। অনিন্দ্য প্রকাশ থেকে এসেছে দুখু বাঙালের কাব্যগ্রন্থ ‘দীর্ঘ কবিতায় পিতা তুমি’।

মেলা মঞ্চের আয়োজন

সোমবার বিকেলে মেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তারেক রেজা। আলোচনায় অংশ নেন নাসির আহমেদ, খালেদ হোসাইন ও মিনার মনসুর। সভাপতিত্ব করেন কবি অসীম সাহা।

প্রাবন্ধিক বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনানির্ভর সাহিত্যকর্ম যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও অর্জনকে আনুষ্ঠানিকতার ঘেরাটোপ থেকে মুক্তি দিয়ে পাঠকের মগজে মুদ্রিত করে দেয়, লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সৌরভ ও সমৃদ্ধিকে জীবন ও যাপনের সঙ্গে একীভূত করতে চায়। বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে উপস্থিত জনমানসে সাময়িক উত্তেজনা ছড়ানো নয়, ক্ষমতার দম্ভে শেকড়ের টানকে উপেক্ষা করা নয়, মনুষ্যত্বের সকল দুয়ার খুলে দিয়ে মুক্তির আনন্দ সঞ্চারই কালজয়ী সাহিত্যের কাজ। মুক্তিযুদ্ধ-আশ্রয়ী সাহিত্য আমাদের সেই দর্পণের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, যেখানে আমরা অতীতের জীবন্ত জলছবি দেখি, বর্তমানকে ইচ্ছের অনুকূলে বিনির্মাণ করতে শিখি এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নগুলোকে বুক-পকেটে আগলে রেখে ভাবি : ‘আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না।’

আলোচকরা বলেন, বাঙালির দীর্ঘ দিনের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করে। আর মুক্তিযুদ্ধের আবেগ ও চেতনাকে ধারণ করে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে, সৃষ্টি হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য নামক নতুন সাহিত্যধারা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রেখে বাংলাদেশ যেমন নানা দিক দিয়ে দ্রুত উন্নতির শিখরে এগিয়ে চলেছে, তেমনি আমাদের শিল্প-সাহিত্যকেও সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গে তাল রেখে এগিয়ে নিতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে অসীম সাহা বলেন, বাংলাদেশের সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সময়কে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত সাহিত্যের অঙ্গনে বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ৭ মার্চের ভাষণ এক অনুপম সংযোজন।

এদিন লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন হুমায়ূন কবির ঢালী, জয়দীপ দে এবং রাহেল রাজিব।

মঙ্গলবারের মেলার আয়োজন

মঙ্গলবার একুশে বইমেলার ষষ্ঠ দিন। মেলা চলবে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৪টায় মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী : মুক্তিযুদ্ধ ও নারী’ শীর্ষক আলোচনা। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মনিরুজ্জামান শাহীন। আলোচনায় অংশ নেবেন মোহাম্মদ জাকীর হোসেন ও একেএম জসীমউদ্দীন। সভাপতিত্ব করবেন কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন।

এএইচআর/এসএসএইচ