প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে কাগুজে রপ্তানি দেখিয়ে জনতা ব্যাংক থেকে ২ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, তার ভাই এস এফ রহমান, তাদের দুই ছেলে, জনতা ব্যাংকের সাবেক এমডিসহ ৯৪ জনের বিরুদ্ধে পৃথক ৪ মামলা অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে মামলাগুলো অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে সংস্থাটির মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন নিশ্চিত করেছেন। শিগগিরই মামলাগুলো দায়ের করা হবে বলে জানা গেছে।

অনুমোদিত মামলার মধ্যে প্রথম মামলায় ৪১৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে দুদক। জনতা ব্যাংক পিএলসি’র নামে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ৪১৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ আনা হয়েছে।

দুদক সূত্র জানায়, অভিযোগ সংশ্লিষ্টরা পরস্পর যোগসাজশে জনতা ব্যাংক পিএলসি, লোকাল অফিস, ঢাকার কথিত গ্রাহক ইয়েলো অ্যাপারেলস লিমিটেড নামীয় একটি নবসৃষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ইডিএফ (EDF) সুবিধাসহ বিপুল অঙ্কের ঋণ অনুমোদন ও উত্তোলন করেন। অথচ প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকরা ব্যবসা পরিচালনায় কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ছিলেন না। তারা বিবি এলসির মাধ্যমে নিজেদের মধ্যেই কাগুজে আমদানি-রপ্তানি দেখিয়ে Accommodation Bill তৈরি করেন। এর মাধ্যমে মোট ৪,৮৯,৭৮,৬৭৮.৯৭ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৪১৬ কোটি ৩১ লাখ ৮৭ হাজার ৭১২ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। আত্মসাৎকৃত অর্থ বিভিন্ন হিসাবের মাধ্যমে স্থানান্তর, রূপান্তর ও লেয়ারিংয়ের মাধ্যমে মানিলন্ডারিং করা হয়েছে বলে অভিযোগ আনা হয়েছে।

দ্বিতীয় মামলায় পিংক মেকার লিমিটেডের নামে ৬৭৫ কোটি টাকা আত্মসাতে ২০ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা অনুমোদন হয়েছে। আসামিরা জনতা ব্যাংক পিএলসি, লোকাল অফিস, ঢাকার কথিত গ্রাহক পিংক মেকার লিমিটেড নামীয় একটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ইডিএফ সুবিধাসহ ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করেন। পরে ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাগুজে আমদানি-রপ্তানি দেখিয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। এলসির মাধ্যমে নিজেদের মধ্যেই মালামাল আমদানি-রপ্তানি দেখিয়ে Accomodation Bill তৈরির মাধ্যমে মোট ৭৯,৪৫০,৫১৩.১১ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৬৭৫ কোটি ৩২ লাখ ৯৩ হাজার ৬১৪ টাকা আত্মসাৎ হয়েছে বলে অভিযোগ আনা হয়েছে।

তৃতীয় মামলায় অ্যাপোলো অ্যাপারেলসের নামে ৭১৯ কোটি টাকা আত্মসাতে ২৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা অনুমোদন হয়েছে। জনতা ব্যাংকের লোকাল অফিসের গ্রাহক অ্যাপোলো অ্যাপারেলস লিমিটেড নামীয় একটি নবসৃষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ইডিএফ সুবিধাসহ ঋণ অনুমোদনের মাধ্যমে প্রায় ৭১৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। আসামিরা ক্ষমতার অপব্যবহার ও পরস্পর যোগসাজশে প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে মোট ৮,৪৬,০৫,৯০৯ মার্কিন ডলার বা ৭১৯ কোটি ১৫ লাখ ২ হাজার ২৬৫ টাকা আত্মসাৎ করেছে। আত্মসাৎকৃত অর্থ পরে নিজেদের মধ্যে হস্তান্তর, রূপান্তর ও বিভিন্ন স্তরে লেয়ারিংয়ের মাধ্যমে মানিলন্ডারিং করা হয় বলে তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

চতুর্থ মামলায় একই প্রক্রিয়ায় আমদানি রপ্তানি দেখিয়ে Accomodation Bill তৈরি করে ১২৩,১৯২,১১০ মার্কিন ডলার বা ১ হাজার ৪৭ কোটি ১৩ লাখ ২৯ হাজার ৩৫০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। যেখানে ২৭ জনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ৪০৯/৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/৪৭৭ (এ)/১০৯ ধারা তৎসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ ধারার মামলা অনুমোদন হয়েছে।

এর আগে লন্ডনে ৭৬ কোটি টাকা পাচার ও ঋণের ৩৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান সালমান ফজলুর রহমান ও তার ছেলে আহমেদ সায়ান ফজলুর রহমানসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে গত বছরের মার্চ মাসে মামলা দায়ের করে দুদক। এছাড়া ভুয়া কোম্পানির নামে ৬১৮ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ এবং নামমাত্র কোম্পানির নামে ১৪৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা ঋণ ও প্রায় ১১৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ এনে তার বিরুদ্ধে আরও দুই মামলা করে সংস্থাটি।

গত ১৫ বছরে আর্থিক খাতে নজিরবিহীন দুর্নীতি, লুটপাট, জালিয়াতি ও টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে। ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে তার প্রতিষ্ঠান। গত বছরের ১৩ আগস্ট গোপন তথ্যের ভিত্তিতে নৌপথে পলায়নরত অবস্থায় রাজধানীর সদরঘাট এলাকা থেকে সালমান এফ রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার সঙ্গে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হককেও গ্রেপ্তার করা হয়।

আরএম/জেডএস