করোনা মহামারিতে জর্জরিত পুরো বিশ্ব। প্রাথমিকভাবে চীনে এর আবির্ভাব হলেও অত্যন্ত ছোঁয়াচে হওয়ায় কম সময়ের মধ্যেই পুরো বিশ্বে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে ২০২০ সালের মার্চ মাসে প্রথম এই ভাইরাস ধরা পড়ে। ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ায় খুব দ্রুত সারাদেশে করোনা ছড়িয়ে পড়ে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে এখন পর্যন্ত ১৮ কোটিরও বেশি মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে এবং ৪০ লাখের বেশি মানুষ করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছে। করোনার কারণে পুরো বিশ্বের স্বাভাবিক জীবনযাপন স্থবির হয়ে পড়েছে।

শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন, পরিবহনসহ সব জায়গায় এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি হুমকির সম্মুখীন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটাই পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় দুর্যোগ।

কোভিড-১৯ কী? এর প্রকারভেদ ও ভ্যারিয়েন্ট:

কোভিড-১৯ সাধারণভাবে করোনাভাইরাস নামে পরিচিত হলেও এটা করোনাভাইরাস পরিবারের নতুন সদস্য। করোনাভাইরাসের বিভিন্ন প্রতিরূপ আরও বহুকাল থেকে থাকলেও ২০১৯ এর ডিসেম্বরে প্রথম এই প্রতিরূপটি চীনের উহানে ধরা পড়ে। প্রাথমিকভাবে উহান ভাইরাস নামে পরিচিত হলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরে এটাকে কোভিড-১৯ হিসেবে নামকরণ করে। কোভিড-১৯ মূলত শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ছড়ায়।

শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন, পরিবহনসহ সব জায়গায় এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি হুমকির সম্মুখীন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটাই পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় দুর্যোগ।

ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার প্রথম দুইদিন তেমন কোনো লক্ষণ দেখা না দেওয়ায় বুঝে ওঠার আগেই একজন থেকে আরেকজনে ছড়িয়ে পড়ে।

চীনে প্রথম দেখা দেওয়ার পর সারাবিশ্বে যখন ভাইরাসটি ছড়াতে থাকে তখন পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ভাইরাসটি মিউটেট করতে থাকে অর্থাৎ এর জেনেটিক গঠনে পরিবর্তন আসতে থাকে।

ভাইরাস মানুষের দেহের কোষ ব্যবহার করে নিজের কপি অর্থাৎ প্রতিরূপ তৈরি করে এবং এন্টিবডি, ভ্যাকসিন ও অন্যান্য কারণে ভাইরাসের গঠনে কিছু পরিবর্তন আসে, যাতে করে এটা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই কারণে সময়ের সাথে সাথে কোভিড-১৯ এর বেশ কিছু নতুন ভ্যারিয়েন্ট বা প্রকার প্রকাশ পেয়েছে।

করোনার ভ্যারিয়েন্টগুলোকে গ্রিক অক্ষর দ্বারা প্রকাশ করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যে আলফা, দক্ষিণ আফ্রিকায় বেটা, ব্রাজিলে গামা ও ভারতে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট প্রকাশ পায়। কয়েকমাস আগে আলফা ভ্যারিয়েন্টটি সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়েছিল কিন্তু বর্তমানে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টটি চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডেল্টা ও ডেল্টা প্লাস ভ্যারিয়েন্ট:

গতবছর অক্টোবরে ভারতে প্রথম ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টটি ধরা পড়ে। কয়েক মাসের মধ্যে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের প্রাদুর্ভাব পুরো ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত ভারতে প্রায় দুই লাখ লোক করোনায় মারা গিয়েছে যার অধিকাংশই এই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত ছিল।

অন্যান্য ভ্যারিয়েন্টগুলোর চেয়ে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট অন্তত ৬০% বেশি সংক্রামক। কারণ শ্বাস-প্রশ্বাস বা হাঁচি-কাশির মাধ্যমে যে ভাইরাসটি ছড়ায়, সেখানে অন্যান্য ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় ডেল্টার পরিমাণ দ্বিগুণ থাকে। এছাড়া ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে গমনের হার অর্থাৎ রোগের কারণে শারীরিক জটিলতার পরিমাণও বেশি।

ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট প্রথমে ভারতে পাওয়া গেলেও দ্রুতই অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এখন পর্যন্ত মোট ১০০টি দেশে এই ভ্যারিয়েন্টটি পাওয়া গেছে। বাংলাদেশেও এই ভ্যারিয়েন্টের সংক্রামণ দ্রুত বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আগামী আগস্টের মধ্যে বিশ্বব্যাপী  করোনা আক্রান্তের ৯০% শতাংশই হবে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট।

সম্প্রতি ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট আরও খানিকটা রূপ পাল্টে দুটি স্ট্রেইনে পরিবর্তিত হয়, যার একটি ডেল্টা প্লাস নামে পরিচিত হয়েছে। মূল ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের মতো এর উৎপত্তিও ভারতে। ডেল্টা প্লাস ভ্যারিয়েন্টটি এখনো পর্যন্ত ১২টি দেশে পাওয়া গেছে।

অন্যান্য ভ্যারিয়েন্টগুলোর চেয়ে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট অন্তত ৬০% বেশি সংক্রামক। কারণ শ্বাস-প্রশ্বাস বা হাঁচি-কাশির মাধ্যমে যে ভাইরাসটি ছড়ায়, সেখানে অন্যান্য ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় ডেল্টার পরিমাণ দ্বিগুণ থাকে।

অতিরিক্ত ছোঁয়াচে ও অধিক শারীরিক জটিলতার কারণে ভারত সরকার এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টকে ‘variant of concern’ বা দুশ্চিন্তার ভ্যারিয়েন্ট বলে ঘোষণা করেছে। তবে ডেল্টা ও ডেল্টা প্লাস এর মধ্যে প্রকটতা ও ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার মধ্যে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো পার্থক্য ধরা পড়েনি। দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে, সারা বিশ্বে যে ভ্যাকসিনগুলো দেওয়া হচ্ছে, অন্যান্য ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় ডেল্টার ক্ষেত্রে তার কার্যকারিতাও কিছুটা কম।

প্রতিরোধ ও প্রতিকার:

করোনাভাইরাসের আর সব ভ্যারিয়েন্টের মতো ডেল্টা ও ডেল্টা প্লাস ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ একইভাবে রোধ করতে হবে। ভাইরাস যত ছড়াবে তত বেশি মিউটেট করে রূপ পরিবর্তন করে, তাই ভাইরাসের সংক্রমণ সর্বাত্মকভাবে বন্ধ করার বা নিদেনপক্ষে কমানোর চেষ্টা করতে হবে।

মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা, ঘনঘন সাবান ও স্যানিটাইজার ব্যবহার করা, মুখ ঢেকে হাঁচি ও কাশি দেওয়া, ধূমপান ত্যাগ করা, চোখ ও মুখ অকারণে স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে, প্রয়োজনে দুটা মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। ভ্যাকসিন গ্রহণ করতে হবে, ভ্যাকসিনের বিরুদ্ধে অকারণ ভয়ভীতি দূর করতে অন্যদের উৎসাহিত করতে হবে। এটা এখন প্রমাণিত যে ভ্যাকসিন শতভাগ না হলেও এন্টিবডি গড়ে তুলতে বেশ কার্যকর। আমরা সংক্রমণ যত কমিয়ে আনতে পারব, করোনার রূপ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তত কমে আসবে। জীবনযাত্রা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে এর কোনো বিকল্প নেই।

অধ্যাপক ডা. সংযুক্তা সাহা ।। প্রসূতি, স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ও ল্যাপারোস্কপিক সার্জন