শিল্পবিপ্লবের পর থেকে সারা বিশ্বের উন্নয়ন ঘটছে দ্রুত গতিতে। এতে ত্বরিত উন্নতি হচ্ছে শিল্পোন্নত দেশগুলোর। এদের শিল্প কারখানা আর প্রযুক্তি থেকে উৎপাদিত পণ্যের বিশাল ভোক্তা সৃষ্টি হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোতে। এতে করে উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতি আরও সতেজ সবল হচ্ছে আর অপর দিকে তৃতীয় বিশ্ব আরও পরনির্ভরশীল হচ্ছে। এ তো গেল বৈষম্যের কথা। অপরদিকে শিল্পোন্নত দেশগুলোর শিল্প কারখানাগুলোতে প্রতিদিন সৃষ্টি হচ্ছে মারাত্মক তেজস্ক্রিয় কিংবা বিষক্রিয়া সম্পন্ন বর্জ্য। এগুলোর পরিমাণ এবং ক্ষতিকর প্রভাব এত বেশি যে, এগুলো নিয়ে হিমশিম খেতে হয় উন্নত দেশগুলোকে। নিজের পরিবেশকে বাসযোগ্য আর টেকসই রাখতে গিয়ে শিল্পোন্নত দেশগুলো তাদের উৎপাদিত বর্জ্য ঠেলে দিচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর দিকে। বাংলাদেশও এর শিকার। অনেকে এর নাম দিয়েছে বর্জ্য উপনিবেশবাদ; পুরনো উপনিবেশবাদ যেন নতুন রূপে জন্ম নিয়েছে।

নব্বইর দশকের শুরুর দিকে জার্মানির বন্দরনগরী হামবুর্গে শুল্ক কর্মকর্তাদের তল্লাশির সময় নির্মাণ সামগ্রী বোঝাই কার্গো জাহাজে পাওয়া যায় প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক আবর্জনা। এর আগেও ধরা পড়েছিল এরকম বর্জ্য যা এসেছিল তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো থেকে। পূর্ব ইউরোপ ও তৃতীয় বিশ্বে শিল্পবর্জ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে হামবুর্গ প্রধান পথ বলে মনে করা হয়। এখানকার মালামালবাহী জাহাজে প্রায়ই দেখা গেছে যন্ত্রপাতি ভর্তি করার পরিবর্তে বড় বড় কন্টেইনারে ভর্তি করা হয় ক্ষতিকর বর্জ্য। এর মধ্যে থাকে পিসিবি বা পলি ক্লোরাইড বাই ফিনাইল এর মতো মারাত্মক বিষাক্ত পদার্থ।

জার্মানি বিশ্বের বৃহত্তম শিল্পবর্জ্য রপ্তানিকারী দেশ এবং বৃহত্তম পলিভিনাইল উৎপাদনকারী দেশও। পলিভিনাইল থেকে প্রায় ছয়শ প্রকারের ক্ষতিকর বিষ জাতীয় পদার্থ ক্ষতিকর বর্জ্য হিসেবে বের হয় এবং এসব পদার্থ পরিবেশ দূষণের জন্য মারাত্মকভাবে দায়ী। শিল্পোন্নত দেশগুলোতে দিন দিন আগামী প্রজন্মের কথা চিন্তা করে এখন থেকেই নিজেদের পরিবেশ রাখছে জঞ্জালমুক্ত।

অপরদিকে দুর্বল আইন, ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর অর্থনৈতিক দৈন্যদশার কারণে সামান্য আর্থিক প্রলোভনে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো সহজেই গ্রহণ করছে এসব বর্জ্য। আর মজার ব্যাপার হচ্ছে, বর্জ্য আমদানি করতে গিয়ে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো পাচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রাও।

নিজের পরিবেশকে বাসযোগ্য আর টেকসই রাখতে গিয়ে শিল্পোন্নত দেশগুলো তাদের উৎপাদিত বর্জ্য ঠেলে দিচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর দিকে। বাংলাদেশও এর শিকার।

বর্তমানে প্রধান প্রধান বর্জ্য আমদানিকারক দেশ হচ্ছে পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, রোমানিয়া এবং রাশিয়া। এছাড়া আর্জেন্টিনা, ভেনিজুয়েলা এবং ব্রাজিলও বর্জ্য আমদানিকারকদের শীর্ষ তালিকায় রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানও উন্নত বিশ্বের শিল্পবর্জ্যের ডাম্পিং গ্রাউন্ড হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্প এদেশে ক্ষতিকারক শিল্পবর্জ্য ডাম্পিং এর একটা উৎস। প্রতি বছর টনকে টন দূষিত বর্জ্যসহ পুরনো জাহাজ এসে নোঙর করে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙার জোনে। জাহাজ ভাঙতে গিয়ে বিভিন্ন বর্জ্য নিক্ষেপ করা হচ্ছে সাগরে। এতে বিপর্যস্ত হচ্ছে উপকূলীয় জলীয় পরিবেশ এবং ঐ অঞ্চলের জনস্বাস্থ্য।

একদিকে প্রতিদিন প্রচুর অ্যাসবেস্টস যুক্ত হচ্ছে ঐ অঞ্চলের বাতাসে, পিভিসি পোড়ানোর কারণে বাতাসে মিশছে ডাইঅক্সিন আর পানিতে জমছে টনকে টন তেল। সব মিলিয়ে আজ বিপন্ন ঐ অঞ্চলের পরিবেশ এবং বিলুপ্ত হচ্ছে ম্যানগ্রোভ বন। এদিকে শিল্প উন্নত দেশগুলো দরিদ্র দেশগুলোতে তাদের দেশে আবর্জনা ভস্মীকারক চুল্লি নির্মাণের জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা বলছে। আর ভস্মীকারক চুল্লি নিজেই একটা পরিবেশ দূষক। এতে করে ক্ষতিকারক বর্জ্যের দূষণ আর ভস্মীকরণের কারণে বায়ুদূষণ দুটোই চলে সমান তালে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো।

হামবুর্গ ইন্সটিটিউট অফ সোশ্যাল রিসার্চের মতে, শিল্প জঞ্জাল রপ্তানির এই প্রক্রিয়াটি একটি নতুন ধরনের উপনিবেশবাদ। বিভিন্ন আবর্জনা ব্যবস্থাপনা সংস্থা এই উপনিবেশবাদে সহায়তা করছে। এসব সংস্থা এক টন বিষাক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নামে হাতিয়ে নেয় হাজার হাজার ডলার আর অপসারণের নামে পাঠিয়ে দেয় তৃতীয় বিশ্বে। বিশ্বে যে বর্জ্য কেনাবেচার বাজার চলমান আছে এটি আর অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।

পরিবেশগত ন্যায়বিচারের দিক থেকে চিন্তা করলেও ধনী দেশগুলো তাদের বর্জ্য এভাবে দরিদ্র দেশগুলোতে ঠেলে দেওয়ার ব্যাপারটি আপত্তিকর। বিশ্বব্যাপী বর্জ্য বাজারের পেছনে যে আরও অনেক গল্প আছে সেটি হয়তো অজানাই থেকে যায়। বৈশ্বিক বর্জ্য বাণিজ্য বহু বিলিয়ন ডলারের শিল্প।

১৯৯৩ সালে বিশ্বব্যাপী বর্জ্যের বাজার প্রসার লাভ করতে থাকে এবং ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১৬ সাল এই সময়ের মধ্যে বিশ্ব প্লাস্টিক বর্জ্য বাজারের প্রায় অর্ধেক আমদানি করে চীন। জাতিসংঘের পণ্য বাণিজ্যের তথ্য ভাণ্ডারের মতে, ২০১৭ সালে বিশ্বে প্লাস্টিক বর্জ্য রপ্তানি ও আমদানির মূল্য ছিল যথাক্রমে ৪.৫০ বিলিয়ন এবং ৬.১০ বিলিয়ন ডলার।

একজন লোক যখন তার নষ্ট হওয়া টেলিভিশন সেটটি ফেলে দেয় তখন সে ভেবে দেখে না যে এটিতে ৪৩৬০ রকমের রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে এবং এগুলোর কারণে পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বর্জ্য বাণিজ্য নিয়ে দেশ সমূহের মধ্যে দ্বন্দ্বের ঘটনাও ঘটছে প্রায়শ। ২০১৯ সালে ফিলিপাইন এবং কানাডার মাঝে অসন্তোষ সৃষ্টি হয় বর্জ্য নিয়ে। ২০১৩ এবং ২০১৪ সালের বৈশ্বিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার বাণিজ্যের অংশ হিসেবে ফিলিপাইন কানাডা থেকে যে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য আমদানি করেছিল তাতে মেশানো অবস্থায় পাওয়া যায় পুনঃ ব্যবহারের অযোগ্য বর্জ্য। এ কারণে ফিলিপাইন ৬৯টি কন্টেইনার কানাডায় ফেরত পাঠায়। তবে এর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল চোরাচালানের মতো বিষয়। দুই দেশের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কয়েক বছর লেগে গিয়েছিল।

২০০৯ সালে ব্রাজিল এবং যুক্তরাজ্যের মাঝে এ রকম আরেকটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেখানে যুক্তরাজ্য থেকে ৮৯টি কন্টেইনারে বিষাক্ত বর্জ্য পাঠানো হয় ব্রাজিলে। ১৯৯২ সালে সম্পাদিত আন্তর্জাতিক চুক্তি ‘ব্যাসেল কনভেনশন’ দেশ সমূহের মধ্যে ক্ষতিকর বর্জ্য স্থানান্তর এবং নিষ্কাশন করা নিষিদ্ধ। এক্ষেত্রে ব্যাসেল কনভেনশনের নিষেধ একেবারেই মানা হয়নি।

পরিবেশবাদী সংস্থা ‘গ্রিনপিস’ বরাবরই এ ধরনের বর্জ্য রপ্তানির সমালোচনা করেছে এবং বলেছে, তৃতীয় বিশ্বের সকল ক্ষতিকারক বর্জ্য রপ্তানি রোধে কার্যকর আইন কিংবা পন্থা না থাকায় এ প্রক্রিয়া বন্ধ হচ্ছে না। ফলে, শিল্পোন্নত দেশের শিল্পবর্জ্যের আস্তাকুড় হিসেবে পরিণত হয়েছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো।

বিভিন্ন কেলেঙ্কারির শিকার আর নিজেদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বর্জ্য শিল্পের তথাকথিত স্বর্ণ দুয়ার আফ্রিকা এ ধরনের বর্জ্য আমদানি ইতিমধ্যে বন্ধ করে দিয়েছে। মূল সমস্যা হলো, শিল্পোন্নত দেশগুলো জানে না তাদের উৎপাদিত এসব বর্জ্য কোথায় নিয়ে যেতে হবে এবং যেখানে ফেলে দিতে হবে সেখানের অবস্থাইবা কী হবে। যেমন একজন লোক যখন তার নষ্ট হওয়া টেলিভিশন সেটটি ফেলে দেয় তখন সে ভেবে দেখে না যে এটিতে ৪৩৬০ রকমের রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে এবং এগুলোর কারণে পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। হাজার রকমের জঞ্জালের শেষ গন্তব্যস্থল হিসেবে পরিণত হচ্ছে দরিদ্র দেশগুলো। এতে করে মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে এসব অঞ্চলের মাটি, পানি ও বায়ু। দিন দিন বিরাট হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে এসব দেশের মানুষের অস্তিত্ব। তবে আশার কথা বর্জ্য যে জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে সেটা অনুধাবন করতে পারছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো এবং উন্নত বিশ্ব থেকে বিভিন্ন ভাবে পাঠানো এসব বর্জ্যকে না বলে দিচ্ছে।

চীনের প্লাস্টিক বর্জ্য আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা, ফিলিপাইনের বর্জ্য ফেরত দেওয়া, মালয়েশিয়ার বর্জ্য আমদানিতে নিরুৎসাহিত করার পরিকল্পনা পরিবেশ এবং স্বাস্থ্য সচেনতনার প্রতি মানুষের মনোভাব যে দিন দিন জোরালো হচ্ছে তা প্রকাশ করে। এখন প্রয়োজন বর্জ্যের আস্তাকুড় থেকে নিজেদের বাঁচাতে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বর্জ্য আমদানি বিরোধী কঠোর আইন প্রণয়ন ও এর বাস্তবায়নে নিজেদের সংগঠিত হওয়া। 

ড. এ এস এম সাইফুল্লাহ ।। অধ্যাপক, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
saifullahasm@yahoo.com