জাবিতে বর্ণিল আয়োজনে ‘বাহা বঙ্গা’ উদযাপন

ইট-পাথরের যান্ত্রিক শহর থেকে খানিকটা দূরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল মাটির বুক চিড়ে আজ যেন অন্য এক বসন্তের আগমনী বার্তা পাওয়া গেল। সাঁওতাল সম্প্রদায়ের একটি বড় উৎসব ‘বাহা বঙ্গা’ বা পুষ্প উৎসবের বর্ণিল আয়োজনে মেতে উঠেছিল সাংস্কৃতিক রাজধানী খ্যাত এই বিদ্যাপীঠ। নিজেদের শেকড় আর পরম্পরাকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে জাবির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের এই আয়োজন নজর কেড়েছে সবার।
সাঁওতালদের কাছে ‘বাহা’ মানেই আনন্দ, ‘বাহা’ মানেই ফুল। এটি মূলত প্রকৃতিকে বরণের এক উৎসব। অষ্ট্রিক গোষ্ঠীর মুণ্ডা বা হো একে ‘সাহরুল’ বললেও সাঁওতালদের কাছে এটি প্রাণের ‘বাহা’। সাঁওতাল পঞ্জিকা মতে, পহেলা মাঘ থেকে কৃষি বর্ষ শুরু হলেও দোল পূর্ণিমার পর চৈত্র মাস জুড়ে চলে এই বাহা উৎসবের আমেজ। বনের নতুন ফুলকে বরণ করে নেওয়াই এই পূজার মূল আকর্ষণ।
শুক্রবার (৬ মার্চ) সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শালবনে (সুন্দরবন) শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী পূজা ও রীতিনীতি। সাঁওতাল নারীরা নতুন ফুল মাথায় গুঁজে বসন্তকে বরণ করে নেন। মাদলের তালে তালে নেচে-গেয়ে মুখরিত করে তোলেন পুরো এলাকা। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উদ্যোগে আয়োজিত এই উৎসবে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
বাহা বঙ্গা উদযাপন কমিটি ঢাকার আহ্বায়ক নিরালা মারডি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, আমাদের নিজস্ব রীতিনীতি রয়েছে। নানা কারণে সব সময় বড় পরিসরে আয়োজন করা সম্ভব হয় না। তবে ক্যাম্পাসের মতো এই সহযোগিতামূলক পরিবেশ পেলে আমরা আমাদের হারিয়ে যাচ্ছে প্রায় এমন সংস্কৃতিকে আরও ভালো করে ধরে রাখতে পারব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘আরফি’র সদস্য সোমা ডুমুরি উৎসবের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, বিগত তিন বছর ধরে আমরা জাবিতে এই উৎসবটি করছি। বাহা দেবতার পূজার মাধ্যমে সমতলের সাঁওতালরা ঋতুর প্রথম ফুলকে বরণ করে নেয়। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো সমতল ও পাহাড়ের সব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রকৃতির সাথে যে নিবিড় সম্পর্ক, তা সবার কাছে তুলে ধরা।

উৎসবে অতিথি হিসেবে আসা ডাকসুর কার্যকরী সদস্য হেমা চাকমা জাবির এমন উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশ্ববিদ্যালয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। গত কয়েকদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা নিয়ে একটি অনুষ্ঠান করেছিলাম। সেখানে অনেক জাতিগোষ্ঠী থেকে তাদের ভাষা, গান, নাচ কবিতা দিয়ে অংশগ্রহণ করেছিলো। জাহাঙ্গীরনগরেও এটি তৃতীয় বারের মতো হচ্ছে। এখানে যারা পড়াশোনা করে তাদের কাছে কিন্তু এই ম্যাসেজটা যাচ্ছে। সাঁওতালদের একটি উৎসব ‘বাহা বঙ্গা’। এখানে এটি উদযাপনের কারণে কিন্তু পুরো বাংলাদেশে এটি ছড়িয়ে যায়। তাই আমার কাছে মনে হয় কোনো একটা জাতিকে রিপ্রেজেন্ট করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ধরনের আয়োজন গুলো করা খুব জরুরি।
তিনি আরও বলেন, সরস্বতী পূজা যেভাবে আমরা ক্যাম্পাসে উদযাপন করি, রোজায় ইফতার মাহফিল যেভাবে করি, সেভাবে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর উৎসবগুলো যেমন চাকমাদের ‘বিজু’, গারোদের ‘ওয়াংগালা’, সাঁওতালদের ‘বাহা বাঙ্গা’ উৎসবগুলো যদি নিজেরা চর্চা না রাখি এগুলো দিন দিন হারিয়ে যাবে। এমনকি বাংলার চিরাচরিত বিষয়গুলো যেমন- বায়োস্কোপ,পালাগান এগুলো কিন্তু চলে যাচ্ছে। এখনকার বাচ্চারা এগুলো সম্পর্কে জানে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যদি এগুলোর চর্চা হয় পুরো বাংলাদেশেই তা ছড়িয়ে পড়বে।
নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ৫৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী নিহা বলেন, আগে কখনো জানতাম না যে ক্যাম্পাসে এত সুন্দর একটা উৎসব হয়। সাঁওতালদের পূজা আর ঐতিহ্য সম্পর্কে অনেক নতুন কিছু জানতে পেরেছি এর মাধ্যমে, যা আমার কাছে খুব ভালো লাগছে।
মাদলের ছন্দ আর রঙিন পোশাকে জাবির ছায়ামঞ্চে যখন তরুণ-তরুণীরা ‘বাহা বঙ্গা’ উদযাপনে ব্যস্ত, তখন মনেই হয়নি এটি কোনো যান্ত্রিক নগরী। আয়োজকদের আশা, এই সাংস্কৃতিক চর্চা কেবল জাবিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সারা দেশের মানুষের মধ্যে আদিবাসী সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা আরও বাড়িয়ে দেবে।
আরএআর