পদ্মার চরে তরমুজ চাষে সাফল্যের আভাস

রাজশাহীর পদ্মার চরের উর্বর পলিমাটির ওপর সূর্যের আলো পড়তেই দৃশ্যপটে দেখা মিলছে সবুজের নতুন উচ্ছ্বাস। চরের মাটি ভেদ করে বীজগুলো অঙ্কুরিত হয়ে গজিয়েছে চারা। সেই চারাগুলো পরিণত হয়েছে তরমুজের গাছে।
মাত্র ৪৫ দিনের মধ্যে, বীজ থেকে গাছ হয়েছে এক ফুট পর্যন্ত বিস্তৃত। শুরুতে শঙ্কা থাকলেও আজ সেই শঙ্কা স্বপ্ন পূরনের শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। পদ্মার চরে বাণিজ্যিক তরমুজ চাষের সম্ভাবনা যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
গেল বছরে ১২ নভেম্বর থেকে রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের নবগঙ্গা এলাকার অদূরে পদ্মার পাড় ঘেঁষে প্রায় ২৫০ বিঘা চরে বাণিজ্যিকভাবে তরমুজ চাষ শুরু করেন স্থানীয় ইউপি সদস্য বাবর আলী। এক বছর পরিকল্পনার পর তিনি পদ্মার চরে তরমুজ, শসা ও সাম্মাম চাষের উদ্যোগ নেন।
বাবর আলী খুলনা, চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন তরমুজ উৎপাদন এলাকাসহ অভিজ্ঞ চাষিদের দিয়ে মাটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে তিনি চাষ শুরু করেন।
বাবর আলী জানান, শঙ্কার মধ্যেই তরমুজের বীজ রোপণ করলেও মাটি ভেদ করে দ্রুত চারা গজিয়ে উঠেছে। মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে গাছ এক ফুট পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এতে পদ্মার চরে তরমুজ চাষের সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।
কৃষি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তরমুজ চাষের উপযুক্ত সময় জানুয়ারি থেকে এপ্রিল, তবে ফেব্রুয়ারি সবচেয়ে অনুকূল ধরা হয়। কিন্তু বাবর আলী আগাম জাতের তরমুজ চাষ করেছেন যাতে আসন্ন রমজানে রাজশাহীর মানুষকে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত তরমুজ সরবরাহ করা যায়। চাষের জন্য বীজ আনা হয়েছে ভারত থেকে।
খুলনার অভিজ্ঞ চাষি শ্যামল পদ্মার চরে এই তরমুজ চাষে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, আমরা অনেকটা শঙ্কা নিয়ে বীজ রোপণ করেছিলাম, কিন্তু পদ্মার চরে বীজ থেকে খুব দ্রুত চারা গজিয়েছে। খুলনা অঞ্চলে সাধারণত তিন–চারবার পানি দিতে হয়, কিন্তু এখানে একবারই যথেষ্ট হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই চরের মাটিতে সার ও কীটনাশকের ব্যবহারও খুব সীমিত। তবু গাছ ভালোভাবে বেড়ে উঠছে। অনেক গাছে ইতোমধ্যে ফুল ও ফল এসেছে। আশা করছি রমজানের আগেই তরমুজ বাজারে আসবে। চরের তরমুজ আকারে বড় ও স্বাদে মিষ্টি হবে।
উদ্যোক্তা বাবর আলী জানান, এই উদ্যোগ রাজশাহী অঞ্চলের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। তিনি বলেন, ভালো ফলন হলে আরও অনেক কৃষক এতে যুক্ত হবেন। এতে রাজশাহীর অর্থনীতিতে নতুন অধ্যায় যুক্ত হবে। দক্ষিণাঞ্চল থেকে উচ্চমূল্যে তরমুজ আমদানি না করে স্থানীয়ভাবে কম দামে তরমুজ পাওয়া যাবে।
তিনি আরও জানান, তার প্রকল্পে ১০০–১৫০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৫০–৬০ জন শ্রমিক জমিতে কাজ করছেন—কেউ পানি দিচ্ছেন, কেউ সার ও ওষুধ প্রয়োগ করছেন। তবে বাবর আলী অভিযোগ করেন, কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে কোনো সহায়তা পাননি তিনি। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ভোলা, বরিশাল ও পটুয়াখালীতে তরমুজ চাষ বেশি হলেও উত্তরাঞ্চলে এই চাষ তেমন হয়নি।
এ বিষয়ে পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল মান্নান বলেন, পদ্মার চরে তরমুজ চাষ শুরু হওয়ায় উত্তরাঞ্চলের কৃষিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এটি তরমুজ সম্ভবনাময় ফসল। যেহেতু রাজশাহী অঞ্চলে এই ফসল তেমন নেই। আসা করা যাচ্ছে ভালো কিছু হবে। ইতোমধ্যে বীজ থেকে চারা গজুয়েছে।
চাষের খরচের বিষয়ে তিনি বলেন, যদি মাচায় তরমুজ চাষ করা হয় সে ক্ষেত্রে খরচ বাড়বে। এছাড়া ব্যাগের মাধ্যমে ঝুলিয়ে রাখলে খচর বাড়বে। আর মাটিতে চাষ করলে খরচ কম হবে।
শাহিনুল আশিক/আরকে