রামেক হাসপাতালে বাড়ছে অসচেতনতার আগুনে দগ্ধ রোগী

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের ওয়ার্ডে প্রবেশ করলেই নাকে লাগছে পোড়া মাংসের গন্ধ। সারি সারি বিছানায় ব্যান্ডেজে মোড়ানো রোগী। কেউ কাতরাচ্ছেন, কেউ নিঃশব্দে তাকিয়ে আছেন ছাদের দিকে। এ যেন অসচেতনতার আগুনে দগ্ধ এক শহরের প্রতিচ্ছবি।
শীতের তীব্রতা বাড়ায় গ্রামের মানুষ এখনো খড়কুটা বা কাঠ জ্বালিয়ে আগুন পোহায়। শহরেও অনেকে হিটার ব্যবহার করেন। কিন্তু আগুনের পাশে কাপড় শুকানো, শিশুদের খেলাধুলা করা কিংবা গরম পানির বালতি পাশে রাখা- এসব ছোট ভুলই অনেক বড় দুর্ঘটনা ডেকে আনে। সবাইকে সাবধান হওয়ার কথা বলছেন চিকিৎসকরা।
চলতি শীতেই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৫২ জন দগ্ধ রোগী। এর বাইরে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন আরও তিন শতাধিক মানুষ। আগুনে পোড়া, গরম পানিতে দগ্ধ হওয়া- সব মিলিয়ে বাড়ছে পোড়া রোগীর সংখ্যা। চিকিৎসকরা বলছেন, অসচেতনতাই এর বড় কারণ।
হাসপাতালের তথ্য বলছে, নভেম্বর ও ডিসেম্বর- এই দুই মাসে এই সংখ্যা ছিল গত বছরের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি। গেল ২৮ ডিসেম্বর রাজশাহীর গোদাগাড়ীর প্রমতলী এলাকায় বাড়ির পাশে খড়কুটা জ্বালাতে গিয়ে দগ্ধ হন ৭০ বছর বয়সী রুবিয়া খাতুন ও ৫৫ বছর বয়সী জাকিয়া খাতুন।
রুবিয়া খাতুনের বোন শিউলি বেগম বলেন, রুবিয়ার দুই পা কোমর পর্যন্ত পুড়ে গেছে। পুড়ে যাওয়ার পর থেকে শরীরের নিচের অংশ কাজ করছে না। এখন তো কথা বলতেও পারছে না। ডাক দিলেও সাড়া দেয় না।
চিকিৎসকরা জানান, রুবিয়ার শরীরের ১৪ শতাংশ অংশ দগ্ধ। কিন্তু সমস্যা হলো, তা শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে। তাই আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছেন তিনি।
রামেক হাসপাতালের তথ্য বলছে, গত দুই মাসে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ৬১ জন পুরুষ, ৭৫ জন নারী ও ১১৬ জন শিশু। মৃত্যুবরণ করেছেন ১৩ জন। তাদের মধ্যে ৭ জন নারী, ৪ জন পুরুষ ও ২ জন শিশু। আরও প্রায় তিনশ মানুষ বহির্বিভাগ থেকে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। পুরো এক বছরের হিসাবে (২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত) রাজশাহীর বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিয়েছেন ৫ হাজার ১৩৮ জন পোড়া রোগী। ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ২ হাজার ৭১ জন। এর মধ্যে ৬০ শতাংশই শিশু।
গরম পানিতে দগ্ধ রোগীদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। দুই বছরের রাজা হাসান শুয়ে আছে হাসপাতালের বেডে। গরম পানির ছিটে তার পায়ের চামড়া উঠে গেছে। তার বাবা মাসুদ রানা বলেন, স্ত্রী গরম পানি নিয়ে যাচ্ছিলেন গোসল করানোর জন্য। এক মুহূর্তের অসাবধানতায় শিশুর পায়ে পানি পড়ে যায়। হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। চিকিৎসা চলছে।
রাজশাহীর পাশের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট এলাকায়ও এমন আরেকটি ঘটনা ঘটে। দুই বছর চার মাসের রুবাইয়া গরম চা তৈরির পানি ভর্তি জগ টেনে নেওয়ার সময় মুখ, বুক ও শরীরের বড় অংশ দগ্ধ হয়। এছাড়া চুলায় রান্নার সময় আঁচলে আগুন লেগে পুড়েছেন মমতাজ খাতুন (৩০)। তিনি নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার বাসিন্দা। গত সপ্তাহে রান্নাঘরে কাজ করার সময় অসাবধানতাবশত তার শাড়ির আঁচলে চুলার আগুন লেগে যায়। এখন কোমর থেকে পা পর্যন্ত পুড়ে গেছে। চিকিৎসকরা বলছেন, তার শরীরের ২৯ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।
এ বিষয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের ইনচার্জ অধ্যাপক আফরাজা নাজনীন আশা বলেন, শীত এলেই পোড়া রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। মানুষ আগুনে গা গরম করতে গিয়ে, কিংবা গরম পানি ব্যবহারে অসাবধান থাকায় এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। আমাদের হাসপাতালে শয্যা ৫১টি। কিন্তু প্রায় সময়ই দ্বিগুণ রোগী নিয়ে কাজ করতে হয়।
শাহিনুল আশিক/আরএআর