ঈদের ছুটি কাটান কোলাহল ছেড়ে সবুজ-নির্মল রাজশাহীতে

প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্য আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য জনপদ রাজশাহী। ঐতিহাসিক নিদর্শন ও নান্দনিক পরিবেশের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই শহরকে দেশের অন্যতম সবুজ ও নির্মল বায়ুর নগর বলা হয়। ব্যস্ত নাগরিক জীবনের কোলাহল থেকে দূরে, শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশে কিছুটা সময় কাটাতে রাজশাহী হতে পারে এক আদর্শ গন্তব্য।
বিজ্ঞাপন
পদ্মা নদীর তীরঘেঁষে গড়ে ওঠা এই বিভাগীয় শহর রেশম, আম ও লিচুর জন্য সুপরিচিত। পাশাপাশি রয়েছে অসংখ্য প্রাচীন স্থাপনা, যা শহরটির ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। পরিচ্ছন্নতা ও সুশৃঙ্খল নগর ব্যবস্থাপনার জন্যও রাজশাহীর খ্যাতি দেশজুড়ে।
রেশমি বস্ত্র উৎপাদনের কারণে রাজশাহী ‘রেশমনগরী’ নামে পরিচিত। একইসঙ্গে দেশের খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থানের কারণে একে ‘শিক্ষানগরী’ও বলা হয়। এখানকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সুনাম দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বিস্তৃত।
রাজশাহী শহর এবং এর আশপাশ জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা, প্রাচীন মসজিদ, মন্দির ও উপাসনালয়। এসব স্থাপনা দেখতে সারা বছরই পর্যটকদের আনাগোনা থাকে। বিশেষ করে উৎসবে বা ছুটিতে মানুষের সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। এই ঈদের ছুটিতে পরিবার-পরিজন কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর জন্য রাজশাহী হতে পারে চমৎকার একটি জায়গা।
বিজ্ঞাপন

দূষণ কমানোর দিক থেকে বিশ্বসেরা তালিকায় থাকা শহরটির পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন ও মুক্ত বাতাসের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। এই শহরে বিকেল নামলেই পদ্মা পাড়ে জমে ওঠে মানুষের ভিড়। নদীপাড়ের লালন শাহ মুক্ত মঞ্চ, পদ্মা গার্ডেন, আইবাধঁ, ট্রি-বাঁধে প্রতিদিন বিকেলে নির্মল বাতাস শরীরে মাখতে আসেন হাজারো মানুষ। খোলা আকাশ, পদ্মার বাতাস আর সবুজে ঘেরা পরিবেশ শহরটিকে দিয়েছে এক অন্যরকমের সৌন্দর্য।
রাজশাহীর সড়ক বিভাজকজুড়ে সবুজের বেষ্টনী নজর কাঠে পর্যটকদের। পরিচ্ছন্ন রাস্তা আর পরিকল্পিত নগরায়ন শহরটিকে অন্য অনেক শহর থেকে আলাদা করেছে। এখানে নাগরিক সব সুবিধা হাতের কাছেই। তবে বড় শহরের মতো কোলাহল, ধুলোবালি, কালো ধোঁয়া কিংবা দীর্ঘ যানজটের ভোগান্তি নেই এই সিটিতে। তাই নিরিবিলি পরিবেশে ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য রাজশাহী এক অনন্য শহর।
বিজ্ঞাপন
রাজশাহীর কথা উঠলেই সবার আগে আসে আমের প্রসঙ্গ। দেশের সেরা আমের জন্য এ অঞ্চলের সুখ্যাতি বহুদিনের। ঈদের সময় পাকা আম না মিললেও ইতোমধ্যে বাগানজুড়ে থোকায় থোকায় কাঁচা আমের দেখা মিলছে। আর কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হবে নানা জাতের সুস্বাদু আম সংগ্রহ।

প্রায় ৯৬ দশমিক ৭২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের রাজশাহী শহরের একটি বড় অংশ পদ্মা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে। পদ্মায় পানি কম থাকলেও নদীর পাড়ের খোলা পরিবেশ, নির্মল বাতাস আর বিস্তীর্ণ বালুচর ভ্রমণপিপাসুদের মনে এনে দেয় অন্যরকম প্রশান্তি। ছোট-বড় বালুচর ও ক্ষুদ্র বনভূমির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এক অনন্য প্রাকৃতিক দৃশ্য।
শহরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। বিশাল এ ক্যাম্পাস সবুজ বনভূমি ও গাছপালায় ঘেরা। এর নান্দনিক সৌন্দর্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় ‘প্যারিস রোড’। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের শুরুতেই চোখে পড়ে সবুজে ঘেরা জুবেরি ভবনের বিস্তীর্ণ মাঠ। সেখান থেকে কয়েক মিনিট হাঁটলেই প্যারিস রোড—একেবারে সোজা এই সড়কের দুই পাশে সারি সারি রেইন ট্রি, কেওড়া, কৃষ্ণচূড়া ও দেবদারু পথচারীদের মুগ্ধ করে। সড়কের শেষ প্রান্তে রয়েছে সিনেট ভবন। কাছেই মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ‘সাবাস বাংলাদেশ’, যেখানে প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের আড্ডা জমে ওঠে। এছাড়া ক্যাম্পাসে রয়েছে কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তন, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, বোটানিক্যাল গার্ডেন, চারুকলা ইনস্টিটিউট, নীরব রেললাইন এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বধ্যভূমি, যেখানে ১৯৭২ সালের ২৩ এপ্রিল আবিষ্কৃত গণকবরের ওপর স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়।

রাজশাহী ভ্রমণে অবশ্যই দেখা উচিত বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, যা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। এটি দেশের প্রাচীনতম প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরগুলোর একটি। খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ অব্দ থেকে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ের নানা প্রত্ননিদর্শন এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। জাদুঘরের ১৪টি গ্যালারিতে প্রস্তর, স্বর্ণ, রৌপ্য, তাম্র, পিতল, ব্রোঞ্জ, লৌহ, কাঠ ও মৃন্ময় উপাদানে তৈরি অসংখ্য নিদর্শন রাখা হয়েছে। এখানে প্রায় ছয় হাজার মুদ্রার সংগ্রহ রয়েছে, যার মধ্যে ৩৮টি স্বর্ণমুদ্রা।
এছাড়া শহরের কাছাকাছি ঘুরে দেখা যেতে পারে শহীদ জিয়াউর রহমান শিশু পার্ক, রাজশাহী বোটানিক্যাল গার্ডেন এবং শহীদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলী পার্ক। এসব স্থানে অটোরিকশায় সহজেই যাতায়াত করা যায়।
রাজশাহী ভ্রমণে পুঠিয়ার ঐতিহাসিক রাজবাড়ি একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই স্থানে রয়েছে পাঁচআনি জমিদারবাড়ি, গোবিন্দ মন্দির, বড় শিব মন্দির এবং জগন্নাথ মন্দিরসহ নানা প্রাচীন স্থাপনা। ১৮২৩ সালে রানী ভুবন মোহিনী দেবী রাজবাড়িটি প্রতিষ্ঠা করেন। পোড়ামাটির অলংকরণে সমৃদ্ধ এসব স্থাপনা এবং বিশাল দিঘিগুলো দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। এছাড়া বাগমারার বীরকূটসা জমিদার বাড়ি বা হাজার দুয়ারি প্রাসাদও ঘুরে দেখা যেতে পারে।

এছাড়া রয়েছে বাঘা শাহী মসজিদ, যা জেলার বাঘা উপজেলায় অবস্থিত। শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের এই মসজিদটি ঐতিহাসিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, চারঘাট উপজেলার পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ ও রাজশাহী পুলিশ একাডেমির প্রাকৃতিক পরিবেশও মনোমুগ্ধকর। পুলিশ একাডেমির ঝুলন্ত সেতুটি বিশেষভাবে দর্শনীয়।
রাজশাহী থেকে পশ্চিমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে গেলে দেখা যায় ঐতিহাসিক ছোট সোনা মসজিদ, যা সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহর শাসনামলে নির্মিত সুলতানি স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন।
সব মিলিয়ে ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রকৃতি ও নির্মল পরিবেশে সমৃদ্ধ রাজশাহী হতে পারে ঈদের ছুটিতে ভ্রমণের এক অনন্য গন্তব্য। সুযোগ পেলে একবার ঘুরে আসতেই পারেন সবুজে ঘেরা এই শহরে।
শাহিনুল আশিক/আরকে