বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলায় ব্যারেল প্রতি ২ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত দামে বিক্রি হচ্ছে ডিজেল। এতে বাধ্য হয়েই অধিকাংশ সমুদ্রগামী ট্রলারের জন্য অতিরিক্ত মূল্যে জ্বালানি ক্রয় করে মাছ শিকারে যেতে হচ্ছে জেলেদের। নির্ধারিত দামে জ্বালানি না পেয়ে অসংখ্য ট্রলারের জেলেরা সমুদ্রে যেতে পারছেন না। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন সমুদ্রগামী মাছ ধরা ট্রলারের মালিক ও জেলেরা।
বিজ্ঞাপন
সরেজমিনে পাথরঘাটার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ট্রলার মালিক ও জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগামী ১০-১২ দিন পর মাছ শিকারে সরকারি নিষেধাজ্ঞা শুরু হবে। আর দীর্ঘ ওই সময়ে মাছ শিকার করতে না পারায় এক প্রকার বেকার সময় পার করবেন জেলেরা। ফলে এই শেষ সময়ে সব জেলেরাই মাছ শিকার করতে সাগরে যেতে প্রস্তুতি নিলেও জ্বালানি সংকটে বিপাকে পড়েছেন তারা। আর এ কারণেই প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় মাছ শিকারে সমুদ্রে যেতে পারবে না অসংখ্য মাছ ধরা ট্রলার। তবে সংকটের কথা বললেও নির্ধারিত দামের চেয়ে ব্যবসায়ীদের বেশি টাকা দিলে পাওয়া যাচ্ছে প্রয়োজনীয় জ্বালানি। এমন অভিযোগ করেছেন পাথরঘাটার বিভিন্ন ট্রলার মালিক ও স্থানীয় জেলেরা।
সমুদ্রগামী ট্রলারগুলোতে বেশি দামে ডিজেল ক্রয় করতে হয়, জেলে ও ট্রলার মালিকদের এমন অভিযোগের বিষয়ে খোঁজ নিলে এর সত্যতা পাওয়া যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি মাছ ধরা ট্রলার মালিকের কাছে থাকা মেসার্স বেলাল স্টোর নামে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্রয় রশিদে দেখা যায়, জ্বালানি তেলের জন্য দুই ব্যারেল ডিজেল কেনা হয়েছে ৫০ হাজার টাকায়। এতে ব্যারেল প্রতি ২৫ হাজার টাকা রাখায় প্রায় ৭-৮ হাজার টাকা বাড়তি গুনতে হয়েছে ওই ট্রলার মালিককে। শুধু এই একটি ট্রলার নয়, বর্তমানে পাথরঘাটার সমুদ্রগামী প্রতিটি মাছ ধরার ট্রলারকেই ব্যারেল প্রতি প্রায় ২ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি দাম দিয়েই কিনতে হচ্ছে ডিজেল, এমন অভিযোগ জেলেদের।
মাছ শিকারে যাওয়া জেলেদের মধ্যে মো. আবুল কাশেম নামে এক জেলে ঢাকা পোস্টকে বলেন, আগে ২১ হাজার টাকা ব্যারেল দামে ট্রলারের জন্য তেল ক্রয় করতাম। বর্তমানে যা ২৬-২৭ হাজার টাকা পর্যন্ত রাখা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলে তেল নাই অন্য কোথাও থেকে এনে দিতে হবে। আবার অনেক সময় দু-এক দিন দেরিও করেন তারা। এমনিতেই এখন নদীতে মাছ কম, অপরদিকে তেল কিনতেই ২০-২৫ হাজার টাকা বেশি খরচ হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
সমুদ্রগামী একটি ট্রলারের মালিক মো. খাইরুল ঢাকা পোস্টকে বলেন, বর্তমানে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অনেকদিন ধরেই আমাদের জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হয়েছে। তবে বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের কাছে তেল মজুত করা থকলেও তারা আমাদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করছেন। অথচ ডিপো থেকে তারা তেল পাচ্ছেন, কিন্তু আমাদেরকে বলে বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে। প্রতি ব্যারেল যেখানে ২১ হাজার টাকায় পাওয়া যেতো, সেখানে এখন ২৫-২৬ হাজার টাকায় এক ব্যারেল ডিজেল কিনতে হচ্ছে। মোবাইলে দেখে এবং বিভিন্ন মাধ্যমে জেনেছি, সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে। কিন্তু তেলের দাম বাড়ায়নি। সাধারণ ব্যাবসায়ীরা তেলের দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছেন। জ্বালানি তেল যদি না পাওয়া যায় তাহলে ট্রলার নিয়ে জেলেরা আর সাগরে যেতে পারবে না বলেও জানান তিনি।
বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সহসভাপতি ও ট্রলার মালিক আবুল হোসেন ফরাজি ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে শুনেছি তেলের দাম বাড়েনি। কিন্তু পাথরঘাটায় তেলের দাম ঊর্ধ্বগতি। যেসব ব্যবসায়ীদের থেকে আমরা তেল ক্রয় করতাম, তারা এখন বলে তেল নেই। কিন্তু বেশি টাকা দিলেই তেল পাওয়া যাচ্ছে। বেশি দামে তেল কিনতে হয় বলে বেশি দামে বিক্রি করতে হয় জানালেও ব্যবসায়ীদের কাছে মূল্য রশিদ দেখতে চাইলে তারা তা দেখান না। সামনেই মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা শুরু হবে, তার আগেই জেলেরা ট্রলার নিয়ে মাছ শিকারে সমুদ্রে যেতে চান। কিন্তু তেল পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ বেশি টাকা দিলেই তেল পাওয়া যাচ্ছে। সরকারিভাবে আমরা শুনি তেলের কোনো সংকট নাই, কিন্তু আমাদের তেল কিনতে হয় বেশি টাকায়।
বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, প্রথমদিকে পাথরঘাটায় ট্রলারগুলোতে তেল পাওয়া যায়নি। সপ্তাহখানেক আগে কোনো তেলই ছিল না। তবে কয়েকদিন আগে ট্যাংকার এসে চাহিদা অনুযায়ী ব্যবসায়ীদের তেল সরবরাহ করেছে। কিন্তু আমরা যখন তেল কিনতে যাই তখন প্রায় ৫ হাজার টাকা বেশি দিয়ে তেল কিনতে হয়। এ ছাড়া, পরিচিতদের কাছেই শুধু তেল বিক্রি করা হয়, অন্যরা তেল কিনতে চাইলে বলে তেল নাই। বড় বড় চার-পাঁচজন ব্যবসায়ী সবার কাছেই তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও তারা দাম কমাচ্ছে না। ইচ্ছে অনুযায়ী দাম বাড়িয়ে তারা তেল বিক্রি করছেন। এ কারণে অধিকাংশ ট্রলারেই এখন তেল কিনতে পারছে না। অতিরিক্ত প্রায় ১০-১৫ হাজার টাকা বেশি খরচ করে সাগরে যাবে এমন সাধ্যও অনেকের নেই। অথচ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তেমন কেনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতেও দেখছি না।
বিজ্ঞাপন
অতিরিক্ত দামে ডিজেল বিক্রির রশিদ থাকা মেসার্স বেলাল স্টোরের ব্যবসায়ী মো. বেলাল হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিক্রয় রশিদটি আমার দোকানের হলেও হাতের লেখা আমার না। এটি কম্পিউটারের দোকান থেকে যে কেউ তৈরি করতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আমাদের যে পরিমাণ চাহিদা সে অনুযায়ী তেল আসে না। আমরা ট্যাংকার থেকেই তেল পাই এবং যা পাই তাই বিক্রি করি। আমাদের দেওয়া হয় ১০-১৫ ব্যারেল, কিন্তু চাহিদা আছে ৫০-৬০ ব্যারেলের। মাত্র ১০টি ট্রলারের বাজারের সঙ্গে ৫০-৬০ ব্যারেল তেল প্রয়োজন হয়, কিন্তু পেয়েছি মাত্র ১৫ ব্যারেল। চাহিদা বেশি থাকায় অনেক সময় অন্য দোকান থেকে বেশি দামে কিনে এনে বিক্রি করতে হয়। আবার বর্তমান সময়ে যে দামে তেল কিনি সেই দামেও বিক্রি করতে হচ্ছে।
পাথরঘটার আল মামুন এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে ট্রলারে বিভিন্ন ধরনের বাজার সামগ্রী ও জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে সমুদ্রে মাছ শিকার করতে যান জেলেরা। ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ী মো. আফজাল শরীফ ঢাকা পোস্টকে বলেন, গত দুই সপ্তাহ জাহাজ থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ ছিল। এ অবস্থায় অনেক ব্যবসয়ীর কাছে ১০ থেকে ১৫ ব্যারেল তেল ছিল, তারা একটা সুযোগ পেয়েছে। অনেক ব্যবসায়ীর কাছে ফোন করে খোঁজ নিয়েছি, তারা বলে তেল নাই। যদের কাছে আছে তারা বলে ব্যারেল প্রতি ২৩ হাজার টাকা লাগবে। এখন সংকটের মধ্যে দু-এক যায়গায় তেল পাওয়া গেলেও এক টাকার তা তিন টাকায় কিনতে হয়। কিছুদিন আগে একটি ট্রলারে ২৩ হাজার টাকা ব্যারেল দরে তিন ব্যারেল তেল কিনে দিয়েছি।
পাথরঘাটার বিভিন্ন জেলে ও ট্রলার মালিকদের এমন অভিযোগ এবং এ বিষয়ে কি ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে জানতে চাইলে, বরগুনা জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) অনিমেষ বিশ্বাস কোনো বক্তব্য না দিলেও জেলা প্রশাসন বা উপজেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন বলে জানিয়েছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা।
বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, সারাদেশ এবং বিশ্বজুড়েই তেল সংকট দেখা দিয়েছে। আমাদের যেসব জেলেরা তেল পাচ্ছেন না তারা কেউ আমাদেরকে এখন পর্যন্ত লিখিতভাবে জানাননি। যদি জানাতেন তাহলে আমরা আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করতাম। এ ছাড়া, যদি বাড়তি দামে কেউ তেল বিক্রি করেন, তাহলে জেলা প্রশাসন বা উপজেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। কারণ বেশি দামে তেল বিক্রির কোনো সুযোগ নেই।
মো. আব্দুল আলীম/এএমকে
