প্রতিনিয়ত সমাজে চরম অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হন হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষের। মৃত্যুর পরও বঞ্চনা তাদের পিছু ছাড়ে না। স্থানীয় সামাজিক কবরস্থানগুলোতে তাদের লাশ দাফন করতে বাধা দেওয়া হয়। তাদের কপালে জোটে না একটুখানি মাটিও। অবশেষে দীর্ঘদিনের এই আক্ষেপ আর কষ্টের অবশেষে অবসান ঘটল নাটোরের গুরুদাসপুরে হিজরা সম্প্রদায়ের (তৃতীয় লিঙ্গ) মানুষের।
বিজ্ঞাপন
তাদের কবরস্থানের জন্য উপজেলা প্রশাসনের অর্থায়নে কেনা হয়েছে জমি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা আফরোজের চেষ্টায় এখন যেন মরে শান্তি পাবেন অবহেলিত সম্প্রদায়ের এই মানুষেরা।
সোমবার (৬ এপ্রিল) সকালে উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের কুমারখালী গ্রামে গিয়ে হিজড় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, মৃত্যুর পর দাফন নিয়ে এই সম্প্রদায়ের মানুষদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।
জানা যায়, তিন বছর আগে মারা যান তৃতীয় লিঙ্গের সদস্য ছোহা (৩০)। সেদিন স্থানীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করতে দেননি এলাকাবাসী। নিরুপায় হয়ে তার পরিবারের লোকজন এসে তাকে নিজ গ্রামে নিয়ে কবর দেন। আরও করুণ পরিণতি হয় গুরুদাসপুর উপজেলা হিজড়া সম্প্রদায়ের গুরুমাতা নদী সরকারের বাবা মৃত আহাদ আলীর ক্ষেত্রেও। হিজড়ার বাবা হওয়ায় মারা যাওয়ার পর তাকেও গ্রামের সামাজিক কবরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হয়নি। পরে তাকে কবর দেওয়া হয় বাড়ির আঙ্গিনায়।
বিজ্ঞাপন

দীর্ঘদিনের সেই বুকভরা আক্ষেপের কথা সম্প্রতি উপজেলার একটি সমন্বয় সভায় তুলে ধরেন গুরুমাতা নদী সরকার। এরপরই বিষয়টি সমাধানে এগিয়ে আসেন গুরুদাসপুরের ইউএনও ফাহমিদা আফরোজ। তার উদ্যোগে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের দাফনের জন্য কেনা হয়েছে ৪ শতাংশ জমি।
গত ৩১ মার্চ (মঙ্গলবার) দুপুরে ইউএনও ফাহমিদা আফরোজ আনুষ্ঠানিকভাবে ওই জমির দলিল তুলে দেন গুরুমাতা নদী সরকারের হাতে। জমিটি কেনা হয়েছে উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের কুমারখালী গ্রামের ব্যবসায়ী তৌফিক আলীর কাছ থেকে। ৫ লাখ ১০ হাজার টাকা মূল্যের এই জমি ক্রয়ের জন্য ৫ সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। আইনি সুবিধার্থে গ্রহিতা হিসেবে হিজড়াদের পক্ষে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে দলিলে দেখানো হয়েছে।
গুরুদাসপুর উপজেলা তৃতীয় লিঙ্গ কমিটি জানায়, পুরো উপজেলায় তাদের ৪৫ জন সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে কেবল কুমারখালী গ্রামেই থাকেন ২১ জন। তাদের স্থায়ী কোনো কর্মসংস্থান বা নির্ভরযোগ্য আবাসন নেই। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন এসব মানুষের সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় ছিল মৃত্যুর পর লাশ দাফন।
বিজ্ঞাপন
নিজেদের নামে স্থায়ী কবরস্থান পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন তৃতীয় লিঙ্গের নুপুর, সোনালী, সৌখীন, মাধবী, ইতি ও দিপারা। তারা বলেন, স্থানীয় লোকজন আমাদের কটুকথা বলে। হিজড়া হয়ে জন্মানো তো আমাদের অপরাধ নয়। সমাজ আমাদের সব সময় আলাদা করে রাখে। বেঁচে থাকতে কেউ পাশে দাঁড়াতে চায় না, আবার মৃত্যুর পরও চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। গ্রামের কবরস্থানে আমাদের জায়গা দেওয়া হয় না। এখন অন্তত নিজেদের মাটিতে আমাদের চিরনিদ্রার ব্যবস্থা হলো। লাশ দাফনে আর কেউ বাধা দিতে পারবে না ভেবে অনেক ভালো লাগছে।
গুরুমাতা নদী সরকার বলেন, এতদিন আমাদের কোনো শেষ ঠিকানা ছিল না। বাবার লাশটাও সামাজিক কবরস্থানে দাফন করতে পারিনি। ইউএনও স্যারের চেষ্টায় আমরা আজ শেষ ঠিকানা পেলাম। আমরা তার কাছে চিরকৃতজ্ঞ।
গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা আফরোজ বলেন, মৃত্যুর পরও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সামাজিক কবরস্থানে দাফন করতে না দেওয়ার বিষয়টি জেনে আমি অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছি। অন্তত শেষ বিদায়ের পর তারা যেন নিজেদের মাটিতে একটু ঠাঁই পান, সেই ভাবনা থেকেই এই ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তিনি জানান, সমাজে পিছিয়ে পড়া এই অবহেলিত জনগোষ্ঠীর সদস্যদের কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও নানা ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।
আশিকুর রহমান/আরকে
