চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় বর্তমানে মোটরসাইকেলের শোরুমগুলোতে নেমে এসেছে স্থবিরতা। এক সময়ের কর্মব্যস্ত শোরুমগুলোতে এখন শুধুই নিস্তব্ধতা, যেখানে সময় কাটছে অলসভাবে। জেলার ডিলার ও শোরুম কর্তৃপক্ষরা জানিয়েছেন, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের সংকট এবং পাম্পগুলোতে তেলের লাইনের দীর্ঘ ভিড়ের কারণে সাধারণ মানুষ এখন নতুন মোটরসাইকেল কেনার ক্ষেত্রে বিমুখ হয়ে পড়েছেন। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে এই খাতের ব্যবসায়ীদের ওপর। বিক্রি তলানিতে ঠেকায় অনেক শোরুমের পক্ষে এখন নিয়মিত ভাড়া মেটানো এবং কর্মীদের বেতন পরিশোধ করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তবে শোরুমগুলোতে নতুন বাইক বিক্রিতে ভাটা পড়লেও নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় অ্যাপসের মাধ্যমে নিবন্ধিত মোটরসাইকেল চালকদের পাঁচ দিনের জন্য ৫০০ টাকার জ্বালানি তেল দেওয়া হচ্ছে। এই ফলে মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের মধ্যে এখন নিজেদের গাড়ি নিবন্ধনের হিড়িক পড়েছে। ফলে বিক্রয় কেন্দ্রে ক্রেতা না থাকলেও নিবন্ধনের ফাইল প্রক্রিয়াকরণের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।
এদিকে মোটরসাইকেল নিবন্ধনের এই বাড়তি চাপ গিয়ে পড়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিআরটিএ কার্যালয়ের ওপর। জেলা বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগের তুলনায় বর্তমানে মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশন এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদনের সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। হঠাৎ করে আবেদনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় সীমিত জনবল নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে বিভাগটি। জনবল সংকটের মধ্যেও গ্রাহকদের সাধ্যমতো সেবা দিতে এবং যত দ্রুত সম্ভব দাপ্তরিক কাজ শেষ করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বিআরটিএ কর্মকর্তারা।
বাজাজ শোরুমের ম্যানেজার ওবাইদুল ইসলাম টুটুল বলেন, আমাদের গাড়ির ব্যবসা একসময় খুব ভালো ছিল। তেলের সংকটের কারণে বেচাকেনা খুবই খারাপ যাচ্ছে। এতো খারাপ অবস্থা যে, আমাদের চলাই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। যেখানে আমাদের প্রতিমাসে নিম্নে ৭০ থেকে ৮০টি গাড়ি বিক্রি হতো, সেখানে গত মাসে গাড়ি সেল করেছি মাত্র ২৭টা। আর এই মাসে গাড়ি সেল হয়েছে আজ পর্যন্ত ৭টা। তাই মেইন সমস্যা সম্ভবত তেলের কারণেই হচ্ছে। তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন, অ্যাপসের মাধ্যমে তেল দেওয়া এবং মানুষ তেল পাচ্ছে না। তেলের জন্য হাহাকার। এ কারণেই আমাদের বেচাবিক্রিটা অনেকটায় কমে গেছে। এছাড়া অ্যাপসে তেল দেওয়ার কারণে রেজিস্ট্রেশনের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে। আগে যা বিক্রি করতাম তার তিন ভাগের এক ভাগ রেজিস্ট্রেশন হতো, এখন বর্তমানে রেজিস্ট্রেশন ছাড়া গাড়ি শোরুম থেকে বের হচ্ছে না।
বিজ্ঞাপন
শাহরিয়ার ইসলাম শুভ নামের এক মোটরসাইকেল ক্রেতা বলেন, রেজিস্ট্রেশন ছাড়া তেল পাওয়া যাচ্ছে না পাম্পে। রেজিস্ট্রেশন করতে কিন্তু সময় লাগছে। টাকা জমা দেওয়ার পরেও সরকার একটা টাইম নিচ্ছে। সেই টাইম নিতে গিয়ে আমার গাড়িটা অফ হয়ে থাকছে। রেজিস্ট্রেশনের টাকা জমা দেওয়ার পরও নম্বর প্লেট না থাকার বা দেরিতে পাওয়ার কারণে আমরা পাম্পে তেল পাচ্ছি না।
কামাল মোটরসের স্বত্বাধিকারী ইকবাল আহমেদ বলেন, বর্তমানে তেলের সংকটের কারণে মোটরসাইকেল ব্যবসায় মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। আসলে ৯৫ ভাগ মোটরসাইকেল কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহারের জন্য। মোটরসাইকেল বিলাসিতার বিষয় না। মানুষ ব্যক্তিগত প্রয়োজনেই মোটরসাইকেল ব্যবহার করে। মোটরসাইকেলে তেলও বেশি লাগে না। ৫ লিটার তেলে ৫ দিন চলে যাবে। কিন্তু তেলের ব্যাপক সংকটের কারণে মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজের যেমন ব্যাপক সমস্যা হচ্ছে, তেমনই মোটরসাইকেল ব্যবসায়ীদের মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। এই মন্দাভাব দূর করা খুবই সহজ। তাই সরকারের কাছে অনুরোধ, মোটরসাইকেলের তেলটা যেন সহজলভ্য করে দেয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের তেল পাম্পগুলো পরিদর্শন শেষে বিআরটিএ, জেলার সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. শাহজামান হক বলেন, অ্যাপসের মাধ্যমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে যে তেল বিতরণ হচ্ছে- তা নিয়ে গ্রাহকের অবজারভেশন নেওয়ার জন্য আসছি, যে এখানে তারা সন্তুষ্ট কিনা বা এটা নিয়ে কোনো ত্রুটি বিচ্যুতি আছে কিনা। যদি কোনো ত্রুটি বিচ্যুতি থাকে, তাহলে সেটা আমরা নিরূপণ করব। এছাড়াও সিস্টেমটার রিভিউটা কেমন, জনগণ কীভাবে নিচ্ছে এটাকে সেটা দেখার জন্য এই ভিজিট।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, একটি গাড়ি ক্রয় করার পরে ব্যাংক জমার রশিদ দিয়ে রাস্তায় বাইকরা গাড়ি বের করে ফেলছে। ব্যাংক জমার রশিদে যে ট্রাকিং নম্বরটা আছে, অতএব সরকার যে রাজস্বটা আদায় করেছে, সেই ট্রাকিং নম্বরটা এখানে ব্যবহার করে তারা এখানে তেল পাচ্ছে। আমাদের অনুরোধ থাকবে যেন, প্রত্যেকটা বাইকার তাদের রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করে যেন তারা রাস্তায় বাইক চালায়। এছাড়া আগের চেয়ে মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশন ও ড্রাইভিং লাইসেন্স-এর নিবন্ধনের পরিমাণ বেড়ে গেছে। ফলে আমাদের জনবল সংকট রয়েছে, সামাল দিতে বেগ পেতে হচ্ছে। তারপরেও আমরা সরকারের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানায়। সবাই যেন নিয়মের মধ্যে থাকে। নিজের স্বার্থেই রেজিস্ট্রেশন করা উচিত। কারণ যখন একটা বৈধ কাগজ নিয়ে রাস্তায় নামব, তখন আমার মনোবল ও দেশের আইন দুইটাই বৃদ্ধি পাবে। তাই আমরা যথেষ্ট সচেষ্ট রয়েছি এবং যত দ্রুত পারছি আমরা নিষ্পত্তি করে দিচ্ছি।
আশিক আলী/এসএইচএ
