শেষ বিদায়ের বন্ধু তারা

Dhaka Post Desk

ওমর ফারুক নাঈম, মৌলভীবাজার

০৭ আগস্ট ২০২১, ১১:৪৫ এএম


শেষ বিদায়ের বন্ধু তারা

তাদের বিশ্রাম নেই। যখনই খবর আসে তখনই ছুটে চলেন। মুষল বৃষ্টি বা তীব্র রোদ- সবই তুচ্ছ। কারণ, ডাক এসেছে করোনায় মৃত ব্যক্তিকে শেষ বিদায় জানানোর। 

মৌলভীবাজারের সামাজিক সংগঠন শেখ বোরহান উদ্দিন (রহ.) ইসলামী সোসাইটি (বিআইএস)। করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরু থেকে করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তির লাশ দাফন-কাফন ও সৎকারের কাজ করে আসছেন সংগঠনটির স্বেচ্ছাসেবীরা। 

করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তির পরিবারের স্বজনেরা যখন লাশের পাশে আসেননি, তখন এই স্বেচ্ছাসেবীরা দাফন-কাফন ও সৎকারের কাজ করছেন। কোথাও দাফন-কাফন বা সৎকারের প্রয়োজন হলে তারা ছুটে গেছেন। এ পর্যন্ত সংগঠনটি ৩৩ জনের লাশ দাফন-কাফন ও সৎকারের কাজ সম্পন্ন করেছে। 

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান সদর উপজেলার একাটুনা ইউনিয়নের বিরাইমাবাদ এলাকার শেখ শফিকুর রহমান তালুকদার। তার লাশ দাফন ও কাফনের দায়িত্ব নেয় শেখ বোরহান উদ্দিন রহঃ ইসলামী সোসাইটি (বিআইএস)। মুষলধারে বৃষ্টি। পায়ের নিচে হাঁটু পানি। এমন প্রতিকূলতার মধ্যে লাশ দাফন করে দাফন-কাফন ও সৎকার টিমের সদস্যরা। জানাজার নামাজে সীমিত সংখ্যক স্থানীয় মানুষ ও আত্মীয়স্বজন উপস্থিত হলেও কবরস্থানের পাশে নেই তেমন কেউ। যারা উপস্থিত হয়েছেন সবাই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখছেন।

অভিজ্ঞতা জানিয়ে সিরাজুল হাসান ঢাকা পোস্টকে বলেন, মহামারি করোনার সময় আমরা আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম। এই করুণ পরিস্থিতিতে স্ত্রী আসে না স্বামীর লাশের পাশে। ছেলে বাবার লাশ দেখতে আসে না। প্রতিবেশী কেউ পাশে নেই। এরকম পরিস্থিতিতে আমরা চার-পাঁচজন রাত দুইটা থেকে তিনটা পর্যন্ত কাজ করেছি। আমরা চেষ্টা করেছি একজন মানুষের শেষ বিদায়টা সম্মান ও ভালোবাসার সঙ্গে যেন হয়। 

স্বেচ্ছাসেবক সোহান রহমান বলেন, আপনজন আপনজনের পাশে থাকে না এই করোনাকালে। কেউই আসতে চায় না জীবনের ভয়ে। 

কিন্তু একজন মানুষের দাফন করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে হয় আমার। ভালোলাগা থেকেই স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দিয়েছি। 

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিআইএস ২০০১ সাল থেকে বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত। করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরু থেকেই মাস্ক, স্যানিটাইজার বিতরণসহ সচেতনতামূলক কাজ করছে। সংগঠনের উদ্যোগে আশরাফুল খান রুহেলকে প্রধান করে গঠন করা হয়েছে ৪০ সদস্যের দাফন-কাফন ও সৎকার টিম। এ কাজে যুক্ত হওয়া সহজ ছিল না। পরিবার থেকে অনেককে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। তবু নানা কৌশলে তারা যুক্ত থেকেছেন। আবার কোনো কোনো পরিবার তাদের কাজে উৎসাহও জুগিয়েছে। এসব কাজ করতে গিয়ে তারা মানুষের ভেতরের রূপটা দেখেছেন। এসব কাজে অনেকের কাছ থেকেই পিপিই, মাস্ক ও স্যানিটাইজার পেয়েছেন তারা। কেউ দিয়েছেন পরিবহন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার অর্থ।

শেখ বোরহান উদ্দিন সোসাইটির সদস্য সচিব রাসেল আহমদ বলেন, করোনা মহামারি যখন শুরু হয়েছিল তখন থেকেই আমাদের এই সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যারা করোনা আক্রান্ত হয়ে অথবা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন আমরা তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। একমাত্র আল্লাহর কাছ থেকে সওয়াব পাওয়ার জন্য এই কাজে নেমেছি। আমরা কোনো বিনিময় নেই না।

বিআইএসের চেয়ারম্যান এম মুহিবুর রহমান মুহিব বলেন, আমরা একেকটি দাফনে গিয়ে একেক রকমের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। অনেকে এসে জানাজা পড়ছেন কিন্তু লাশ কিংবা কবরের পাশে কেউ আসছেন না। আমাদের টিমের দৃঢ় মনোবল আছে, যতই ক্লান্তি আসুক আমাদের এই মানবিক কাজটি থামিয়ে রাখব না। 

এইচকে

Link copied