আমাদের কষ্ট কারোরই অনুভব হয় না

Dhaka Post Desk

ইমরান আলী সোহাগ, দিনাজপুর

২০ জানুয়ারি ২০২২, ০৫:১০ পিএম


অডিও শুনুন

দিনাজপুর সদর উপজেলার সুন্দরবন ইউনিয়নের সুন্দরবন গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে গর্ভেশ্বরী নদী। নদীর দুপাড়ের কয়েকটি গ্রামের হাজারো বাসিন্দার ভোগান্তি ছিল দীর্ঘদিন ধরে। তাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প থেকে একটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেতু নির্মাণের কথা শুনে ও কাজ শুরু হওয়ায় এলাকাবাসীর মনে খুশির জোয়ার বয়েছিল। একসময় শেষ হয় সেতুর কাজ। অপেক্ষা ছিল উদ্বোধনের।

কিন্তু গ্রামবাসীর এ আনন্দ নিরান্দ হয়ে দেখা দিল। ২০১৭ সালের বন্যায় পার্শ্ববর্তী আত্রাই নদের বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে যায়। পানির স্রোত এসে সেতুটির মাঝখান ধসে নিয়ে যায়। আর এভাবেই পাঁচ বছর ধরে পড়ে আছে অনেক আকাঙ্ক্ষিত সেতুটি। ফলে আবার সেই ভোগান্তিতে ফিরে যেতে হয় অসহায় মানুষগুলোকে।

স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, সুন্দরবন ইউনিয়নের বেগুনপাড়া, সনকাহাট, কাচারীবাজার, পরেশ ডাক্তারপাড়া, কান্তনগর, কাহারোলের বাসিন্দাদের রামডুবিহাট, ভূষিরবন্দর অথবা রানীরবন্দরে সংক্ষিপ্ত যাতায়াতের একমাত্র সড়ক ছিল এই গর্ভেশ্বরী নদীর ওপর দিয়ে। এখন শীতকালে পানির প্রবাহ না থাকায় নদী শুকিয়ে আছে। তাই এর বুকের ওপর দিয়ে চলাচল করা যাচ্ছে। কিন্তু বর্ষাকালে তো আবার ডুবে টইটম্বুর হয় নদী। তখন ভোগান্তির শেষ থাকে না এলাকার বাসিন্দাদের।

আত্রাই নদের ওপর নির্মিত বাঁধ ঘুরে তাদের যাতায়াত করতে হয় কয়েক কিলোমিটার এলাকা। তাই গর্ভেশ্বরী নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের দাবি এখন তাদের প্রাণের দাবি।

Dhaka Post

এদিকে সেতুটি ভাঙার পরে সেতু মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি হয়েছে। মাঝেমধ্যে এসে ঘুরে যান তদন্ত কমিটির লোকজন। যাওয়ার পর আর কোনো সুখবর পান না তারা। তাই আজ অবধি সেভাবেই পড়ে আছে সেতুটি।

দিনাজপুর সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সুন্দরবন গ্রামের ধরধরিয়া হাড়গাঁও বাবুর বাজার থেকে ঝাড়ুয়াপাড়ায় যাওয়ার রাস্তায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৫৪ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতুটি নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তা ছিলেন তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা।

সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ভাঙা সেতুটি। দুধারে নেই সংযোগ সড়ক। নদীতে পানি না থাকায় নদীর বুক দিয়ে চলাচল করছে মানুষ, ভ্যান, মোটরসাইকেল সাইকেল ও ট্রাক্টর। খুব কষ্ট করে সামান্য পরিমাণ মালমাল নিয়ে কয়েকজন মিলে একটি একটি করে ভ্যান ঠেলা নদীর ওপরের রাস্তা উঠছে।

ভ্যানচালক রামিনি কান্ত ঢাকা পোস্টকে বলেন, এই সেতুটি উদ্বোবন হওয়ার আগের দিন রাতে বন্যার পানিতে ভেঙে গেছে। নতুন করে সেতু হবে বলেছে। কিন্তু পাঁচ বছর পার হলেও সেতু আর হলো না। নদীর দুই পারের মানুষের কী পরিমাণ কষ্ট হয় তা বলে বোঝানো যাবে না। স্থানীয় চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সঙ্গে গ্রামের মানুষের ঝগড়া-বিবাদ হয়েছে, তবু হলো না।

ক্ষোভ নিয়ে সুন্দরবন গ্রামের ময়েন উদ্দিন বলেন, নতুন ব্রিজটা ভাঙার প্রায় ছয় বছর হয়ে গেল। শও শও ছাওয়া পওয়া বর্ষার সময় স্কুল যাবার পারে না। দূরে দিয়ে ঘুরে আইল দিয়া যায়। চেয়ারম্যান-মেম্বাররা খালি আইসে আর দেখে কিন্তু কোনো কাজ হয় না। ব্রিজটা চালু হওয়ার দুই দিন আগেই ভাঙ্গি গেল। এতদিন হয়া গেল এমপিও দেখা পায় না, চেয়রম্যানও দেখা পায় না মানুষে ভোগান্তি। আমরা চাই ব্রিজটা তাড়াতাড়ি করি হউক।

Dhaka Post

কলেজশিক্ষার্থী বিনয় রায় জানায়, এখন না হয় শুকনা তাই পার হওয়া যায়, কিন্তু বর্ষার সময় ব্রিজের নিচের রাস্তাটিতে পানি থাকে। এ জন্য প্রায় দুই কিমি রাস্তা ঘুরে নদী পার হয়ে স্কুল-কলেজে যেতে হয়। আমাদের কষ্ট কারোরই অনুভব হয় না।

রহিম উদ্দিন বলেন, রাস্তাটা নিয়া কত ঝগড়া, মারামারি পর্যন্ত হইছে। এই ভাঙ্গা পুলখানের জন্য মানুষের জমি দিয়া যাইতি হয়। মানুষ রাস্তা দেয় না। কয় হামার আবাদি জমির উপর দিয়া রাস্তা দিম না। ভাঙ্গা পুলের উপর দিয়া যাবার কয়। মানুষের কত ভোগান্তি, এইলা কয়া বুঝ যাইবে না।

এ বিষয়ে সুন্দরবন ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান অশোক কুমার রায়ের সঙ্গে গতকাল বুধবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বৃহস্পতিবার তাকে পাওয়া গেলেও তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. জসিমউদ্দীন মুঠোফোনে জানান, সেতুটি ২০১৭ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই সময় সারাদেশে শত শত সেতু-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এ সেতু নিয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি একাধিকবার পরিদর্শন করেছে। তবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।

এনএ

Link copied