ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির ‘শাহাদাতের ৪০ দিন’ বা ‘চেহলাম’ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। ডাকসু ও আল মুস্তফা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে ফিলিস্তিন ইস্যু, মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব, ঐক্য এবং বাংলাদেশ-ইরান সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়।
বিজ্ঞাপন
সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে তিনটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের দ্বিতীয় তলায় মোজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে ‘দ্য পলিটিক্যাল অ্যান্ড রিলিজিয়াস লিডারশিপ অব সাইয়্যেদ আলী খামেনি: থিওরি অ্যান্ড প্র্যাকটিস ইন দ্য ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত অধ্যাপক জালিল রাহিমি জাহানাবাদি। বিশেষ অতিথি ছিলেন ‘দৈনিক আমার দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান।
সেমিনারে ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, ইমাম খোমেনি বেঁচে থাকলে বাংলাদেশকে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত দেশ হিসেবে বিবেচনা করে জ্বালানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও সহযোগিতা করতেন। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে মুসলিম উম্মাহর জন্য সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা হলো ইসরায়েলের উত্থান এবং ফিলিস্তিনে চলমান দখলদারিত্ব ও হত্যাযজ্ঞ।
বিজ্ঞাপন
মুসাদ্দিক আলী বলেন, মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং ফিলিস্তিন মুক্তির স্বপ্ন খুব কম নেতাই দেখেছেন এবং সেই লড়াইও খুব কম নেতা ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে গেছেন। সৌদি আরবের বাদশাহ ফয়সাল ১৯৭৩ সালে তেল নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিয়েছিলেন। তবে তার হত্যার পর মুসলিম বিশ্বের দৃঢ় নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর ইমাম খোমেনি ফিলিস্তিন প্রশ্নকে মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রীয় ইস্যু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। রমজানের শেষ জুমাকে ‘আল-কুদস দিবস’ হিসেবে ঘোষণার মধ্য দিয়ে তিনি বৈশ্বিক সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মাহমুদুর রহমান বলেন, সাত দশকের বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনিদের ভূমি দখল করে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও এর বিস্তার একটি নব্য-ঔপনিবেশিক প্রকল্প, যা পশ্চিমা শক্তির সমর্থনে পরিচালিত হয়েছে। তিনি বলেন, মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ বিভাজন, বিশেষ করে শিয়া-সুন্নি বিভেদ এবং প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতায় পিছিয়ে থাকা দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও মুসলিম বিশ্ব কৌশলগতভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইরানের জনগণের সাহস ও প্রতিরোধ মুসলিম বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
মাহমুদুর রহমান বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক উত্তেজনা, যুদ্ধ পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকট পুরো বিশ্বের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। তিনি যুদ্ধের পরিবর্তে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক সংলাপের পক্ষে মত দেন। একই সঙ্গে প্রতিটি জাতির আত্মরক্ষার অধিকারেও সমর্থন জানান। বাংলাদেশ ও ইরানের সম্পর্ক আরও গভীর হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন মাহমুদুর রহমান।
ইরানের রাষ্ট্রদূত অধ্যাপক জালিল রাহিমি জাহানাবাদি বলেন, ‘আমাদের ভাবতে হবে—আমরা কি এমন অবস্থায় পৌঁছেছি, যেখানে এতগুলো মুসলিম রাষ্ট্র থাকা সত্ত্বেও ফিলিস্তিন ও গাজার জনগণের ওপর এত ভয়াবহ নির্যাতন চলছে, অথচ আমরা নিকটবর্তী হয়েও কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারছি না? হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে এসে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র যখন গাজার নিরীহ মানুষের ওপর হামলা চালায়, তাদের হত্যা করে, তখন আমাদের ব্যর্থতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমরা কি শুধুই অনুষ্ঠান ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকব, নাকি বাস্তব অবস্থার প্রতি দায়িত্বশীল ভূমিকা নেব—এই প্রশ্ন আমাদের নিজেদেরই করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘গাজার শহীদ শিশুদের কথা, ইরানের বিভিন্ন স্থানে শহীদ হওয়া নিরপরাধ মানুষদের কথা—এসব আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়া উচিত। একইভাবে বিশ্ব রাজনীতিতে যারা নিজেদেরকে “শান্তি ও নিরাপত্তার রক্ষক” হিসেবে দাবি করে, তাদের কর্মকাণ্ডও আমাদের সামনে প্রশ্ন তোলে। ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একসময় ইউরোপে বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা, চিকিৎসা ও জ্ঞানচর্চার উন্নয়ন হয়েছিল, কিন্তু সেই সময়েও অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সত্য উচ্চারণকারী অনেকেই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আজ আমাদের প্রশ্ন করতে হবে—আমাদের উম্মাহর শক্তি কোথায় হারিয়ে গেল? কেন আমরা এত বিভক্ত? কেন এত দুর্বলতা?’
জালিল রাহিমি আরও বলেন, ‘ইতিহাসে আমরা দেখেছি, সালাহউদ্দিন আইয়ুবী, শহীদ নেতৃবৃন্দ এবং প্রতিরোধের কণ্ঠস্বরেরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। সর্বশেষ সময়েও যারা প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছেন, তাদের ত্যাগ আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান দৃঢ় করতে হবে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মিথ্যা ও জুলুমের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। আমি ইরানের জনগণের জন্য দোয়ার অনুরোধ করছি। আল্লাহ যেন তাদের হেফাজত করেন এবং তাদের ধৈর্য ও শক্তি দান করেন।’
সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক এম এম আল মিনহাজ, ক্রীড়া সম্পাদক আরমান হোসেন, কার্যনির্বাহী সদস্য বেলাই হোসাইন অপুসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীবৃন্দ।
এসএআর/এনটি
