তথ্যের স্রোতে নির্ভরতার খোঁজ—শুভ জন্মদিন ঢাকা পোস্ট

ফাল্গুনের পলাশ রাঙানো দিনে এই শহরে যখন যান্ত্রিক ব্যস্ততার আড়মোড় ভাঙে, ঠিক তখনই ডিজিটাল দুনিয়ার পর্দায় ভেসে ওঠে অজস্র খবর। তথ্যের এই অবাধ প্রবাহে সত্য আর মিথ্যার ভেদ করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতাকে সঙ্গী করেই পাঁচ বছর আগে যাত্রা শুরু করেছিল ‘ঢাকা পোস্ট’। আজ ১৬ ফেব্রুয়ারি-২০২৬। ক্যালেন্ডারের পাতায় ৫ বছর পূর্ণ করে ষষ্ঠ বছরে পা রাখল সংবাদমাধ্যমটি।
সময়ের হিসেবে এই পথচলা খুব দীর্ঘ নয়। তবে অর্জনের পাল্লা একেবারে হালকা নয়।
একসময় দেখা যেত, ভোরবেলা মানেই ছিল বারান্দায় চায়ের কাপ আর হাতে খবরের কাগজ। এখন সময় বদলেছে। কাগজের খসখসে শব্দগুলো তেমন একটা শোনা যায় না! এখন চায়ের ধোঁয়া ওঠার আগেই স্মার্ট ফোন দেখা হয়। স্ক্রিনের রঙিন আলোয় তাৎক্ষণিক ভেসে আসে ব্রেকিং নিউজ।
ডিজিটাল দুনিয়ায় এখন তথ্যের অভাব নেই। বরং তথ্যের চেয়ে তথাকথিত ‘ভাইরাল’ হওয়ার প্রতিযোগিতা বেশি দেখা যায়। চটকদার শিরোনাম আর ভুয়া খবরের ভিড়ে আসল খবর খুঁজে পাওয়া কঠিন। পাঠকের মনে সব সময় একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়, কাকে বিশ্বাস করব? এই আস্থার সংকট দূর করাই ছিল ঢাকা পোস্টের প্রধান চ্যালেঞ্জ। এর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বলে আসছে ‘সত্যের সাথে সন্ধি’। গত পাঁচ বছরে তা প্রমাণও করেছে।
এখনকার সাংবাদিকতা আর দশ বছর আগের মতো নেই। বার্তাকক্ষের চেহারাও বদলে গেছে। লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। গুগল ট্রেন্ডস এখন বলে দেয় মানুষ ঠিক কোন বিষয়ে জানতে চাইছে। হাজার পাতার জটিল ডাটা বিশ্লেষণ করতে ব্যবহার করা হয় ডিপসিকের মতো প্রযুক্তি। তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম ব্যাপার থেকে যায় ‘প্রযুক্তি’, এটি সাংবাদিকতার গতি বাড়িয়েছে সত্য। কিন্তু এটি কখনো সাংবাদিকের বিকল্প হতে পারে না। প্রযুক্তির আবেগ নেই, অন্যায়ের বিরুদ্ধে এটি প্রতিবাদ করতে পারে না। কারও মায়ের কান্না বা বাবার হাহাকারের ভাষাগুলো এর অ্যালগরিদম দিয়ে বিশ্লেষণ করা যায় না। মানবিক এই বোধটুকুই সাংবাদিকতার আসল শক্তি।
ঢাকা পোস্ট প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেছে হাতিয়ার হিসেবে, আর চালকের আসনে রেখেছে মানুষের বিবেককে। এক সময় বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সংবাদপত্রের দায়িত্ববোধ নিয়ে আক্ষেপ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘এ দেশে লেখকের কাছে আমরা দায়িত্ব চাই না বলেই লেখকও দায়িত্ব নেন না।’ আজ ১০০ বছর পরও সেই কথা ভীষণ প্রাসঙ্গিক। অনলাইনের এই যুগে ভিউ আর লাইকের নেশায় দায়িত্ববোধ ভুলে যাওয়া খুব সহজ।
ঢাকা পোস্ট-এমন শর্ট-কার্ট পথে হাঁটেনি। তারা পাঠককে গ্রাহক নয় বরং বিচারক হিসেবে দেখে। তারা জানে পাঠক এখন অনেক বেশি সচেতন। পাঠক এখন খবরের উৎস জানতে চায়। ঘটনার পেছনের কারণ বুঝতে চায়। ‘ডিপফেক’ আর ‘গুজবের’ এই সময়ে পাঠকদের সেই চাহিদাগুলোর সম্মান জানানোই আসল সাংবাদিকতা।
স্মার্ট বাংলাদেশ মানে শুধু হাতে হাতে স্মার্টফোন নয়। স্মার্ট বাংলাদেশ মানে একটি তথ্যসমৃদ্ধ ও সচেতন সমাজ। সেই সমাজ গড়তে গণমাধ্যমের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। ঢাকা পোস্ট গত পাঁচ বছর ধরে সেই দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছে। তারা দুর্নীতির খবর যেমন প্রকাশ করেছে তেমনি তুলে এনেছে প্রান্তিক মানুষের সাফল্যের গল্পও।
ষষ্ঠ বছরে পদার্পণ করা এই প্রতিষ্ঠানের সামনের পথটা মসৃণ নয়। প্রযুক্তি প্রতিদিন বদলাচ্ছে। সেই সঙ্গে বদলাচ্ছে মানুষের রুচি। আগামী দিনের সাংবাদিকতা হবে আরও চ্যালেঞ্জিং। সেখানে টিকে থাকতে হলে বিশ্বাসযোগ্যতাই হবে একমাত্র পুঁজি।
সংবাদমাধ্যম একা পথ চলতে পারে না। পাঠক তার সবচেয়ে বড় শক্তি। পাঠকের সমালোচনা আর প্রশ্নই একটি গণমাধ্যমকে প্রাণবন্ত রাখে। ঢাকা পোস্টের এই যাত্রায় সত্যের অনুসন্ধান অব্যাহত থাকুক। অ্যালগরিদমের ভিড়ে হারিয়ে না গিয়ে তারা গণ-মানুষের কথা বলুক। মেরুদণ্ড সোজা রেখে সাংবাদিকতা করার সাহসটুকুই এখন আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। শুভ জন্মদিন ‘ঢাকা পোস্ট’।