প্রান্তিক মানুষের অব্যক্ত কণ্ঠস্বর তৃণমূল সাংবাদিকতা

একটি দেশের সামগ্রিক চিত্র কেবল রাজধানীর চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রকৃত রাষ্ট্রচিত্র গড়ে ওঠে তার নিভৃত গ্রাম, জনপদ ও মফস্বল শহরের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার সমন্বয়ে। একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা কিংবা অনলাইন নিউজ পোর্টাল তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তাতে প্রান্তিক মানুষের অব্যক্ত কণ্ঠস্বর যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়। আর সেই সুকঠিন সেতুবন্ধনটি অত্যন্ত নিপুণভাবে গড়ে তোলেন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত সাংবাদিকরা। যাদের আমরা সংবাদমাধ্যমের প্রকৃত ‘ফিল্ড সোলজার’ বা মাঠের যোদ্ধা হিসেবে অভিহিত করি।
মফস্বল সাংবাদিকতার মূল প্রাণশক্তি হলো একটি শক্তিশালী সোর্স ও নেটওয়ার্ক। যেখানে কাজের কোনো নির্দিষ্ট অফিস সময় বা ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। কারণ গভীর রাতের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড থেকে শুরু করে কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরের মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা হঠাৎ ছড়িয়ে পড়া রাজনৈতিক সংঘাতের খবর সংগ্রহে এই প্রতিনিধিদের সব সময় সজাগ ও প্রস্তুত থাকতে হয়। স্থানীয় থানা, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, আদালত কিংবা জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের হাট-বাজার বা চায়ের আড্ডার আড়ালে লুকিয়ে থাকা জনদুর্ভোগের খবরগুলো নিবিড়ভাবে খুঁজে বের করাই তাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে ‘সবার আগে খবর’ দেওয়ার এক তীব্র ও অসম প্রতিযোগিতা থাকলেও একজন প্রকৃত পেশাদার সাংবাদিকের কাছে গতির চেয়ে তথ্যের নির্ভুলতা, ভারসাম্য ও বস্তুনিষ্ঠতা অনেক বেশি মূল্যবান। কারণ একটি সামান্য ভুল তথ্য কিংবা একপাক্ষিক সংবাদ মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে বা জনমনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। তাই সংবেদনশীল ঘটনার ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বস্তুনিষ্ঠ বক্তব্য গ্রহণ করা অপরিহার্য। যা সরাসরি সাংবাদিকতার পেশাগত নৈতিকতার সাথে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত।
প্রকৃতপক্ষে নৈতিকতাই হলো মফস্বল সাংবাদিকতার মেরুদণ্ড। কারণ একজন জেলা প্রতিনিধিকে প্রায়ই স্থানীয় রাজনৈতিক চাপ, আত্মীয়তা, আঞ্চলিকতা বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে চরম নিরপেক্ষতার সাথে ধ্রুব সত্য প্রকাশ করতে হয়। যেখানে কোনো বিশেষ মহলের প্রলোভন কিংবা হুমকির মুখে পড়ে সত্য গোপন করা যেমন এই মহান পেশার চরম অবমাননা, তেমনি ব্যক্তিগত আক্রোশ বা সংকীর্ণ স্বার্থ চরিতার্থ করতে কাউকে সংবাদে হেয় করাও সাংবাদিকতার মূল আদর্শের পরিপন্থী। নৈতিকতা মেনেই সাংবাদিকতা করতে হয়, না হলে সেটাকে সাংবাদিকতা বলা যায় না। ভুয়া ও কার্ডধারী সাংবাদিকদের ভিড়ে নিজেকে প্রকৃত সাংবাদিক হিসেবে তুলে ধরতে সৎসাহস ও নৈতিকতা নিয়েই এগিয়ে যেতে হয়।
এখন আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় উৎকর্ষে সাংবাদিকতার ধরন বদলে গেছে। শুধু কেন্দ্রীয় অফিস নয়, তৃণমূলেও সেই পরিবর্তন লক্ষণীয়। এখন আর হাতে লেখা সংবাদের জন্য ডাকযোগের অপেক্ষা করতে হয় না সাংবাদিকদের। স্মার্টফোন ও উচ্চগতির ইন্টারনেটের কল্যাণে মুহূর্তেই প্রতিনিধিরা ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে ছবি ও ভিডিওসহ খবর পৌঁছে দেন কেন্দ্রীয় বার্তাকক্ষে। যেখানে দক্ষ সহ-সম্পাদকরা কাঁচা প্রতিবেদনটিকে পরম যত্নে ঘষামাজা করে একটি আকর্ষণীয় শিরোনাম ও ব্যাকরণগত নির্ভুলতার মাধ্যমে পাঠকবান্ধব করে তোলেন। এই সমন্বিত পেশাদারী প্রচেষ্টার মাধ্যমেই অনেক সময় মফস্বলের জরাজীর্ণ অবকাঠামো সংস্কার হয়, প্রশাসনের অনিয়ম ও দুর্নীতির মুখোশ উন্মোচিত হয় কিংবা কোনো অসহায় ও মেধাবী শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ানোর মতো ইতিবাচক সামাজিক ও মানবিক পরিবর্তনগুলো দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
তবে এই অসামান্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জেলা প্রতিনিধিদের প্রতিনিয়ত স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের রোষানল, প্রভাবশালীদের রক্তচক্ষু, ভিত্তিহীন মিথ্যা মামলা ও চরম নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হয়। যা অনেক সময় তাদের স্বাধীনভাবে কলম ধরার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা যথাযথ আর্থিক মূল্যায়ন বা প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা থেকেও বঞ্চিত হন, যা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়।
মফস্বলের খবরগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং এটি একটি গভীর ও সমন্বিত প্রক্রিয়ার ফসল। যেখানে মাঠপর্যায়ের কঠোর অনুসন্ধান, তথ্য যাচাইয়ের সর্বোচ্চ সতর্কতা এবং ডেস্কের সুনিপুণ সম্পাদনা মিলেই তৈরি হয় একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন। যা নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে।
প্রান্তিক জনপদের প্রকৃত চিত্র ও তৃণমূলের হৃদস্পন্দন জাতীয় পর্যায়ে বলিষ্ঠভাবে ফুটিয়ে তুলতে হলে জেলা প্রতিনিধিদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান এবং তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সংবাদমাধ্যমের মালিকপক্ষকে আরও সংবেদনশীল হতে হবে। কারণ তাদের সাহসী ও নির্মোহ কলম সচল থাকলেই কেবল দেশের প্রকৃত গণতন্ত্রের ভিত মজবুত হবে এবং জনস্বার্থ রক্ষায় সাংবাদিকতা তার কাঙ্ক্ষিত সার্থকতা খুঁজে পাবে।
ঢাকা পোস্টে মফস্বল সাংবাদিকতা
২০২১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি গণমাধ্যম জগতে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ঢাকা পোস্ট। তবে এর প্রস্তুতি শুরু হয় আরও তিন মাস আগে— কর্মী বাছাই ও নিয়োগের মধ্য দিয়ে। শুরু থেকেই বিভাগ, জেলা-উপজেলা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে দেশের সবচেয়ে উদ্যমী, কর্মঠ ও পেশাদার তরুণ সাংবাদিকদের যুক্ত করা হয়। সারাদেশে তারা প্রতিষ্ঠানটির ‘ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর’ হিসেবে কাজ করছেন। তাদের হাত ধরেই তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে যায় ঢাকা পোস্ট।
বস্তুনিষ্ঠ ও মানবিক সাংবাদিকতার কারণে অল্প সময়েই পাঠকমহলে পরিচিতি পায় ‘বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের অনলাইন ঠিকানা’ হিসেবে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিনিধিরা তুলে আনেন অসহায় মানুষের গল্প—অর্থাভাবে চিকিৎসা না পাওয়া রোগী, পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া শিক্ষার্থী, সড়ক-সংকটে ভোগা গ্রামীণ জনপদ, নদীভাঙন ও বন্যাকবলিত মানুষের দুর্দশা, ব্যতিক্রমী জীবনসংগ্রাম, কৃষিতে সাফল্য ও নতুন উদ্ভাবনের গল্প। এসব প্রতিবেদন প্রকাশের পর বহু ক্ষেত্রে সমাজের বিত্তবান ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা এগিয়ে এসেছেন। সংবাদে বদলে গেছে অনেকের জীবন।
একইসঙ্গে জেলা পর্যায়ে প্রশাসনিক অনিয়ম-দুর্নীতি ও সরকারি সেবায় ভোগান্তির বিষয়েও সরব থেকেছে ঢাকা পোস্ট। পাসপোর্ট অফিস, বিআরটিএ, সরকারি হাসপাতালসহ বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নিয়ে সরেজমিন প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিভিন্ন জেলায় অভিযান পরিচালনা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
প্রতিদিন জেলার অগ্নিকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা, রাজনৈতিক সংঘাত, স্থানীয় রাজনীতি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, শিক্ষা, উন্নয়ন, পর্যটন, ধর্মীয় ঐতিহ্য, ইতিহাস ও বিনোদন—সব ধরনের সংবাদ নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন, শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া, ঈদে ঘরমুখো মানুষের দুর্ভোগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত জনজীবন, উপকূলীয় অঞ্চলের সংগ্রামী জীবন, নদীভাঙন কবলিত এলাকার কষ্ট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট—সবই গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।
সত্যনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশে আপস না করার নীতিতে অবিচল থেকেছে ঢাকা পোস্ট। ভুল হলে তা সংশোধনের চর্চাও বজায় রাখা হয়েছে। কারণ কেউ শতভাগ নির্ভুল নয়। পাঠকই ঢাকা পোস্টের শক্তি। সারাদেশের প্রতিনিধিরা তার প্রাণশক্তি। এই শক্তি নিয়েই আগামী দিনে আরও বহুদূর এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা।
লেখক : সহকারী বার্তা সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট