তথ্য নয়, সত্যই আমাদের গন্তব্য : ষষ্ঠ বছরে ঢাকা পোস্ট-এর নতুন শপথ

একবিংশ শতাব্দীর এই দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে আমরা তথ্যের এক মহাসমুদ্রে বাস করছি। প্রতি সেকেন্ডে আমাদের সামনে ভেসে আসছে অগণিত সংবাদ, ভিডিও এবং সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট। কিন্তু এই বিশাল তথ্যপ্রবাহের ভিড়ে আসল ‘সত্য’ খুঁজে পাওয়া আজ বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জকে সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করে জনপ্রিয় নিউজ পোর্টাল ঢাকা পোস্ট আজ তার ষষ্ঠ বছরে পদার্পণ করছে। আমাদের এবারের যাত্রার মূল শপথ—‘তথ্য নয়, সত্যই আমাদের গন্তব্য’।
তথ্যের স্তূপ বনাম সত্যের শক্তি
আজকের দিনে তথ্য পাওয়া কঠিন কিছু নয়। কিন্তু সব তথ্যই কি সংবাদ? অথবা সব তথ্যই কি সত্য? তথ্য হতে পারে একপাক্ষিক, হতে পারে অসম্পূর্ণ কিংবা বিভ্রান্তিকর। কিন্তু সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য হলো সেই তথ্যের গভীরে গিয়ে প্রকৃত সত্যকে উন্মোচন করা। ঢাকা পোস্ট পাঁচ বছর ধরে এই কঠিন পথটাই পাড়ি দিয়েছে। আমরা শুধু ঘটনা প্রবাহ তুলে ধরিনি, বরং সংবাদের পেছনের সত্যটুকু পাঠকদের সামনে আনার চেষ্টা করেছি।
ত্রয়োদশ নির্বাচন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পরীক্ষা
‘তথ্য নয়, সত্যই আমাদের গন্তব্য’—এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা পোস্ট যে পেশাদারিত্ব দেখিয়েছে, তা আজ দেশজুড়ে প্রশংসিত। একটি বিশাল কর্মযজ্ঞের সফল সমাপ্তি শেষে আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, ঢাকা পোস্ট কেবল একটি নিউজ পোর্টাল নয়, এটি একটি টিমওয়ার্কের নাম।
সাফল্যের এই মহাকাব্যের কারিগর আমাদের প্রতিটি ডিপার্টমেন্টের ইনচার্জরা। তাদের দূরদর্শী দিকনির্দেশনা এবং প্রতিটি সদস্যের নিজ নিজ অবস্থানের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রমাণ করেছে যে, সুশৃঙ্খল নেতৃত্বই পারে একটি প্রতিষ্ঠানকে শীর্ষে রাখতে। রিপোর্টিং থেকে এডিটিং, ভিডিও থেকে সোশ্যাল মিডিয়া— প্রতিটি বিভাগ ছিল একে অপরের পরিপূরক।
এটি অনস্বীকার্য যে, নির্বাচনকালীন সময়ে সংবাদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। ঢাকা পোস্ট কোনো গুজবে পা না দিয়ে, প্রতিটি তথ্য শতভাগ যাচাই করে পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করেছে। এই বস্তুনিষ্ঠতাই আমাদের প্রতি কোটি কোটি পাঠকের আস্থার ভিত্তি তৈরি করেছে।
এবারের নির্বাচনে ঢাকা পোস্ট-এর বিশেষ আকর্ষণ ছিল আসনভিত্তিক দ্রুত ও নির্ভুল ফলাফল। আমাদের গ্রাফিক্স এবং আইটি টিমের সমন্বয়ে তৈরি লাইভ আপডেট সিস্টেম পাঠকদের ভোট গণনার প্রতি মুহূর্তের চিত্র দিয়েছে নিখুঁতভাবে। জটিল সব পরিসংখ্যানকে সহজবোধ্য গ্রাফিক্সের মাধ্যমে উপস্থাপন করার ফলে সাধারণ মানুষ মুহূর্তেই নির্বাচনের গতিপ্রকৃতি বুঝতে পেরেছে।
বস্তুনিষ্ঠতার স্বীকৃতি: ২০.৫৮ মিলিয়ন HTTP রিকোয়েস্ট
বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনায় ঢাকা পোস্ট যে পাঠকদের আস্থার প্রধান ঠিকানা, তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে নির্বাচনের দিনে। ওই ২৪ ঘণ্টায় আমাদের সাইটে প্রায় ২০.৫৮ মিলিয়ন (২ কোটি ৫ লাখ ৮০ হাজার) HTTP রিকোয়েস্ট সফলভাবে সার্ভ করা হয়েছে।
গাণিতিক হিসেবে, প্রতি মিনিটে গড়ে প্রায় ১৪,২৯১টি এবং প্রতি সেকেন্ডে ২৩৮টিরও বেশি রিকোয়েস্ট প্রসেস করেছে আমাদের সার্ভার। এই বিশাল ট্র্যাফিক কেবল একটি সংখ্যা নয়; এটি প্রমাণ করে যে মুহূর্তের সঠিক সংবাদ ও নির্বাচনের নির্ভরযোগ্য ফলাফলের জন্য কোটি মানুষ ঢাকা পোস্ট-এর ওপর আস্থা রেখেছে।
চরম উত্তেজনার মুহূর্তেও কোনো ধরনের টেকনিক্যাল বিভ্রাট ছাড়াই এই বিপুল চাপ সামলানো আমাদের শক্তিশালী আইটি ইনফ্রাস্ট্রাকচারের এক বিরাট সাফল্য। গুজবমুক্ত ও দ্রুততম সংবাদ প্রচারের যে অঙ্গীকার আমরা করি, ২০.৫৮ মিলিয়ন রিকোয়েস্টের এই মাইলফলক তারই বলিষ্ঠ স্বীকৃতি। পাঠকদের এই অবিচল ভালোবাসাই আমাদের আগামীর পথচলার শক্তি।
যাচাইকরণ (Fact-check): তথ্যের গোলকধাঁধায় সত্যের আলোকবর্তিকা
আজকের ডিজিটাল যুগে তথ্য এখন হাতের মুঠোয়, কিন্তু তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন পাহাড়সম। একটি ভুল তথ্য বা গুজব দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তেই তছনছ করে দিতে পারে সামাজিক স্থিতিশীলতা। ঢাকা পোস্ট বিশ্বাস করে, সাংবাদিকতার সার্থকতা দ্রুততায় নয়, বরং নির্ভুলতায়।
ব্রেকিং নিউজের ইঁদুর দৌড়ে সামিল হওয়া আমাদের লক্ষ্য নয়। আমরা মনে করি, ‘১০টি দ্রুত সংবাদের চেয়ে একটি সঠিক ও যাচাইকৃত সংবাদ অনেক বেশি শক্তিশালী’। ভুল তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত সংবাদ পরিবেশন করে সাময়িক রিচ পাওয়া সম্ভব, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদের জন্য জনআস্থা পাওয়া অসম্ভব। তাই আমাদের নিউজরুমে ‘সেকেন্ড’ বাঁচানোর চেয়ে ‘সত্য’ বাঁচানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

সেনসেশনালিজম ও ক্লিকবেট-মুক্ত সাংবাদিকতা
চটকদার শিরোনাম দিয়ে পাঠককে বিভ্রান্ত করা বা ‘ক্লিকবেট’ সংস্কৃতির আমরা ঘোর বিরোধী। আমরা সংবাদের গুণগত মান (Quality) নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ভিউ বা ক্লিকের নেশায় সত্যকে আড়াল করা বা অতিরঞ্জিত করা ঢাকা পোস্ট-এর নীতিমালার পরিপন্থী। আমাদের শিরোনাম হবে সংবাদের আয়না, কোনো ফাঁদ নয়।
গুজব প্রতিরোধে আমাদের ফিল্টার
যেকোনো সংবেদনশীল বা ভাইরাল তথ্য পাওয়ার পর ঢাকা পোস্ট-এর মাল্টিলেয়ার ভেরিফিকেশন প্রসেস অনুসরণ করা হয়। তথ্যের উৎস নির্ভরযোগ্য কি না তা নিশ্চিত করা, একাধিক স্বতন্ত্র সোর্স থেকে তথ্যের সত্যতা যাচাই করা, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রাপ্ত ছবি বা ভিডিওর ক্ষেত্রে সেটি এডিট করা কি না বা পুরোনো কোনো ঘটনার কি না, তা রিভার্স ইমেজ সার্চ ও মেটাডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিশ্চিত করা।
সমাজ গঠনে দায়বদ্ধতা
সংবাদমাধ্যমের কাজ শুধু তথ্য দেওয়া নয়, বরং সমাজকে সঠিক পথ দেখানো। একটি ভুল তথ্য মানুষকে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো সংবেদনশীল সময়ে আমাদের এই যাচাইকরণ প্রক্রিয়া একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে। আমরা বিশ্বাস করি, বস্তুনিষ্ঠ তথ্যই নাগরিককে সচেতন করে এবং গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে।
ভবিষ্যৎ লক্ষ্য
একটি সংবাদমাধ্যম হিসেবে কেবল তথ্য সরবরাহ করা নয় বরং ডিজিটাল যুগে সত্যের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। তথ্যের মহাসমুদ্রে পাঠক যেন চোখ বন্ধ করে ঢাকা পোস্ট-এর ওপর আস্থা রাখতে পারে। ‘ব্রেকিং নিউজ’-এর গতির চেয়ে ‘ভেরিফাইড নিউজ’-এর নির্ভুললতা আমরা শ্রেষ্ঠত্ব দেবো।
ষষ্ঠ বছরে আমাদের লক্ষ্য আরও বিস্তৃত। আমরা শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক সংবাদে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের প্রতিটি প্রান্তের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ও সাফল্যের গল্প তুলে ধরতে চাই। ষষ্ঠ বছরে পদার্পণের এই লগ্নে আমাদের অঙ্গীকার—ঢাকা পোস্ট তথ্যের স্তূপ জমাবে না বরং সত্যের ভিত্তি গড়বে। কারণ আমরা জানি, দিনশেষে পাঠক তথ্যের প্রবাহে নয়, বরং সত্যের আশ্রয়েই ভরসা খুঁজে পায়।
আবু রাসেল : প্রধান বার্তা সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট