নির্বাচন কতটা অবাধ ও সুষ্ঠু হবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায় : সুজন সম্পাদক

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, নির্বাচন সংস্কারের বিষয়ে বহু প্রস্তাব ও সুপারিশ উঠে এলেও সেগুলোর বড় অংশই বাস্তবে কার্যকর হয়নি। ফলে আসন্ন নির্বাচন সত্যিকার অর্থে কতটা অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে—সে বিষয়ে গুরুতর সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) 'অঙ্গীকার থেকে বাস্তবায়ন : রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা – বাংলাদেশের নির্বাচন ২০২৬' শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা আরও দুর্বল হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে দেখা গেছে, কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলে সেই দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর সম্পদ ও প্রভাব দ্রুত ও অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। ক্ষমতা ও সম্পদের এই পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক রাজনীতির বিস্তার দায়মুক্তির একটি সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যা গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনী অনিয়ম এখনো একটি গুরুতর সমস্যা। ভোট কেনাবেচা, চাপ প্রয়োগ ও কারচুপির অভিযোগ নিয়মিতভাবেই উঠে আসে। একইসঙ্গে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ও নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে। তদারকি, প্রয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘাটতি নির্বাচন পরিচালনা নিয়ে ব্যাপক সন্দেহ সৃষ্টি করেছে। এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও একটি অবাধ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষা এখনো স্পষ্টভাবে বিদ্যমান।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচনী অখণ্ডতা রক্ষা করা কেবল জনআস্থা পুনর্গঠনের জন্য নয়, বরং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণকে অর্থবহ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জনগণের প্রকৃত মতামতের প্রতিফলন নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য। এই দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং আইন ও বাস্তব—উভয় ক্ষেত্রেই প্রকৃত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন ছিল সরকারের মূল তিনটি অগ্রাধিকার। এর সঙ্গে নিরাপত্তা ছিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চতুর্থ বিষয়। তার মতে, সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে মানুষের প্রত্যাশায়। দীর্ঘদিন পেছনে পড়ে থাকা মানুষরা এখন দৃশ্যমান হয়েছেন, তারা প্রকাশ্যে কথা বলছেন এবং গণপরিসরে উপস্থিত হচ্ছেন। এই পরিবর্তনের কৃতিত্ব সাধারণ মানুষ, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে দিতে হবে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো আরও প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইশতেহার দিতে পারত। তবে যেটুকু এসেছে, সেটিও একেবারে অগ্রাহ্য করার মতো নয়। কিন্তু জবাবদিহিতা না থাকলে যত ইশতেহারই দেওয়া হোক, তার কোনো কার্যকর মূল্য থাকে না। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থার যে ঘাটতি রয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করাও কঠিন।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশ এখনো একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করতে সক্ষম। কিন্তু যারা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চান না, তারা এই ভোটকে সমাজের জন্য উপকারী বলে বিবেচনা করেন না। পেছনে পড়ে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য নির্বাচনের আগে ও পরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দুর্বলই থেকে যাবে।
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যদি তাদের দায়িত্বের শেষ পর্যায়ে একটি সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে পারে, তাহলে সেই অর্জন ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বাস্তবতা হলো, নির্বাচনে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব ক্রমাগত কমে এসেছে। আগের সংসদে যেসব সংখ্যালঘু প্রতিনিধি ছিলেন, তারাও সংসদের ভেতরে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সমস্যা কার্যকরভাবে তুলে ধরতে পারেননি। দেশে গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হলে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সমস্যাকে জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখতে হবে। এসব বিষয়কে কখনোই খাটো করে দেখা যাবে না, কিংবা রাজনৈতিক সুবিধার জন্য বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন করা যাবে না।
তিনি বলেন, ধর্মীয় ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সমস্যাগুলোর সমাধান না হলে ভবিষ্যতে দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যকর সময় প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এখন তাদের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো একটি ভালো নির্বাচন আয়োজন করা।
তিনি উল্লেখ করেন, প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন— সব ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এক ছাতার নিচে থাকবে। কিন্তু বাস্তবে সেই ‘ছাতা’ এখনো পুরোপুরি খোলা হয়নি। তিনি বলেন, আমরা কি সত্যিই জবাবদিহিতা চাই? পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, সেটিকে আমরা কাজে লাগাতে পারব কি না—সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা না গেলে সমস্যা আরও বাড়বে। বাংলাদেশ পরিবর্তন চায়, এবং সেই পরিবর্তনের অংশ হতে পারছি বলেই তিনি আশাবাদী ও আনন্দিত।
ড. সেলিম জাহান বলেন, সংবিধানে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনী ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। তবুও বাংলাদেশে নির্বাচন আদৌ কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক—এই প্রশ্নটি বারবার সামনে আসে, যা একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতারই প্রতিফলন। কারণ, বাস্তবে সংবিধানের এই অঙ্গীকারগুলো বারবার লঙ্ঘিত হয়েছে এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার ও নিরাপত্তা যথাযথভাবে সুরক্ষিত বা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত হয়নি।
তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে ধারাবাহিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া, সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে বঞ্চনা ও বাদ পড়ার একটি কাঠামোগত ধারা দীর্ঘদিন ধরে টিকে আছে।
তিনি বলেন, আইনের শাসন থাকলে সব সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু আমরা দেখেছি কীভাবে ‘মব’ বা জনতার চাপের মাধ্যমে আইনের শাসনকে রাস্তায় নামিয়ে আনা হয়েছে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী। অথচ আসন্ন নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো কতজন নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে?
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ-এর সভাপতি জিল্লুর রহমান।
এনআই/জেডএস