যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডে (জেওসিএল) দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারকারী সিবিএ নেতা মুহাম্মদ এয়াকুবের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শেষ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থার নির্দেশে ইতোমধ্যে অভিযুক্ত এয়াকুব তার সম্পদ বিবরণী জমা দিয়েছেন। দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জ্বালানি খাতে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্জিত তার অস্বাভাবিক সম্পদের এক বিস্তৃত চিত্র। তবে, অনুসন্ধান শেষ হলেও এই প্রভাবশালী কর্মচারী নেতার বিরুদ্ধে এখনও মামলা করতে পারেনি দুদক। সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিগগিরই কমিশনে প্রতিবেদন পাঠানো হবে এবং তার ভিত্তিতেই মামলার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
বিজ্ঞাপন
দুদক ও জেওসিএল সূত্রে জানা গেছে, এয়াকুব যমুনা অয়েল লেবার ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক এবং চট্টগ্রাম মহানগর শ্রমিক লীগের নেতা। বর্তমানে জ্যেষ্ঠ সহকারী হিসেবে কর্মরত এয়াকুবের মাসিক মূল বেতন ৩৪ হাজার টাকা। অথচ তার স্যালারি অ্যাকাউন্টেই পৌনে চার কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যাংক এশিয়া কর্তৃপক্ষ তার এই হিসাবটিকে ‘সন্দেহজনক অস্বাভাবিক লেনদেন’ (এসটিআর) হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
যমুনা অয়েলের সিবিএ নেতা মুহাম্মদ এয়াকুবের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অঢেল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। মাত্র ৩৪ হাজার টাকা বেতনের এই কর্মচারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পৌনে ৪ কোটি টাকার লেনদেন পাওয়া গেছে। দুদক তার বিশাল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের অনুসন্ধান শেষ করলেও এখনও মামলা দায়ের করেনি, যা বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে
বিলাসী জীবন ও অঢেল সম্পদ
বিজ্ঞাপন
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম নগরের অভিজাত এলাকা লালখান বাজারের ৩৩, হাই লেভেল রোডে (মানারাত ইদ্রিস প্যালেস) ৪৩০০ বর্গফুটের তিনটি ফ্ল্যাটকে একীভূত করে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন এয়াকুব। এছাড়া ২০১৪ সালে পতেঙ্গায় ২১ লাখ টাকায় ৬ শতাংশ জমি এবং আগ্রাবাদ এলাকায় তার স্ত্রীর নামে যৌথ মালিকানায় ৫০ লাখ টাকার জমি কেনা হয়েছে। আগ্রাবাদ এক্সেস রোডে তার ২ গন্ডা জমিতে টিনশেড ঘর এবং গ্রামের বাড়ি বোয়ালখালীতে অন্তত তিন খণ্ডে প্রায় ৩৮ শতাংশ জমির সন্ধান পাওয়া গেছে।
চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা
বিজ্ঞাপন
অভিযোগ রয়েছে, যমুনা অয়েল কোম্পানির ঠিকাদারের দুই শ্রমিক—মো. আবদুল নুর ও মো. হাসান ফয়সালের সহযোগিতায় সিবিএ নেতা এয়াকুব ২০১৯ সালে বিভিন্ন ডিপোতে চাকরি দেওয়ার নাম করে আটজনের কাছ থেকে কয়েক দফায় ২৯ লাখ ৭৪ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এই টাকা লেনদেন হয়েছে কুরিয়ার সার্ভিস ও বিকাশের মাধ্যমে। পরবর্তীতে চাকরি না হওয়ায় টাকা ফেরত চাইলে ভুক্তভোগী তোতা মিয়াসহ অন্য চাকরিপ্রার্থীদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনায় ২০১৯ সালের ১৯ জুলাই সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থানায় এয়াকুবসহ তিনজনের বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন মো. তোতা মিয়া।
এয়াকুব প্রভাব খাটিয়ে তার অন্তত ২০ জন নিকটাত্মীয়কে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ডিপোতে নিয়োগ দিয়েছেন। তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে ছয় কোটি টাকার তেল চুরির প্রমাণ মিললেও কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর আগে ২০১৪ এবং ২০২৪ সালে বিপিসি দুই দফায় তদন্ত কমিটি গঠন করলেও রহস্যজনক কারণে সেই তদন্ত প্রতিবেদনগুলো কখনওই আলোর মুখ দেখেনি
দৈনিক হাজিরা থেকে সিবিএ সম্রাট
এয়াকুবের কর্মজীবন শুরু হয়েছিল ১৯৯৪ সালে যমুনা অয়েল কোম্পানিতে দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে এক অস্থায়ী পদে। এর তিন বছর পর ১৯৯৭ সালে তিনি টাইপিস্ট হিসেবে স্থায়ী হন। ২০০৯ সালে লেবার ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং পরের বছরই সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরপর থেকে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে তিনি এই প্রভাবশালী পদে আসীন রয়েছেন।

একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ও পতন
তথ্য অনুসারে, গত সাড়ে ১৬ বছর ধরে যমুনা অয়েল কোম্পানির প্রায় প্রতিটি কার্যক্রম চলেছে এয়াকুবের ইশারায়। কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি থেকে শুরু করে ক্যাজুয়াল ও কন্ট্রাক্টর নিয়োগ— সবকিছুই ছিল তার নিয়ন্ত্রণে। এমনকি মেডিকেল শাখার ওষুধ ক্রয়, টেন্ডার, ক্যান্টিন পরিচালনা, ফার্নেস অয়েল, বিটুমিন এবং ট্যাংকার-ট্যাঙ্কলরি ব্যবস্থাপনায়ও ছিল তার একচ্ছত্র আধিপত্য। তবে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার এই ‘সাম্রাজ্যে’ টান পড়ে। গত ১২ ডিসেম্বর গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন তিনি। পরবর্তীতে নগরের চান্দগাঁও থানায় দায়ের করা হত্যা ও বিস্ফোরক মামলাসহ মোট চারটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
কারাগারে থেকেও ‘গায়েবি’ ছুটি
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ডিজিএম (এইচআর) মোহাম্মদ হাসান ইমামের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এয়াকুবকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, চিঠিতে বলা হয়েছিল— এয়াকুব ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর থেকে গত ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত ছুটি কাটিয়েছেন এবং এরপর থেকে তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত। অথচ বাস্তব তথ্য বলছে ভিন্ন কথা; ১২ ডিসেম্বরই তিনি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে চলে যান। প্রশ্ন উঠেছে, কারাগারে বন্দি থেকেও তিনি অসুস্থতাজনিত ছুটির দরখাস্ত কীভাবে পাঠালেন এবং সেই ছুটি কর্তৃপক্ষ মঞ্জুরই বা করল কীভাবে?
কারামুক্ত হয়ে ফের দাপট ও বরখাস্ত প্রত্যাহারের তোড়জোড়
মার্চের মাঝামাঝি সময়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশে জামিনে মুক্ত হন এয়াকুব। বরখাস্ত অবস্থায় থাকলেও তিনি যমুনা অয়েলে গিয়ে কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব খাটাতে শুরু করেন এবং বরখাস্তের আদেশ বাতিলের জন্য হুমকি দিতে থাকেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৩ মার্চ যমুনা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহারের আবেদন করেন এই সিবিএ নেতা।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৯ মার্চ ডিজিএম হাসান ইমামের সই করা এক চিঠিতে এয়াকুবকে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। যমুনার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কারণ দর্শানোর জবাব পাওয়ার পরই সম্ভবত তার বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে নেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ, প্রভাবশালী এই নেতার পুনরায় কাজে ফেরার সব প্রস্তুতিই প্রায় চূড়ান্ত।
গত ডিসেম্বরে হত্যা ও বিস্ফোরক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকলেও এয়াকুবের নামে ‘অসুস্থতাজনিত’ ছুটি মঞ্জুর করে রহস্যজনক আচরণ করেছে যমুনা অয়েল কর্তৃপক্ষ। জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি বর্তমানে বরখাস্তের আদেশ বাতিলের জন্য কর্মকর্তাদের হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি নিয়ম বহির্ভূতভাবে তাকে পুনরায় কাজে ফেরানোর তোড়জোড় চালাচ্ছে প্রতিষ্ঠানের একটি প্রভাবশালী চক্র
নিকটাত্মীয়দের মাধ্যমে দেশজুড়ে ডিপো নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডে প্রভাব খাটিয়ে সিবিএ নেতা মুহাম্মদ এয়াকুব তার অন্তত ২০ জন নিকটাত্মীয়কে দেশের বিভিন্ন ডিপো ও কার্যালয়ে নিয়োগ দিয়েছেন। এর মধ্যে তার আপন ছোট ভাই কাজী আইয়ুব পার্বতীপুর ডিপোর অপারেটর হিসেবে কর্মরত। গত বছরের জুলাই মাসে এই কাজী আইয়ুবের নেতৃত্বেই প্রায় ছয় কোটি টাকার তেল চুরির অভিযোগ ওঠে। তদন্ত কমিটি এই চুরির সত্যতা পেলেও তার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সম্প্রতি তাকে প্রধান কার্যালয়ে বদলি করা হলেও, আইয়ুবকে আবারও পার্বতীপুর ডিপোতে ফিরিয়ে নিতে জোর তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন এয়াকুব।
স্বজনপ্রীতির বিস্তারিত চিত্র
তথ্য অনুযায়ী, এয়াকুবের স্বজনপ্রীতির জাল সারাদেশের ডিপোগুলোতে ছড়িয়ে আছে। তার চাচাতো ভাইদের মধ্যে রয়েছেন— পতেঙ্গা ডিপোর অপারেটর কাজী মো. সাদেক, আগ্রাবাদ কার্যালয়ের সহকারী কাজী কামরুল, পিয়ন কাজী খোরশেদ, নেজাম উদ্দিন এবং চাঁদপুর ডিপোর অপারেটর মো. সায়েম।

ফুফাতো ভাইদের মধ্যে রয়েছেন— আগ্রাবাদ কার্যালয়ের সহকারী সৈয়দ মো. সিরাজ ও পতেঙ্গা ডিপোর সিকিউরিটি কর্মী মো. আরিফ।
এছাড়া, ভাগিনাদের মধ্যে রয়েছেন— সিলেট ডিপোর অপারেটর কাজী মোজাম্মেল, আগ্রাবাদ কার্যালয়ের সহকারী কাজী মুয়াদ এবং পতেঙ্গা অফিসের অপারেটর মো. হানিফ।
শ্রীমঙ্গল ডিপোর অপারেটর খোরশেদ আলম মিন্টু ও মাহবুল আলম (খালাতো ভাই), চাঁদপুর ডিপোর অপারেটর মাইন উদ্দিন আহমেদ ছোটন (শ্যালক), আগ্রাবাদ কার্যালয়ের ড্রাইভার মো. মাসুদ (ভাতিজা) এবং ফতুল্লা ডিপোর অপারেটর ফারুক (ভগ্নিপতি) এবং দৌলতপুর ডিপোর অপারেটর মো. দেলোয়ার তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বলে জানা গেছে।
নথিপত্র অনুযায়ী, আগ্রাবাদ কার্যালয়ের পিয়ন কাজী খোরশেদ ও সহকারী কাজী কামরুল ছাড়া এই তালিকায় থাকা বাকি সবাই অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত। মূলত এয়াকুবের ছত্রছায়াতে তারা বছরের পর বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ সব ডিপো নিয়ন্ত্রণ করছেন।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
দুদক চট্টগ্রামের সদ্য বিদায়ী উপ-পরিচালক সুবেল আহমেদ জানান, এক গণশুনানিতে যমুনা অয়েলের এক ব্যক্তির করা অভিযোগের ভিত্তিতে এয়াকুবের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। বর্তমানে এই প্রক্রিয়াটি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ইতোমধ্যে অভিযুক্ত এয়াকুব তার সম্পদের বিবরণী জমা দিয়েছেন। সেগুলো এখন নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং খুব শিগগিরই চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
যমুনা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আমীর মাসুদ বলেন, ‘অনুমোদিত ছুটি ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় এয়াকুবকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিল। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি তার বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তাকে একটি কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তার জবাব পাওয়ার পর শ্রম আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখানে নিয়মের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
বিপিসির বারবার তদন্ত এবং নীরবতা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এয়াকুবের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০১৪ সালের ৯ জুন বিপিসির তৎকালীন সচিব দীপক চক্রবর্তীর স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে তার অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য মাত্র ১৫ দিন সময় বেঁধে দেওয়া হলেও রহস্যজনকভাবে সেই তদন্ত আর আলোর মুখ দেখেনি। একইভাবে ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর বিপিসি আবারও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং ৩০ অক্টোবরের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। কিন্তু দ্বিতীয়বারের সেই তদন্ত কমিটির কার্যক্রমও অজ্ঞাত কারণে থমকে যায়। ফলে দশকের পর দশক ধরে ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছেন এই ক্ষমতাধর সিবিএ নেতা।
এমআর/এমএআর/
