অর্থ পাচার : অর্থনীতির অশনিসংকেত!

Nilanjan Kumar Saha

০৩ জুন ২০২২, ০৯:৩৫ এএম


মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ক্রমিক নং ২(ক) ১ অনুযায়ী, ‘দেশে বিদ্যমান আইনের ব্যত্যয় ঘটাইয়া দেশের বাহিরে অর্থ বা সম্পত্তি প্রেরণ বা রক্ষণকে ‘অর্থ বা সম্পত্তি পাচার’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।’ 

আমাদের দেশে অর্থ পাচার আকস্মিক বা অপরিচিত কোনো ঘটনা নয়, অনেকদিন ধরেই তা হয়ে আসছে। তবে বর্তমানে এর ব্যাপ্তি এত বিশাল আকার ধারণ করেছে যে, জরুরি ভিত্তিতে এর লাগাম টানা না গেলে তা অর্থনীতির জন্য বিরাট ক্ষতির অন্যতম একটি কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

অর্থ পাচার শুধু দেশের অর্থনীতিরই ক্ষতি করে না বরং দেশের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে ব্যাপকভাবে ব্যাহত করে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদেশে অর্থ পাচার যে অন্যতম প্রতিবন্ধক তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে তেমন সন্দেহের অবকাশ নেই।

মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সাথে সাথে জরুরি ভিত্তিতে অর্থ পাচারের ব্যাপকতা হ্রাস করতে না পারলে বৈশ্বিক করোনা মহামারির দীর্ঘ প্রভাব সত্ত্বেও বাংলাদেশের ভৌত উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির যাত্রা যেভাবে চলমান আছে তা থমকে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে!

ওয়াশিংটন ভিত্তিক গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে কোন দেশ থেকে কী পরিমাণ অর্থ পাচার হয় তার প্রাক্কলন করে। 

বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি ও রফতানির মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে গত ১০ বছরে (২০০৯ - ২০১৮) গড়ে ৮.২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বর্তমান টাকার বাজার মূল্যে আনুমানিক ৭৩ হাজার কোটি টাকার মতো) পাচার হয়েছে, যা আমাদের বর্তমান জাতীয় বাজেটের মোট রাজস্বের প্রায় ১৮.৬০ শতাংশ।

জিএফআই এই বিষয়ে তাদের ১৬ ডিসেম্বর ২০২১-এ প্রকাশিত বৈশ্বিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি ও রফতানির মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে গত ১০ বছরে (২০০৯ - ২০১৮) গড়ে ৮.২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বর্তমান টাকার বাজার মূল্যে আনুমানিক ৭৩ হাজার কোটি টাকার মতো) পাচার হয়েছে, যা আমাদের বর্তমান জাতীয় বাজেটের মোট রাজস্বের প্রায় ১৮.৬০ শতাংশ। এক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। 

সম্প্রতি প্রকাশিত সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ২০২০’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে রয়েছে ৫৭ কোটি ৩ লাখ সুইস ফ্রাঁ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কোনো টাকা নেওয়া যায় না। বিদেশে বিনিয়োগ, শিক্ষা, ভ্রমণ ও চিকিৎসার জন্য দেশ থেকে বিদেশে টাকা নেওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে।

বিদেশে খরচ শেষে অবশিষ্ট টাকা দেশে ফেরত আনতে হবে, কোনোভাবেই এসব টাকা বিদেশের কোনো ব্যাংকে জমা রাখা যাবে না। তারপরও, দুর্নীতি আর অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ পাচার হয়ে তা বিদেশি ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা হচ্ছে কিংবা বিদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য, বাড়ি,  সম্পত্তি, ইত্যাদিতে ক্রয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে।
কেননা, আয়কর বহির্ভূত বা অবৈধ পন্থায় উপার্জিত অর্থ অনেকে দেশে রাখতে নিরাপদ বোধ করে না। ফলে, বিভিন্ন অবৈধ পন্থায় তারা অর্থ পাচার করে বিদেশে নিয়ে যায়। জিএফআই’র প্রতিবেদনে বৈদেশিক বাণিজ্যের মাধ্যমে টাকা পাচারের দুটি প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে—

প্রথমটি হচ্ছে, বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির মূল্য বেশি দেখানো হয় যেথায়, পণ্যের বাস্তব মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ বিদেশে চলে যায়। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, রফতানির মূল্য কম দেখানো যার মাধ্যমে পণ্যের বাস্তব মূল্যের চেয়ে যে পরিমাণ অর্থ কম দেখানো হয়েছে তা বিদেশে থেকে যায়।

অর্থ পাচার আমাদের দেশের জন্য ক্ষতিকারক হলেও বিদেশি রাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য শুভ। তারপরেও, আমাদের দেশের অর্থনীতির স্বার্থের কথা বিবেচনা করে বিদেশ থেকে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সর্বদা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

সংস্থাটির মতে, পাচারকৃত অর্থের বেশিরভাগ অর্থাৎ ৮০ শতাংশেরও বেশি বৈদেশিক বাণিজ্যের মাধ্যমে পাচার হয়। তাছাড়া, অবৈধ হুন্ডি, বিটকয়েন বা ক্রিপ্টো কারেন্সি মাধ্যমেও দেশ থেকে প্রচুর পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। বিবিসি নিউজ-এর তথ্যমতে, সারা বিশ্বে ২০২১ সালে তার আগের বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ মানি লন্ডারিং বৃদ্ধি পেয়েছে। 

অনেক সময়, একটি চক্র প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের অর্থ বৈদেশিক মুদ্রায় দেশে না পাঠিয়ে বিদেশেই সেগুলো রেখে দিয়ে এদেশে দুর্নীতি বা অবৈধ পন্থায় অর্জিত টাকায় তা পরিশোধে করে অর্থ পাচার করে। পণ্যের চোরাচালানেও বিদেশে অর্থ পাচার একটি বড় উপায়।

বর্তমানে শেল ব্যাংকের (অনুমোদন বিহীন অনলাইন ব্যাংক) মাধ্যমেও আমদানি-রফতানির আড়ালে টাকা পাচার হচ্ছে। বিধায়, মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণকারী সংস্থা ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স (এফএটিএফ) আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শেল ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন না করার নির্দেশনা দিয়েছে।

এর আলোকে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বি এফ আই ইউ) থেকে সার্কুলার জারি করে শেল ব্যাংকের সঙ্গে কোনো লেনদেন না করার জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে।

বি এফ আই ইউ হচ্ছে বাংলাদেশের একটি সরকারি সংস্থা যা মানি লন্ডারিং, সন্দেহজনক লেনদেন এবং নগদ লেনদেনের প্রতিবেদন তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে কাজ করে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে বি এফ আই ইউ-এর বাইরে দুদক এবং পুলিশও কাজ করে। এক্ষেত্রে ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকা লন্ডারিং করা হলে সেটি নিয়ে দুদক কাজ করে।

সাধারণত বৈদেশিক মুদ্রায় বিশেষ করে মার্কিন ডলারে অর্থ পাচার হয়ে থাকে। তাই আমাদের দেশে মার্কিন ডলারের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির জন্য অর্থ পাচার একটি অন্যতম কারণ হতে পারে।

শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় বাজারে মুদ্রাস্ফীতি ও ডলারের দামের ঊর্ধ্বগতি, ইত্যাদির কারণে ভবিষ্যতে আমাদের অর্থনীতি সংকটে পড়ার সম্ভাবনা আঁচ করেই হয়তো সরকারই এখন পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরত আনার চেষ্টা শুরু করেছে।

আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা হতে যাচ্ছে ৯ জুন। আমরা আশা করছি যে, বাজেটেই সরকার এই বিষয়ে বিশেষ ঘোষণা দেবে। বিশ্বজুড়ে যে অর্থনৈতিক মন্দাভাব চলছে তার মোকাবিলায় আমাদের আগামী বাজেট খুবই গুরুত্বপূর্ণ হবে।

আইন প্রয়োগের তেমন কঠোর দৃষ্টান্ত নেই বলেই হয়তো দেশ থেকে অর্থ পাচার ঠেকানো যাচ্ছে না। বলা বাহুল্য, এসব অর্থ পাচারের সাথে যারা জড়িত তাদের সংখ্যাটা নিতান্তই কম। গুটিকয়েক লোক অর্থ পাচার করে অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে তা মেনে নেওয়া কষ্টকর।

একদিকে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে, আরেক দিকে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমছে। তাই, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ ইতিমধ্যে নিয়েছে। যেমন, ব্যয় সাশ্রয় করতে সরকার বিলাসদ্রব্য আমদানিতে লাগাম টেনেছে, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণেও।

সরকারের এইসব পদক্ষেপে অবশ্যই বিদেশে অর্থ চলে যাওয়া সাময়িকভাবে হ্রাস করবে। এছাড়াও, বরাবরের মতো আমাদের সরকার হয়তো আগামী অর্থবছরেও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বিদ্যমান রাখবে এবং কর ছাড় দিয়ে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার যে উদ্যোগের কথা শোনা যাচ্ছে তা অবশ্যই একটি কার্যকর পদক্ষেপ হবে। 

যদি নিজের দেশের লোকজনই বিদেশে অর্থ পাচারের ব্যাপারে বেপরোয়া থাকে তখন বিদেশি রাষ্ট্রের আইন ও আর্থিক কর্তৃপক্ষ তা ফেরত আনার ব্যাপারে অনাগ্রহ দেখাবে এটাই স্বাভাবিক। কেননা, অর্থ পাচার আমাদের দেশের জন্য ক্ষতিকারক হলেও বিদেশি রাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য শুভ। তারপরেও, আমাদের দেশের অর্থনীতির স্বার্থের কথা বিবেচনা করে বিদেশ থেকে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সর্বদা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

ভারত কিংবা পাকিস্তানের মতো দেশগুলো থেকে অর্থ পাচার বেশি হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশই বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের জন্য বাণিজ্যভিত্তিক মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় আইন করেছে।

মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর মানি লন্ডারিং অপরাধের দণ্ডের ২ নং ক্রমিকে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘কোন ব্যক্তি মানি লন্ডারিং অপরাধ করিলে বা মানি লন্ডারিং অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা, সহায়তা বা ষড়যন্ত্র করিলে তিনি ন্যূনতম ৪ (চার) বৎসর এবং অনধিক ১২ (বার) বৎসর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির দ্বিগুণ মূল্যের সমপরিমাণ বা ১০ (দশ) লক্ষ টাকা পর্যন্ত, যাহা অধিক, অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’

কিন্তু আইন প্রয়োগের তেমন কঠোর দৃষ্টান্ত নেই বলেই হয়তো দেশ থেকে অর্থ পাচার ঠেকানো যাচ্ছে না। বলা বাহুল্য, এসব অর্থ পাচারের সাথে যারা জড়িত তাদের সংখ্যাটা নিতান্তই কম। গুটিকয়েক লোক অর্থ পাচার করে অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে তা মেনে নেওয়া কষ্টকর। 

আমরা ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখছি। দেশে দুর্নীতির মাধ্যমে যেভাবে অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে, তাতে এসব লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

দেশের চলমান উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা গতিশীল রাখতে দুর্নীতি ও অর্থ পাচার বন্ধে কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা করতে হবে এবং কেউ যদি করেও থাকে বা এর সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে, তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে যাতে করে অন্যেরা এই ব্যাপারে আগ্রহ না দেখায়।

আর এর জন্যে টাকা পাচার প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধিসহ মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, আমদানি-রফতানি নীতি, জয়েন্ট স্টক আইনসহ আরও যেসব আইন রয়েছে সেগুলো যুগোপযোগী সংশোধনের ও তা তড়িৎ বাস্তবায়নের জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে।

নীলাঞ্জন কুমার সাহা ।। ডিন, ফ্যাকাল্টি অব বিজনেস স্টাডিজ ও সহযোগী অধ্যাপক, ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Link copied