মার্ক টালির একাত্তর

স্যার উইলিয়াম মার্ক টালি ভারতীয় উপমহাদেশে বিবিসির মার্ক টালি নামেই সুপরিচিত। তিনি ছিলেন ভারতবর্ষে বিবিসির কণ্ঠস্বর। শিক্ষাজীবনে ধর্মতত্ত্বে আগ্রহী এই সাংবাদিক ছিলেন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের যুদ্ধদিনের পরমবন্ধু।
উপমহাদেশের সীমানা পরিবর্তনকারী সেই যুদ্ধের সময় মার্ক টালি বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক প্রধান ভাষ্যকার ছিলেন। শুধু মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ নয় ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ দীর্ঘ ৩০ বছর বিশ্ববাসী মার্ক টালির বর্ণনাতেই জেনেছে।
সাংবাদিকতার এই দিকপালের বিদায়ে ভারতের আলোচিত গণমাধ্যম দ্য ওয়ার (The Wire) তাকে উল্লেখ করেছে সাংবাদিকতার এক এক নির্ভীক মহিরুহ হিসেবে (A fearless titan of journalism)। এছাড়া বিবিসি শেষ শ্রদ্ধাজ্ঞাপন সংবাদে তাকে উল্লেখ করা হয়েছে আধুনিক ভারতের ইতিহাস বর্ণনাকারী (Chronicler of modern India) হিসেবে।
মার্ক টালির জন্ম কলকাতার টালিগঞ্জে। লন্ডনে পড়াশোনা শেষ করে বিবিসিতে যোগ দিয়েছিলেন ১৯৬৪ সালে। দীর্ঘ ২২ বছর ধরে ছিলেন ব্রিটিশ অভিজাত গণমাধ্যম বিবিসির নয়াদিল্লি দফতরের ব্যুরো চিফ। এই গুরু দায়িত্বে থাকার সময়ই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়।
অপারেশন সার্চলাইট শুরু হওয়ার পরপরই তিনি চলে আসেন কলকাতায়। সেখানে থেকে যুদ্ধের শুরুর দিকের শরণার্থী ঢল, যুদ্ধ প্রস্তুতির খরব সংগ্রহ করতে থাকেন। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন ১৯৭০ এর দশকে সাংবাদিকতা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। আর বিবিসির গ্রহণযোগ্যতা ছিল প্রায় আকাশচুম্বী।

সেই সময়ে বিবিসি, টাইম, নিউজউইক, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও টেলিগ্রাফের সাংবাদিকরা বিশ্বমত তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারতেন। মার্ক টালি ব্যতিক্রম ছিলেন না। এছাড়া তার সাংবাদিকতার আরও বড় শক্তি ছিল হিন্দি ও উর্দু ভাষায় পারদর্শিতা ও ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে পূর্ব পরিচয়।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের পর বাংলার মাটিতে সংগঠিত গণহত্যা নিয়ে প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করেন মার্ক টালির বন্ধু দ্য টেলিগ্রাফ-এর তরুণ যুদ্ধ প্রতিবেদক সায়মন জন ড্রিং। ৩০ মার্চ দ্য টেলিগ্রাফ প্রকাশ করেছিল সায়মনের ট্যাঙ্ক ক্রাশ রিভোল্ট অব ইস্ট পাকিস্তান (Tanks Crush Revolt in Pakistan) শিরোনামের প্রতিবেদন।
শুধু মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ নয় ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ দীর্ঘ ৩০ বছর বিশ্ববাসী মার্ক টালির বর্ণনাতেই জেনেছে।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিশ্বের অন্যান্য প্রভাবশালী সব গণমাধ্যম বাংলাদেশের জেনোসাইড নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে থাকে। এতে বেশ বিপাকে পড়ে ইয়াহিয়া খানের পাকিস্তান। এই কলঙ্ক ঘোচাতে এবং ঢাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে তা বোঝাতে একদল বিদেশি সাংবাদিককে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তাদের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরির।
এই দলেই আরও কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিকদের সাথে ১৯৭১ সালের এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে ঢাকা এসেছিলেন মার্ক টালি। এই সংবাদ সফরে আসার আগে বিবিসি তথা মার্ক টালি শর্ত দিয়েছিলেন—তাদের ইচ্ছে অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে মার্ক টালি বলেছেন, এই সুযোগ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী করে দিয়েছিলেন।

১৯৭১ সালের সেই সফরে দুই সপ্তাহ বাংলাদেশে ছিলেন মার্ক টালি। এ সময় তিনি আরিচা ঘাট হয়ে সড়ক পথে রাজশাহী গেছেন। এ সময় তিনি দেখেছেন ও পরে রিপোর্ট করেছেন রাস্তার দুই ধারে প্রায় সব বাড়ি ঘর ও স্থাপনা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার বুঝতে বাকি থাকেনি নিরাপত্তার অজুহাতে এই বর্বর কাজ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী করেছে।
এই যাত্রাপথে মার্ক টালির সাথে ছিলেন দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকার যুদ্ধ বিষয়ক সংবাদদাতা ক্লেয়ার হলিংওয়ার্থ। হলিংওয়ার্থ সমর বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। তিনি জানতের সামরিক বাহিনী কোন পদক্ষেপ কী কারণে নেয়। ফলে কিছুটা বিরক্ত হলেও মার্ক টালি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাচ্ছিলেন। পরে সেগুলোর ভিত্তিতে তিনি সরেজমিন প্রতিবেদন তৈরি করেন। যা ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অনবদ্য দলিল।
ওই সফরের সময় তিনি পুরান ঢাকাতেও গিয়েছিলেন সরেজমিন প্রতিবেদন তৈরির জন্য। কারণ সে সময় খবর আসছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল পুরান ঢাকার হিন্দুরা।
তিনি প্রথমে গিয়েছিলেন শাঁখারিবাজার। সেখানে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী। সেখানে মার্ক টালি ছবি তোলেন। এ সময় এক পাঞ্জাবি পুলিশ অফিসার তাকে গ্রেফতার করেন। তবে থানায় বাঙালি ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সহযোগিতায় তিনি ছাড়া যান।
১৯৭১ সালের এপ্রিল-মে’তে দুই সপ্তাহ বাংলাদেশে থেকে দিল্লি হয়ে লন্ডনে যান মার্ক টালি। পরে সেখানে বসেই তৈরি করেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক দুর্দান্ত সব প্রতিবেদন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভেতর থেকে সহযোগিতা করতেন বিবিসি স্ট্রিনজার সাংবাদিক নিজামউদ্দিন (পরে তিনি শহীদ হন)।
এছাড়া লন্ডনে বিবিসি বাংলায় কর্মরত সাংবাদিকদের আত্মীয়স্বজন ও বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে অবরুদ্ধ ঢাকার সংবাদ সংগ্রহ করতেন মার্ক টালি। যুদ্ধদিনে বাংলাদেশ বিষয়ে বিবিসি সংবাদের প্রধান সূত্রধর ছিলেন। তিনিই মূলত দীর্ঘ নয় মাস ধরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহ, সংকলন, সম্পাদনা ও উপস্থাপনা করেছেন। যা ছিল এক ধরনের বিশাল কর্মযজ্ঞ।
লন্ডনে বিবিসি বাংলায় কর্মরত সাংবাদিকদের আত্মীয়স্বজন ও বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে অবরুদ্ধ ঢাকার সংবাদ সংগ্রহ করতেন মার্ক টালি। যুদ্ধদিনে বাংলাদেশ বিষয়ে বিবিসি সংবাদের প্রধান সূত্রধর ছিলেন। তিনিই মূলত দীর্ঘ নয় মাস ধরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহ, সংকলন, সম্পাদনা ও উপস্থাপনা করেছেন।
সাংবাদিক মার্ক টালির নীতিবোধ ছিল অত্যন্ত প্রখর। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেকেই তাকে কৃতিত্ব দিলেও তিনি বিনয়ের সাথে বলেছেন, তিনি সাংবাদিকতা করেছেন। সত্য তুলে ধরেছেন। আর এটাই সাংবাদিকের দায়িত্ব।
১৯৭১ সালের বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশে তাকে সম্মাননা জানালে তিনি বলেছিলেন—এ ধরনের সম্মাননায় তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। তবে গণমাধ্যম হিসেবে বিবিসির অবদান স্বীকার করা হয়। যা ন্যায্য ও প্রাপ্য। কারণ তার দৃষ্টিতে ১৯৭১ সালে বিবিসি ছিল খুবই পেশাদার একটি গণমাধ্যম।

মার্ক টালি তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন বইয়ের পাতায়। যার মধ্যে—অমৃতসর: মিসেস গান্ধী'স লাস্ট ব্যাটেল (Amritsar: Mrs Gandhi's Last Battle ), নো ফুলস্টপস ইন ইন্ডিয়া (No Full Stops in India), দ্য কুম্ভ মেলা (The Kumbh Mela), ইন্ডিয়া ইন স্লো মোশন (India in Slow Motion), ইন্ডিয়াস আনএন্ডিং জার্নি (India's Unending Journey) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভারতবর্ষের ঐতিহাসিক সব ঘটনাপ্রবাহ জানা যাবে মার্ক টালির বইয়ের মধ্য দিয়ে।
ধর্মশাস্ত্র ও ইতিহাসে আগ্রহী মার্ক টালিকে ইতিহাসের অমোঘ লিখন টেনে এনেছিল পদ্মাপাড়ে। ১৯৭১ সালে একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে তিনি যে অবদান রেখে গেছেন তা সত্যিই অনন্য, অবিস্মরণীয়। দিল্লির লোধি স্টেটে সৎকারের মাধ্যমে তার নশ্বর দেহই হয়তো শুধু প্রকৃতিতে মিশে গেছে। কিন্তু আমাদের মাঝে রয়ে গেছে তার কাজ। যা যুগে যুগে পেশাদার সাংবাদিকদের পথ দেখাবে।
তথ্যঋণ:
১। From Emergency to Babri Demolition: Remembering Mark Tully, a Fearless Titan of Journalism, (January 26, 2026The Wire) , Retrieved on 26-01-2026, https://thewire.in/media/from-emergency-to-babri-demolition-remembering-mark-tully-a-fearless-titan-of-journalism
২। Tributes pour in across India for revered BBC broadcaster Sir Mark Tully (BBC, online), Retrieved on 26-01-2026, https://www.bbc.com/news/articles/cgjw0w0qq4wo
রাহাত মিনহাজ : সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
