‘চৌরঙ্গী’র মণিশংকর মুখোপাধ্যায় এখন ‘জন-অরণ্য’-এ

‘যে ছোট্ট সুটকেসটা হাতে করে অনেকদিন আগে এই অজ্ঞাত পল্লীতে জীবিকার সন্ধানে উপস্থিত হয়েছিলাম সেই সুটকেস এবং পপি বিশোয়াসের উপহার দেওয়া সুটকেসটা রিকশার ওপরে তুলে শেষবারের মতো আমি সুখ-দুঃখ-হাসি-কান্না আশা-নিরাশা ভরা আশ্চর্য বাড়িটার দিকে পরম বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম। নগর সভ্যতার এক আশ্চর্য অধ্যায়কে আমি এই ঘরের মধ্যে ঘরে আবিষ্কার করেছি। আমার অস্তিত্বের এক অংশকে এই রহস্যপুরীর মধ্যে চিরদিনের মতো বন্দী রেখে, আমি আবার পথে বেরিয়ে পড়েছি।‘
—ঘরের মধ্যে ঘর, শংকর
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে একদিকে যেমন এশিয়া আর আফ্রিকার দেশগুলো ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর দুর্বল হয়ে পড়ার সুযোগে স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে উঠলো। নতুনভাবে গড়ে উঠলো দুনিয়ার জাতীয়তাবাদের কাঠামো। জাতিতে জাতিতে শুরু হলো নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতি আর ইতিহাসের পুনরাবিষ্কারের চেষ্টা। সাহিত্যগুলো ধারণ করতে চেষ্টা করলো স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর।
একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঘিরে গোটা পৃথিবী যখন দুইভাবে বিভক্ত হয়ে গেল। আর সেই অজুহাতে অর্থনীতি ভাগ হলো পুঁজিবাদ আর সাম্যবাদের দ্বন্দ্বে। সংকটে পড়লো অস্তিত্ববাদ। শিল্পের উৎপাদন-বিলাসিতা আর উপচে পড়া প্রযুক্তির সুবাদে মানুষ আদতে ‘ভোক্তা’ হয়ে উঠলো। ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল রেডিও টেলিভিশন।
‘মিডলক্লাস লাইফস্টাইল’ এর মাথা ছাড়িয়ে উঠলো ‘মিডলক্লাস ক্রাইসিস’। আধুনিকতাবাদ ফেলে মানুষ হতে লাগলো উত্তরাধুনিক, ফরাসি আর ইতালীয় চলচ্চিত্রে লাগলো ‘নিউ ওয়েভ’ এর ঢেউ, গান গেয়ে উঠলো রক অ্যান্ড পপের ভাষায়, ল্যাটিন আমেরিকায় গজিয়ে উঠলো ম্যাজিক রিয়ালিজম, আর অ্যাবসার্ড নাটক হয়ে উঠলো ‘ওয়েটিং ফর গডো’... তখন বাংলার পাঠকেরও প্রয়োজন হলো নতুন কিছুর। সেই নতুনের স্বাদ কোত্থেকে আসবে?
রবিঠাকুরের লেখায় শহর আর নগর এসেছে মূলত ভদ্রসমাজের চোখে, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত আর আধুনিকতার টানাপোড়েনের নিক্তিতে। ‘চোখের বালি’ বা ‘নষ্টনীড়’ কেবলই সামাজিক রূপান্তরের ক্ষেত্র। শহর সেখানে মনস্তাত্ত্বিক আর নৈতিক প্রশ্নের কাঠগড়া কেবল। শরৎচন্দ্রের সাহিত্যে শহর গ্রামের দ্বন্দ্ব আছে, কিন্তু বিকট একপেশে। শহর সেখানে বিচ্যুতি, ভ্রষ্টতা আর সামাজিক সংকটের খেলাঘর। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শহরের দায় কেবল শ্রেণি বৈষম্যের পাঠে। অর্থনৈতিক বৈষম্য, শ্রমজীবী মানুষের জীবন, অস্তিত্বের সংকট মিলিয়ে এক সংগ্রামের জায়গা ছাড়া তার শহরের আর কোনো দায় নেই।

তারাশঙ্কর শহরের দিকে ঘেঁষেননি তেমন। সমরেশেও শহর কেবল শ্রমিকের মহল্লা। রাজনৈতিক আন্দোলন, যৌনতা আর সামাজিক বিদ্রোহের ক্ষেত্র। সুনীলের কাছে যে শহর বোহেমিয়ান, প্রেমের আর একাকীত্বের এবং বুদ্ধিজীবীরও কিছুটা; শীর্ষেন্দুর কাছে সে শহর মায়াময়। নবনীতা দেবসেনের শহর নারীবাদের। বুদ্ধদেব গুহতে শহর নেই, বন কেবল। আর বুদ্ধদেব বসুতে শহর অনেকটাই রাবীন্দ্রিক। কিন্তু কলকাতার বাস্তব শহর তখন ভীষণ ভিন্ন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের কলকাতায় তখন পূর্ববঙ্গ থেকে বিপুল মানুষের স্রোতে ভেসে যাওয়ার গল্প। ধুম করে মানুষের দ্বিগুণ হয়ে ওঠার গল্প, উত্তর আর দক্ষিণের শহরতলিতে নতুন নতুন বসতি গড়ে ওঠার গল্প। আর এইসব গল্পের ভিড়ে কল্লোলিনী কলকাতার অবকাঠামো থেকে সামাজিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য ভেঙে যাওয়ার গল্প তীব্র হয়ে উঠতে থাকে ক্রমশ।
শহরকে শংকর সাহিত্যে এঁকেছেন একেবারে নতুন করে। কলকাতা তার লেখায় কেবল পটভূমি হয়ে রইলো না, হয়ে উঠলো এক জীবন্ত চরিত্র। মধ্যবিত্ত সমাজ, চাকরির বাজার, কর্পোরেট সংস্কৃতি, নৈতিক আপস, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, হতাশা, কান্না সবকিছুকে গল্পের মর্মস্থলে ঠাঁই দিলেন শংকর।
নব্য শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যুবকদের বেকারত্বের পাশাপাশি চলে যাওয়া ব্রিটিশ সাহেবদের বদলে ভারতীয় সাহেব গড়ে ওঠার গল্প তখন কলকাতায়। শ্রমিক আন্দোলন, ধর্মঘটের পাশাপাশি নকশালের উত্থান আর রাজনৈতিক সহিংসতার ফলে তারুণ্যের হতাশা আর অনিশ্চয়তা বেড়ে ওঠার গল্প তখন তীব্র হয়ে উঠছে কলকাতায়। একদিকে অর্থনৈতিক উদারীকরণ, আরেকদিকে কর্পোরেট সংস্কৃতির বিকাশে বহুজাতিক কোম্পানির দাপটের গল্প তখন কলকাতায়। নগরায়নের এই তুমুল বিকাশের গল্প তুলে ধরার তখন তেমন কেউ ছিল না বাংলা সাহিত্যে।
অবিভক্ত ভারতের বনগাঁয় জন্ম মণিশংকর মুখোপাধ্যায় ছোটবেলাতেই পৈত্রিক সুবাদে চলে গেলেন হাওড়ায়। বড় হতে হতে একদিকে বিশ্বযুদ্ধ আর দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা দেখে, আরেকদিকে নতুন পাওয়া স্বাধীনতার জাতীয়তাবাদ দেখা হয়ে গেল। আর দেখা হয়ে গেল বিশ্বযুদ্ধের চেয়েও তীব্র হয়ে ওঠা জীবন-যুদ্ধকে। কখনো ফেরিওয়ালা, কখনো প্রাইভেট টিউশনি, কখনো টাইপ রাইটারের ক্লিনার, কখনো জুট ব্রোকারের কনিষ্ঠ কেরানি—জীবনকে মণিশংকরের চেয়ে বেশি চেখে দেখেছে আর ক’জনই বা?
নিজেই লিখেছেন—“বাবা হঠাৎ মারা গিয়ে বিরাট সংসারের বোঝা আমার মাথার ওপর চাপিয়েছেন। একটা চাকরির জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। অথচ অফিস বা কারখানার কাউকে চিনি না, চাকরি কী করে জোগাড় করতে হয় তাও জানি না। এই অবস্থায় নতুন আপিসে গিয়ে লিফটে চড়তে সাহস পেতাম না—আমার ভয় ছিল লিফটে চড়তে হলে পয়সা দিতে হয়। চাকরির সন্ধানে সারাদিন ঘুরে ঘুরে কলকাতার আপিস-পাড়া সম্বন্ধে আমার মনে বিচিত্র এক ছবি আঁকা হয়ে গিয়েছিল। একদিন পদস্থ ভদ্রলোক বিরক্ত হয়ে আমাকে বকুনি লাগালেন, ‘বাঙালিরা কি চাকরি ছাড়া আর কিছু জানবে না?”

এরকমই একটা দৃশ্য অনেক বছর পরে আমরা দেখি সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে, যেখানে কলার খোসায় পিছলে যাওয়া সোমনাথরূপী প্রদীপ মুখোপাধ্যায়কে বিশুদারূপী উৎপল দত্ত ‘রাস্তার তিন অবস্থা—ব্যাড, ভেরি ব্যাড, আর ভেরি ভেরি ব্যাড’ বলতে বলতে বলেন চাকরি ছেড়ে ব্যবসার কথা। হাতে কলমে সব শিখিয়ে, বন্দোবস্ত করে সোমনাথকে ছেড়ে দেন কলকাতার কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডে... অর্ডার সাপ্লাইয়ের ব্যবসার নামে আসলে ‘দালালী’ করতে। আর তা করতে গিয়ে সোমনাথের দেখা হয়ে যায় কলকাতা শহরের এক নতুন গল্প... যে গল্প এর আগে কেউ সাহিত্যে তোলেনি।
সোমনাথ থেকে চৌরঙ্গীর সেই উচ্চাভিলাষী যুবক—এই সব চরিত্রের আড়ালের ব্যক্তিটা আসলে শংকর নিজেই।
চাকরির পেছনে ঘুরতে ঘুরতে শংকর দেখেন চাকরির বিজ্ঞাপনের পত্রিকা লাখ লাখ বিকোয় এ শহরে, দরখাস্ত পড়ে হাজারে হাজার। ইন্টারভিউ বোর্ডে অফিসাররা এমন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেন যে প্রশ্নের উত্তর নিজেরাও জানেন না। অবশেষে চাকরির আশা ছেড়ে মণিশংকর ব্যবসায় ঝুঁকে দেখা পান এক মাদ্রাজি ছোকরার, যে ওয়েস্ট-পেপার বাস্কেট তৈরির ব্যবসা খুলে বসেছে।
শংকরের উপন্যাস আরেকটা সুবিধে করে দিলো পাঠককে। ঘটনা আর চরিত্রগুলো এত জীবন্ত, এত জান্তব যে তাকে আর আলাদা করে কল্পনা করতে হয় না, পড়তে পড়তেই যেন দেখা হয়ে যায়। তবুও ভিজ্যুয়ালে উঠে এলেন শংকর, প্রথমে ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাস নিয়ে।
সেই বাস্কেটগুলো রঙ হতো মধ্য কলকাতার এক পুরোনো বাড়িতে। রঙ করতো যে সিন্ধি আর অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মহিলারা, সন্ধ্যায় তারা দেহ বেচতো। সেই বাতিল ঝুড়ি বিক্রির এজেন্ট হিসেবে মণিশংকর একদিকে যেমন এসব মহিলার জীবনের সান্নিধ্যে এলেন, অন্যদিকে প্রবেশ করলেন কলকাতার আপিসপাড়ার রন্ধ্রে।
‘ওয়েস্ট-পেপার বাস্কেট’ হাতে দোকানে দোকানে, আপিসে আপিসে ঘুরে মানুষের নির্লজ্জ নগ্নরূপ দেখেছি। দু’একটা জায়গায় ঝুড়ি জমা দিয়ে একটা পয়সাও আদায় করতে পারিনি। এক সপ্তাহ পায়ে হেঁটে আপিস-পাড়ায় এসে এবং টিফিন না করে আমাকে সেই ক্ষতির খেসারৎ দিতে হয়েছে। ....তবু যে পুরোপুরি হতাশ হইনি, তার কারণ মধ্যদিনে মধ্য-কলকাতার বান্ধবীরা! তারা আমাকে উৎসাহ দিতেন। বলতেন, ‘দেহের ব্যবসাতেও অনেক সময় টাকা মারা যায়। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন সুযোগ আসে যখন সমস্ত লোকসান সুদসমেত উসুল হয়ে যায়।’

অনেক চেষ্টা করেও এক ক্লায়েন্টের কাছে মাল বেচতে না পেরে ছোটখাটো একটা চাকরি জুটিয়ে ‘দালালী’ ছাড়লেন মণিশংকর। অনেকদিন পর মধ্য-কলকাতার সেইসব দেহোপোজীবী বান্ধবীদের কাছে গিয়ে দেখেন একজনের ঘরে সেই ক্লায়েন্ট। শুনলেন বিছানার দামে সেই ক্লায়েন্টকে কিনে নিয়েছে তারই মাদ্রাজী বন্ধু, যে মণিশংকরকে শিখিয়েছিল ‘দালালী’ বিজনেসের আদ্যোপান্ত। এইসব অসংখ্য অজানারে জানতে জানতেই একদিন মণিশংকর লিখে ফেললেন ‘কত অজানারে’।
এ প্রসঙ্গে লিখেন, ‘সংসার পরিক্রমার পথে কত বিচিত্র সঞ্চয়ই যে দিনে দিনে পর্যাপ্ত হয়ে ওঠে তার বুঝি আর ইয়ত্তা নেই। যা একদিন অচেনা থাকে, অজানা থাকে তাকেই আবার একদিন চিনে ফেলি, জেনে ফেলি। অপরিচয়ের অবগুণ্ঠন খুলে কখন সে-ই আবার ধরা দেয় মনের কাছে। এই এমনি করেই সঞ্চয়ের পুঁজি একদিন ভারি হয়ে ওঠে, আর স্মৃতির আকাশে রং ধরে তখনই। ঘটনাচক্রে ওল্ড পোস্ট আপিস স্ট্রিটের আদলতি কর্মক্ষেত্রে আমাকেও এমনি অসংখ্য অপরিচিত চরিত্রের সাক্ষাৎ সংস্পর্শে আসতে হয়েছিল। সেদিন অচেনাকে চেনা আর অজানাকে জানাই ছিল আমার জীবিকার অপরিহার্য অঙ্গ। তারপর এতদিন পরে হঠাৎ একদিন টের পেলাম কখন যেন আমার আকাশও বর্ণাঢ্য হয়ে উঠেছে তাদের রঙে। কখন যেন নিজেরই অজ্ঞাতসারে তাদের আমি ভালোও বেসে ফেলেছি মনে মনে।’
সেইসব ভালোবাসার মানুষদের কথাই একের পর এক উপন্যাসে লিখে গেছেন মণিশংকর, লিখতে লিখতে হয়ে গেছেন শংকর। বাংলা সাহিত্যের হয়ে উঠেছেন উজ্জ্বল নক্ষত্র। কিন্তু শংকর কি নিজে কিছু লিখেছেন? কোনো চরিত্র বা গল্প কি তিনি বানিয়েছেন? এক কথায় উত্তর-না।
মায়াবিনী কল্লোলিনী কলকাতার উত্থানকালের যে ঘটনাগুলো ভারতীয় বাংলা সাহিত্যের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছিলো, সেগুলো শংকর দেখছিলেন ক্ষয়ে যাওয়া জুতোর স্যান্ডেল আর না খেয়ে থাকা ক্ষুধার চোখে। সেগুলোই সাহিত্য হয়ে উঠেছে। আর জীবন থেকে উঠে আসা সেই সাহিত্যে আলাদা করে প্রাণ জুড়তে হয়নি, ওষ্ঠাগত প্রাণটা সঙ্গেই ছিল, পাঠকের প্রাণে সেই প্রাণের সংযোগ হতে দেরি হয়নি।
কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ব্রিটিশ ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডেরিক বারওয়েল-এর অনুপ্রেরণায় শংকরের লেখালেখি শুরু হয়েছিল। শংকর কাজ করতেন এর অধীনে। যে চরিত্রটা পড়ে চৌরঙ্গীর সেই উচ্চাভিলাষী যুবক হয়ে উঠবে।
শহরকে শংকর সাহিত্যে এঁকেছেন একেবারে নতুন করে। কলকাতা তার লেখায় কেবল পটভূমি হয়ে রইলো না, হয়ে উঠলো এক জীবন্ত চরিত্র। মধ্যবিত্ত সমাজ, চাকরির বাজার, কর্পোরেট সংস্কৃতি, নৈতিক আপস, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, হতাশা, কান্না সবকিছুকে গল্পের মর্মস্থলে ঠাঁই দিলেন শংকর। শংকরের নায়ক ‘উত্তম’ বা ‘অধম’ হয়ে রইলো না, ভালো-মন্দ সকলই মিশায়ে ‘মানুষ’ হয়ে উঠলো। তার চরিত্রেরা স্বপ্ন দেখে, লড়াই করে, আপস করে, আবার ভেঙেও পড়ে।
সমাজ আর অর্থনীতির যাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া পাঠক নিজেকে খুঁজে পেল শংকরের সাহিত্যে। নতুন সময়ের নতুন পাঠক খুঁজে পেল শংকরকে। ‘ওয়েস্ট-পেপার বাস্কেট’ বেচতে না পারা মণিশংকর লেখক ‘শংকর’ হয়ে বিকোতে লাগলেন হুলুস্থুল। কিন্তু তাই বলে স্থূল বিনোদন তাকে বেচতে হয়নি কখনো। সাহিত্যের বাজারে তৈরি হওয়া ‘জনপ্রিয়তা’ আর ‘গভীরতা’র দুই সমান্তরাল পথ ভেঙে নতুন এক পথ বানিয়ে এগিয়ে গেলেন শংকর। থামলেন নব্বই বছর অতিক্রান্তে, জীবনের অন্তে।
শংকরের উপন্যাস আরেকটা সুবিধে করে দিলো পাঠককে। ঘটনা আর চরিত্রগুলো এত জীবন্ত, এত জান্তব যে তাকে আর আলাদা করে কল্পনা করতে হয় না, পড়তে পড়তেই যেন দেখা হয়ে যায়। তবুও ভিজ্যুয়ালে উঠে এলেন শংকর, প্রথমে ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাস নিয়ে। ১৯৬২ সালে প্রকাশিত চৌরঙ্গী উপন্যাসটি ১৯৬৮ সালে সিনেমায় তোলেন পিনাকি ভূষণ মুখোপাধ্যায়।
১৯৫০ এর দশকে কলকাতার এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী যুবক সচিবের চাকরি করতো এক ইংরেজ ব্যারিস্টারের কাছে। ব্যারিস্টারের অকালমৃত্যু হলে বেকার হয় সে। ওয়েস্ট-পেপার বাস্কেট বিক্রি করতে করতে একসময় চাকরি পায় শাহজাহান হোটেলে। সেখানকার চিফ রিসিপশনিস্ট স্যাটা বোসের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। হোটেলের অতিথি, বিনোদনকারী, কর্মচারী, ম্যানেজার সবার মধ্যে উঠে আসতে থাকে শংকরের দেখা কলকাতার বিবিধ চরিত্রগুলো।
উত্তম কুমার আর সুপ্রিয়া দেবীর অভিনয়ে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সিনেমাটি। অনেক বছর পরে ২০১৯ সালে সৃজিত মুখোপাধ্যায় একে ‘শাহজাহান রিজেন্সি’ নাম দিয়ে নতুন করে বানান। অঞ্জন দত্ত, আবীর চট্টোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় প্রমুখ তারকা বাহুল্যে আর ‘কিচ্ছু চাইনি আমি আজীবন ভালোবাসা ছাড়া’ গানে আবার মুখর হয়ে ওঠে কলকাতা।

সত্যজিৎ রায় ততদিনে অপু ট্রিলজি থেকে দেবী, পরশপাথর থেকে জলসাঘর, তিনকন্যা থেকে চারুলতা, কাঞ্চনজঙ্ঘা থেকে মহানগর, কাপুরুষ থেকে মহাপুরুষ, নায়ক থেকে চিড়িয়াখানা, গুপী গাইন বাঘা বাইন থেকে অরণ্যের দিনরাত্রি সব বানিয়ে রীতিমতো তোলপাড় ফেলে দিয়েছেন সারাবিশ্বে। কিন্তু তবু তার বিরুদ্ধে এই অপবাদ তীব্র হয়ে উঠলো, যে তিনি দুনিয়ার সবকিছু নিয়ে সিনেমা বানালেও কলকাতার শহুরে অভিজ্ঞতার ব্যাপারে তিনি উদাসীন। সেই অভিযোগের বিপরীতে প্রায় একই সময়ে সত্যজিৎ রায় আর মৃণাল সেন শুরু করেন ‘কলকাতা ট্রিলজি’।
মৃণাল পরপর তিন বছরে তিনটা—ইন্টারভিউ, কলকাতা ৭১ আর পদাতিক বানিয়ে প্রশংসিত হন। আর সত্যজিৎ প্রথমে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস থেকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ বানালেও পরের দুটোই বানান শংকরের উপন্যাস থেকে। যথাক্রমে ‘সীমাবদ্ধ’ আর ‘জন অরণ্য’। এই ট্রিলজিতে চিরন্তন সত্যজিৎকে যতটুকু পাওয়া যায়, তারচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন আড়ালে থাকা শংকর!
কলকাতার সাহিত্যে শংকর যতটা কলকাতার, তারচেয়ে অনেক বেশি তো তুলে এনেছেন এই শহরের ভাঁজে ভাঁজে জড়িয়ে থাকা মানুষের কথা। তেমনি ভ্রমণ সাহিত্যের যে শংকর সেখানেও আসলে শংকর বলেছেন কেবল মানুষের কথাই। কলেজ স্ট্রিটের চ্যাটার্জির দোকান হোক বা ম্যানহাটান হোক বা স্বামী বিবেকানন্দর আদ্যোপান্তে হোক—শংকর কেবল মানুষই অন্বেষণ করেছেন আজীবন।
বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে মানুষকে দাঁড় করিয়ে নতুন করে জেনেছেন মানুষকে। জন অরণ্যে কিংবা মানবসাগর তীরে তিনি খুঁজেছেন মানুষেরই বিবিধ রূপ। তিনি দেখিয়েছেন পৃথিবীর যেখানেই যাওয়া হোক, মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও ভালোবাসা একই সূত্রে বাঁধা। শংকর দেখিয়েছেন মানুষের গল্পই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় গল্প। এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই তার সাহিত্যের মূল শক্তি।
শংকরের প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য হারাল এক প্রাজ্ঞ কথককে। কিন্তু তার সৃষ্ট চরিত্রেরা আরও বহু বছর পরেও নিঃশ্বাস ফেলবে আমাদের কাঁধে। এমন এক সময় তিনি চলে গেলেন যখন আবারো মানুষের এক ভীষণ পরিবর্তনের আর সংকটের কাল সমাগত। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের নবাগত পৃথিবীর আসন্ন সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষ আসলে কী করবে আর কোন সংগ্রাম তাকে টিকিয়ে রাখবে তা যখন ভাবার বিষয়, সেই সময় নিয়ে লেখার জন্য শংকর রইলেন না।
নজরুল সৈয়দ : সংস্কৃতিকর্মী