রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ : সুস্থ পৃথিবীর মহাপরিকল্পনা

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের উৎকর্ষের যুগে আমরা প্রায়ই একটি প্রবাদ ভুলে যাই—‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম।’ IPC (Infection Prevention and Control) হলো একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও ব্যবহারিক সমাধান, যার মূল লক্ষ্য হলো রোগী এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের জীবাণু সংক্রমণ থেকে রক্ষা করা।
আইপিসি বা রোগ প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণ কেবল চিকিৎসাব্যবস্থার একটি অংশ নয়, বরং এটি একটি জনস্বাস্থ্য দর্শন। আইপিসি এমন একটি প্রক্রিয়া যা মানুষকে অসুস্থ হওয়ার হাত থেকে বাঁচায় এবং কোনো রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়লে তা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করে।
সহজ কথায়, রোগ প্রতিরোধ হলো সেইসব ব্যবস্থা যা কোনো রোগ হওয়ার আগেই তা ঠেকিয়ে দেয় (যেমন টিকা নেওয়া বা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন)। আর রোগ নিয়ন্ত্রণ হলো কোনো রোগ ছড়িয়ে পড়লে তার প্রভাব এবং বিস্তার কমিয়ে আনা (যেমন আইসোলেশন বা আলাদা রাখা, কোয়ারেন্টাইন বা সঠিক চিকিৎসা)।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে আইপিসিকে তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়। রোগ হওয়ার আগে সচেতনতা তৈরি ও টিকা প্রদান, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা এবং রোগের জটিলতা কমিয়ে রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা।
রোগ প্রতিরোধ কেন জরুরি, তা বুঝতে আসলে বড় কোনো গবেষণার প্রয়োজন নেই। একটি মহামারি কেবল মানুষের জীবন কেড়ে নেয় না বরং একটি দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়। একটি রোগের জটিল চিকিৎসার চেয়ে তার প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার খরচ অনেক কম যা ব্যয় সাশ্রয়ী।
তাছাড়া জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য প্রতিটা সুস্থ মানুষই একটি জাতির সম্পদ এবং রোগ প্রতিরোধ মানুষের কর্মক্ষমতা বজায় রাখে। যদি প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী হয়, তবে হাসপাতালে রোগীর ভিড় কম থাকে, ফলে জরুরি রোগীরা উন্নত সেবা পায় যা প্রত্যক্ষভাবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে আইপিসিকে তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়। রোগ হওয়ার আগে সচেতনতা তৈরি ও টিকা প্রদান, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা এবং রোগের জটিলতা কমিয়ে রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা।
রোগ প্রতিরোধের ইতিহাস মানব সভ্যতার মতোই পুরোনো। তবে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে এর যাত্রা শুরু হয় ১৮৫৪ সালে জন স্নো-র হাত ধরে। লন্ডনে কলেরার প্রকোপ চলাকালীন তিনি ম্যাপ তৈরি করে প্রমাণ করেন যে, একটি নির্দিষ্ট পানির পাম্প থেকে এই রোগ ছড়াচ্ছে। এটিই ছিল এপিডেমিওলজি বা রোগতত্ত্বের ভিত্তি।
পরবর্তীতে লুই পাস্তুর এবং রবার্ট ককের জীবাণু তত্ত্ব এবং এডওয়ার্ড জেনারের আবিষ্কৃত গুটিবসন্তের টিকা চিকিৎসাবিজ্ঞানের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বিংশ শতাব্দীতে অ্যান্টিবায়োটিক এবং বিভিন্ন টিকার আবিষ্কার মানবজাতির গড় আয়ু বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং CDC (Centers for Disease Control and Prevention)-র মতো সংস্থাগুলো বিশ্বব্যাপী রোগ নিয়ন্ত্রণে নেতৃত্ব দিচ্ছে। কোভিড-১৯ মহামারির পর সারাবিশ্ব বুঝতে পেরেছে যে, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা কোনো নির্দিষ্ট দেশের একক বিষয় নয়; এটি একটি বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব।
বর্তমানে বিশ্বে সংক্রামক রোগের পাশাপাশি অসংক্রামক রোগ (যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হার্টের রোগ ইত্যাদি) প্রতিরোধে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। উন্নত দেশে ডিজিটাল হেলথ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে এখন রোগের প্রাদুর্ভাব আগেভাগেই অনুমান করা সম্ভব হচ্ছে।
রোগ প্রতিরোধে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। এরমধ্যে টিকাদান কর্মসূচিতে (EPI) বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেল। পোলিও নির্মূল এবং ধনুষ্টংকার নিয়ন্ত্রণেও আমরা অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছি। কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। বর্তমানে ডেঙ্গুর মতো মশাবাহিত রোগ এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে ক্যান্সার ও হৃদরোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। নগরায়ন এবং পরিবেশ দূষণ আমাদের জনস্বাস্থ্যকে নতুন ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের প্রধান উদ্দেশ্যগুলো হলো রোগের কারণে অকাল মৃত্যু হার কমিয়ে আনা, সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব বা মহামারি ঠেকানো, স্বাস্থ্য বৈষম্য দূর করে সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়া, গড় আয়ু এবং জীবনের মান বৃদ্ধি করা।
সফল রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি ‘চেইন অব ইন্টারভেনশন’ প্রয়োজন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্যক্তিগত সচেতনতা বাড়িয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া সাথে সুষম খাবার খাওয়া এবং শারীরিক পরিশ্রম করা, সময়মতো সব টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করা, পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা যেমন নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, প্রযুক্তি ব্যবহার করে মোবাইল অ্যাপ বা ডাটাবেজের মাধ্যমে রোগের বিস্তার পর্যবেক্ষণ করা।
আইপিসি কার্যকর করতে চেষ্টা করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি কারণ হলো HAI (Healthcare-Associated Infection) প্রতিরোধ করা। HAI বলতে সেই সব সংক্রমণকে বোঝায়, যা একজন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে অর্জন করেন।
ভর্তির সময় রোগীর ওই জীবাণু দিয়ে সংক্রমণ ছিল না, কিন্তু ভর্তির ৪৮ ঘণ্টা পর বা হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর যদি নতুন কোনো সংক্রমণ দেখা দেয়, তবে তাকেই HAI বলা হয়। উন্নত বিশ্বে HAI হার ৫-১০ শতাংশ হলেও বিশেষায়িত ওয়ার্ডগুলোতে (যেমন আইসিইউ বা বার্ন ইউনিট) এই হার ২০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ বা তারও বেশি হতে পারে। বাংলাদেশে HAI-এর সুনির্দিষ্ট জাতীয় পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন তবে বিভিন্ন গবেষণায় এই উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গিয়েছে।
আমাদের হাসপাতালগুলোয় রোগীর অতিরিক্ত ভিড়, জনবল সংকট এবং সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে অসচেতনতার কারণে HAI নিয়ন্ত্রণ করা বেশ চ্যালেঞ্জিং। তবে বর্তমানে অনেক সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে আলাদা ‘ইনফেকশন কন্ট্রোল কমিটি’ গঠন করা হচ্ছে। এছাড়া Bangladesh Infection Prevention and Control Foundation (BIPCF) এর যাত্রাও শুরু হয়েছে।
HAI প্রতিরোধে কিছু বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
১. হ্যান্ড হাইজিন: সাবান-পানি বা অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ডরাব দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া। এটিই সংক্রমণের চেইন ভাঙার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
২. সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE): প্রয়োজন অনুযায়ী মাস্ক, গ্লাভস এবং গাউন ব্যবহার করা।
রোগ প্রতিরোধে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। এরমধ্যে টিকাদান কর্মসূচিতে (EPI) বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেল। পোলিও নির্মূল এবং ধনুষ্টংকার নিয়ন্ত্রণেও আমরা অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছি।
৩. সরঞ্জাম জীবাণুমুক্তকরণ: ইনজেকশন, ক্যাথেটার বা অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতি ব্যবহারের আগে নিয়মমাফিক শতভাগ জীবাণুমুক্ত (Sterilization) করা।
৪. পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা: হাসপাতালের মেঝে, বেড এবং শৌচাগার নিয়মিত জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার রাখা।
৫. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: ব্যবহৃত নিডল, ব্যান্ডেজ ও অন্যান্য বর্জ্য নির্দিষ্ট লাল/হলুদ বিনে আলাদা করা এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে ধ্বংস করা।
৬. অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার: যত্রতত্র অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বন্ধ করা যাতে ‘সুপারবাগ’ তৈরি হতে না পারে।
৭. হাসপাতালের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি রোগীর স্বজনরা সচেতন হলে খুব সহজেই এই সংক্রমণের হার কমিয়ে আনা সম্ভব।
IPC কে কার্যকর করার লক্ষ্যে ব্যক্তিগত এবং হাসপাতাল পর্যায়ে প্রচেষ্টার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে অন্যতম হলো বাজেট বৃদ্ধি করে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির একটি বড় অংশ বরাদ্দ করতে হবে, বিশেষ করে গবেষণা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায়।
তাছাড়া সঠিক আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করে ভেজাল খাবার রোধ এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন কার্যকর করা, নজরদারি ব্যবস্থা বা (Surveillance) বাড়িয়ে কোনো নতুন ভাইরাস বা রোগের লক্ষণ দেখা মাত্রই তা শনাক্ত করার জন্য শক্তিশালী ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্ক তৈরি করা, শিক্ষা কারিকুলামে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই স্বাস্থ্যবিধি ও রোগ প্রতিরোধের বিষয়গুলো পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রোগ প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণ কেবল ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজ নয়; এটি একটি সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন। আমরা যদি সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারি এবং বিজ্ঞানসম্মত জীবনধারা গড়ে তুলতে পারি, তবে অনেক মরণব্যাধি থেকেই মুক্ত থাকা সম্ভব। একটি সুস্থ জাতিই একটি সমৃদ্ধ দেশ গড়ার প্রধান হাতিয়ার। তাই আসুন, প্রতিকারের আশায় বসে না থেকে ব্যক্তিগত এবং সমষ্টিগত প্রতিরোধের দেয়াল গড়ে তুলি।
ডা. কাকলী হালদার : এমবিবিএস, এমডি (মাইক্রোবায়োলজি), সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ