ক্ষমতার ছায়ায় অনিয়ম, প্রতিবেদনে উন্মোচিত চট্টগ্রামের অন্দরের চিত্র

দাপুটে দল (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) আওয়ামী লীগ তখন ক্ষমতায়। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় তখন চলছিল এক নেতার শাসন। সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের বাড়ির একেকটি কক্ষ হয়ে উঠেছিল যেন পুলিশের থানা, ভূমি অফিস আর উপজেলা প্রশাসনের কার্যালয়। স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বনে যান মন্ত্রীর অনুগত রাজনৈতিক কর্মী। এ অবস্থায় মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের চোখ পড়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) এক শিক্ষকের ওপর।
ব্যক্তিগত সমস্যাকে কেন্দ্র করে ওই শিক্ষককে আসামি করে থানায় মিথ্যা মামলা রেকর্ড হয়। হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেওয়ার পরিবর্তে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন ওই শিক্ষক। নিজের মতো করে পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে ধরনা দিয়েও কোনো সমাধান মিলছিল না।
ঠিক ওই মুহূর্তে এগিয়ে আসে ঢাকা পোস্ট। ২০২৩ সালের ১১ জুন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ‘একই ঘটনায় দুই ধারায় মামলা, চবি শিক্ষককে ফাঁসাতে চান ওসি!’ নড়েচড়ে বসে পুলিশ সদরদপ্তর। তাদের নির্দেশনায় নতুন করে ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত হয়। নিরপরাধ ওই চবি শিক্ষককে অব্যাহতি দিয়ে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। মিথ্যা মামলার জঞ্জাল থেকে মুক্ত হন ওই শিক্ষক। পরবর্তীতে ঘটনাটি আরও দূর গড়ায়। ওই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওসি থানা থেকে প্রত্যাহার হন। পরে তাকে চাকরি থেকেও অপসারণ করা হয়।
২০২১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে দেশের প্রথমসারির অনলাইন মিডিয়া ঢাকা পোস্ট। এরপর থেকেই চট্টগ্রামের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, সমস্যা ও সম্ভাবনা এখানে প্রকাশিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত আলোচিত প্রতিবেদনগুলো প্রশাসনিক জবাবদিহি, আইনের শাসন ও মানবিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। এসব প্রতিবেদনের পর নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন, এমনকি বিচার বিভাগও। অনেক ক্ষেত্রে পুনঃতদন্ত হয়েছে, প্রত্যাহার হয়েছেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। একই সঙ্গে বাতিল হয়েছে বেআইনি সিদ্ধান্ত। এতে করে ভুক্তভোগীরা ফিরে পেয়েছেন ন্যায়বিচারের আলো।
২০২৩ সালের শুরুর দিকে আরেক ঘটনা। ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন (ইন্টারপোল) এর গোয়েন্দা তথ্যে বাংলাদেশে বিপন্নের তালিকায় থাকা বন্যপ্রাণী উদ্ধারে কাজ করে পুলিশ। এর পরিপ্রেক্ষিতে সফল অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করা হয়। তবে এক্ষেত্রে নির্দেশনা থাকে যে, সফল অভিযানের পাশাপাশি আসামিদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট পরিমাণ সাজা নিশ্চিত করতে হবে। এখন আসামি জুডিশিয়াল আদালতে সোপর্দ করা হলে সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাজা হয়, যা অপেক্ষাকৃত সময়সাপেক্ষ।
এ কারণে কিছু পুলিশ কর্মকর্তা ভিন্ন পথ বেছে নেন। তারা আসামিদের আদালতে হাজির না করে উপজেলা পর্যায়ে থাকা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে ডেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ইচ্ছেমতো সাজা নিশ্চিত করান। এতে করে তাদের পুরস্কার নিশ্চিত হয়। অথচ নিয়ম হলো পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার যেকোনো আসামিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করা। এক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসানোর কোনো এখতিয়ার কারও নেই। শুধুমাত্র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে এবং সেটি যদি মোবাইল কোর্টের তফশিলভুক্ত আইনের অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেওয়ার সুযোগ আছে।
লোহাগাড়া থানার তৎকালীন ওসি একের পর এক বেআইনি মোবাইল কোর্ট বসিয়ে আদালতের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে সাজা দেওয়ার প্রক্রিয়া চালাচ্ছিলেন। এ অববস্থায় ২০২৩ সালের ২৮ জানুয়ারি, ‘‘চট্টগ্রামে আদালতের নির্দেশনা অমান্য, ‘পুরস্কারের আশায়’ বেআইনি মোবাইল কোর্ট!’’ শিরোনামে ঢাকা পোস্টে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে নড়েচড়ে বসে পুলিশ বিভাগ। জেলার থানার ওসিদের উদ্দেশ্যে চিঠি ইস্যু করা হয় ‘এভাবে আর মোবাইল কোর্ট বসিয়ে সাজা দেওয়া যাবে না’ মর্মে। চট্টগ্রামের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটও থানার ওসিদের নির্দেশনা দেন আসামিকে সরাসরি বিচারিক আদালতে সোপর্দ করার।
চট্টগ্রামে অনিয়ম ও অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে জালিয়াতি করে নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়া এবং সংযোগ স্থানান্তরের বিষয়ে অনুসন্ধানে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় একটি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলায় আসামির তালিকায় ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের সাবেক প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক মন্ত্রী নুরুল ইসলামের ছেলে মুজিবুর রহমান। অন্যান্য আসামিরাও তার মতোই প্রভাবশালী। তাই মামলাটি তদন্ত করে আসামিদের অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন জানিয়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে দুদক।
কিন্তু মামলার এজাহারেই যথেষ্ট প্রমাণ থাকায় আদালত আসামিদের ছাড় দেননি। দুদকের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধ আমলে নেন। অবাক করার বিষয়, আদালতের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের টাকা খরচ করে আসামিদের বাঁচাতে উচ্চ আদালতে আপিলের সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন দুদক কর্মকর্তারা। বিষয়টি জানতে পেরে ঢাকা পোস্টে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ‘‘মন্ত্রিপুত্রকে ‘বাঁচাতে’ উচ্চ আদালতে যাচ্ছে দুদক!’’ এরপর আর এগোতে পারেনি দুদক। আপিল না করায় চট্টগ্রাম আদালতে বিচার শুরু হয়। মামলাটি এখনো বিচারাধীন।
পুলিশের প্রভাবশালী কর্মকর্তা বনজ কুমার তখন পিবিআইয়ের প্রধান। চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্ত করে চট্টগ্রামেও আলোচনায় আসে পুলিশের বিশেষায়িত সংস্থাটি। বিশেষ করে স্ত্রী হত্যাকাণ্ডে সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারকে আসামি করে মামলা করে তাক লাগিয়ে দেয় পিবিআই। ওই মামলায় চট্টগ্রাম আদালতের এক আইনজীবী পিবিআইকে আইনি পরামর্শ দেন। এর সুযোগ নিয়ে হঠাৎ ওই আইনজীবী নিজেকে পিবিআইয়ের আইন উপদেষ্টা হিসেবে পরিচয় দিতে থাকেন।
গাড়িতে লাগিয়ে বসেন পিবিআইয়ের স্টিকার। পিবিআই থেকে তাকে নিরাপত্তার জন্য বেআইনিভাবে দেওয়া হয় গানম্যান। এই সুযোগে তিনি পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোতে তদন্তাধীন বিভিন্ন মামলায়ও প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। বিষয়টি নিয়ে ঢাকা পোস্টে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, ‘পেশায় আইনজীবী, গাড়িতে লাগান পিবিআইয়ের স্টিকার।’ এরপর তিনি পিবিআইয়ের এই সাইনবোর্ড খুলে ফেলতে বাধ্য হন। পিবিআই সদরদপ্তর থেকে বিষয়টি নিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়, কারও কোনো ব্যক্তিগত গাড়িতে সংস্থাটির স্টিকার যাতে ব্যবহার করা না হয়।
যমজ সন্তানের মা হওয়া এক প্রাথমিক শিক্ষিকাকে ছুটি নিয়ে হয়রানি করছিলেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। উল্টো তারা ওই শিক্ষিকাকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যও করছিলেন। একপর্যায়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনৈতিক সিদ্ধান্তে চাকরি হারাতে বসেছিলেন চট্টগ্রামের আনোয়ারা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওই সহকারী শিক্ষিকা। সার্বিক বিষয় তুলে ধরে গত বছরের ১৬ মে ‘মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষিকাকে হয়রানির অভিযোগ’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে ঢাকা পোস্ট। বিষয়টি নিয়ে দেশের প্রধান প্রধান গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন। এতে প্রতিবেদন প্রকাশের দুয়েক দিনের মধ্যেই ছুটি সংক্রান্ত জটিলতা কেটে চাকরি ফেরত পান ওই শিক্ষিকা। সঙ্গে পান বকেয়া বেতনও।
মাদকের মামলায় এক করিমের বদলে আরেক করিম কারাভোগ করছিলেন। নামের মিল থাকায় সুযোগ নেয় পুলিশ। বিষয়টি নিয়ে ‘নামের মিলের সুযোগ নেয় পুলিশও! কার ভুলে নিরপরাধ করিমের কারাবাস?’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ঢাকা পোস্টে। নড়েচড়ে বসে আদালত ও কারা কর্তৃপক্ষ। আদালতের নির্দেশে মুক্তি পান নিরপরাধ ওই করিম।
২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম নগরের প্রবেশমুখ বাকলিয়া থানার নতুন ব্রিজ এলাকায় একটি চেকপোস্টে তল্লাশির সময় ইয়াবাসহ আটক হন ইমতিয়াজ হোসেন নামে এক পুলিশ সদস্য, যিনি কক্সবাজার আদালতে কর্মরত এক বিচারকের গানম্যান হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। প্রায় লাখখানেক ইয়াবা উদ্ধার করা হলেও এ ঘটনায় কোনো মামলা না করে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যকে ছেড়ে দেন বাকলিয়া থানার কয়েকজন কর্মকর্তা। বিষয়টি নিয়ে পরবর্তীতে 'ইয়াবা পাচারে বিচারকের গানম্যান, ধরেও ছেড়ে দিল পুলিশ' শিরোনামে ঢাকা পোস্টে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর ঘটনাটি নজরে আসে চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের। সরাসরি প্রতিবেদনটিকে বিবিধ মামলা হিসেবে রেকর্ড করে তদন্তের নির্দেশ দেয় আদালত।
এমআর/এমএসএ