ঢাকা পোস্টের ১৮২৫ দিন ও রংপুরের ৪৩৮০০ ঘণ্টা

ঢাকা পোস্ট শুধু নাম নয়, এটি আস্থা, বিশ্বাস ও গ্রহণযোগ্যতায় এগিয়ে থাকা একটি গণমাধ্যম। ‘সত্যের সাথে সন্ধি’ করে পাঠকপ্রিয়তা অর্জনের পথচলায় ঢাকা পোস্ট আজ ৬ষ্ঠ বর্ষে পদার্পণ করেছে। দেখতে দেখতে ১ হাজার ৮২৫ দিন এবং ঘড়িতে ৪৩ হাজার ৮০০ ঘণ্টার মাইলফলক ছুঁয়েছে। এই পাঁচ বছরে ঢাকা পোস্ট রাজধানীর চার দেওয়ালে সীমাবদ্ধ না থেকে ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে।
একঝাঁক তরুণ, উদ্যোমী ও কর্মনিষ্ঠ যোদ্ধার হাত ধরে পাঠকের কাছে প্রতিনিয়ত পৌঁছেছে নির্ভরযোগ্য সংবাদ। যার প্রভাব পড়েছে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, ধর্ম-কর্মম ক্রীড়াঙ্গন থেকে জীবনমানের উন্নয়নে। পেছনে ফেলে আসা পাঁচটি বছরের প্রতিটি সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা, দিন, ক্ষণ, মুহূর্ত ও বছর ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে ঢাকার বাইরে রংপুরে বিভিন্ন সময়ে ঢাকা পোস্টের একেকটি সংবাদে কখনো কোনো অসহায়ের ভাগ্য বদলেছে। আবার কখনো সংবাদ প্রকাশের পর গুরুত্বপূর্ণ কোনো কার্যালয়ে অভিযান বা পরিবর্তন এসেছে। আর্থসামাজিক উন্নয়ন, জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ নানান রকম অনিয়ম, দুর্নীতির পাশাপাশি মানবিক সংবাদের প্রভাব পড়েছে প্রান্তিক পর্যায়ে।
গত বছরের ২২ মে স্ত্রীকে নিয়ে বিচারাধীন একটি মামলার শুনানিতে অংশ নিতে ভ্যান চালিয়ে আদালতে আসেন আনারুল ইসলাম। কিন্তু শুনানিতে অংশ নেওয়া হয়নি তার। আদালতের নিচে রাখা জীবিকার একমাত্র অবলম্বন ভ্যানটি হারিয়ে দিশেহারা স্বামী-স্ত্রী কাঁন্নায় ভেঙে পড়েন। তাদের সেই আহাজারি আর বুকফাটা আর্তনাদের কথা তুলে ধরে ঢাকা পোস্ট।

‘আদালত চত্বরে ভ্যান হারিয়ে দিশেহারা আনারুল-আরেফা দম্পতি’ —শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর মানবিক সহায়তা বদলে যায় অসহায় এই দম্পতির জীবন। শুধু ভ্যানই নয়, আর্থিক সহযোগিতায় একটি গরু কিনে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প বুননের যুদ্ধ শুরু করেন আনারুল।
‘গরু নেই, তাই ৩৫ বছর ধরে বুক দিয়ে ঘানি টানছেন মোস্তাকিন দম্পতি’—শিরোনামে গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর সংবাদ প্রকাশ করা হয়। নীলফামারী থেকে পাঠানো এই সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর উপজেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এসে অসহায় দম্পতিকে ব্যাটারিচালিত ভ্যান ও নগদ অর্থ সহায়তা দেন। সমাজের বিত্তবান আরও অনেকই এগিয়ে আসেন।
এখন আর আগের মতো বুক দিয়ে ঘানি টানতে হয় না। বিদ্যুৎচালিত মেশিনে তেল মাড়াই বা বের করে বাজারে বিক্রি করেন মোস্তাকিন। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেওয়া ব্যাটারিচালিত ভ্যানটি ভাড়ায় দিয়ে এখন ভালোই দিন যাচ্ছে অসহায় পরিবারটির।
পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েও ভর্তির স্বপ্ন অনিশ্চিত হওয়া রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার এক দরিদ্র পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর মুহূর্তেই তার পাশে এগিয়ে আসেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। দেশের বিভিন্ন পর্যায় থেকেও মেলে সহায়তা। এখন সেই শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছেন। এমন অসংখ্য মানবিক সংবাদে যেমন সহায়তা পেয়েছে অনেক পরিবার, তেমনি মানবিক সংবাদে প্রকাশে এগিয়ে থাকা ঢাকা পোস্টও ছুঁয়েছে পাঠক হৃদয়।

সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সরকারিভাবে বিআরটিএ’র আর্থিক সহায়তা ব্যবস্থা থাকলেও শুধু প্রচারের অভাবে তা বেশির ভাগ মানুষের অজানা ছিল। সেই সংবাদ তুলে ধরে একদিনে জনসচেতনতা বাড়ানো, অন্যদিকে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের কিভাবে আর্থিক সহায়তা দেয় সরকার, তাও উঠে আসে ঢাকা পোস্টে।
অনুন্নত জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মেডিকেল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রদান না করার অভিযোগ প্রতিদিনের। দায়সারা চিকিৎসা ব্যবস্থা, ঝুঁকি এড়াতে রেফার্ড নির্ভরতা, অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট, সেবা পেতে বকসিস বাণিজ্য ও পথেপথে ভোগান্তি যেন থাকছেই না। এসবের কারণ খুঁজতে চেষ্টা করেছে ঢাকা পোস্ট। গত বছরের ১৫ জুলাই ‘সামান্য কারণে বাড়ছে রোগী রেফার্ড, হিমশিম খাচ্ছে রংপুর মেডিকেল কলেজ’ শিরোনামে প্রকাশ হয় একটি প্রতিবেদন। শুধু তাই নয়, হাসপাতালের বিকল রোগ নির্ণয় যন্ত্র, বাড়তি ব্যয়ে রোগীর ধুঁকে ধুঁকে মরার অদ্যোপান্তও উঠে এসেছে ঢাকা পোস্টে। স্বাস্থ্য বিভাগের উদাসীনতায় রংপুরে পড়ে থাকা ফ্রিজার অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর সেটি ব্যবহারের উদ্যোগ নেয় বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়।

কখনো কখনো অনিয়ম-দুর্নীতির অনেক তথ্য নানা কারণে চাপা পড়ে। কিন্তু ঢাকা পোস্টে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ ও সাংবাদিকতা থেকে না আসায় রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. মো. মাহবুবুর রহমান পড়েন বিপাকে। নানা প্রলোভন দেখিয়ে আড়াল করতে পারেনি তার ‘রিং বাণিজ্য’। একাধিক সংবাদ প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে হাসপাতাল প্রশাসন ও তার সহকর্মীরা। ক্ষতিগ্রস্ত রোগীরা অশ্রয় নেন আইনের। একটি রিং লাগিয়ে তিনটির বিল নেওয়া এই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে করেন মামলা। অবশেষে ডা. মো. মাহবুবুর রহমানকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে অন্যত্র বদলি করা হয়।
গত ৫ বছরে ঢাকা পোস্টে রংপুর জেলা থেকে ৪ হাজার ৭৫৫টি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এ তালিকায় প্রথম বছরে ১২০০টি, দ্বিতীয় বছরে ৯২১, তৃতীয় বছরে ১০০৪, চতুর্থ বছরে ৭৬২ এবং এ বছরে ৮২৬টি রিপোর্ট রয়েছে। যার সঙ্গে রয়েছে ৩ শতাধিকের বেশি ভিডিও প্রতিবেদন।

চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে থাকা সাহসী তরুণ-তরুণীদের গল্পও তুলে ধরেছে ঢাকা পোস্ট। ‘মা ফোনে কাঁদতেন, কিন্তু লড়াইয়ে পিছু হটার সুযোগ নেই’ বলা সেই ছেলে-মেয়েরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে আবু সাঈদের প্রসারিত দুই হাতের আহ্বানে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। গণঅভ্যুত্থানের পর তাদের বেশির ভাগই রাজনীতির মারপ্যাচের সমীকরণে না থেকে ফিরেছেন পড়ার টেবিলে।
বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতার ধারা বদলে দিয়েছে ঢাকা পোস্ট। বস্তুনিষ্ট সংবাদ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে খুব অল্প সময়ে সব শ্রেণিপেশার মানুষের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। পাঠকের প্রত্যাশা পূরণের যে চ্যালেঞ্জ, তা পাঁচ বছরের মধ্যে উতরে যাওয়াটা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। কিন্তু ঢাকা পোস্ট সেটা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল গণমাধ্যমে নতুনত্ব এনেছে। মানবিক সাংবাদিকতায়ও গতি এনেছে। গ্রাম থেকে শহরে, সবখানে সবার সংবাদ তুলে ধরার কারণে এখন তৃণমূলে পাঠক সৃষ্টিতে ঢাকা পোস্ট এগিয়ে রয়েছে।

গত পাঁচ বছরে রংপুরের নানান সমস্যা-সম্ভাবনা, উন্নয়ন, অনিয়ম-দুর্নীতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম-কর্ম, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াঙ্গনের খবরাখবর সঙ্গে একটু একটু করে মিশে গেছে ঢাকা পোস্ট। বাদ পড়েনি ভাওয়াইয়া, শতরঞ্জি, হাঁড়িভাঙা আর বেনারসি পল্লীর গল্প।
মানবিক সংবাদের কারণে ‘অসহায় মানুষের ভাগ্য বদলে সহায়ক ভূমিকা’ রেখেছে ঢাকা পোস্টের একেকটি প্রতিবেদন। অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার টাকা না থাকায় ৯ ঘণ্টা রিকশা চালিয়ে ঠাকুরগাঁও থেকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে আসা বাবা তারেক ইসলামকে নিয়ে ভিডিওসহ প্রথম সংবাদ প্রকাশ করেছিল ঢাকা পোস্ট। এরপর অসহায় সেই বাবার সন্তানের চিকিৎসায় এগিয়ে আসেন দেশের বৃহত্তম সুপারশপ স্বপ্ন-এর নির্বাহী পরিচালক সাব্বির হাসান নাসির, তৎকালীন জেলা প্রশাসক আসিব আহসানসহ অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। বিষণ্নতা কাটিয়ে চিকিৎসা শেষে সুস্থ সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ফিরেন তারেক। সহায়তার অর্থে গ্রামে কিনেছেন জমি, গড়েছেন মাথা গোঁজার ঠাঁই। এখনো ফোন করে খোঁজ নেন ঢাকা পোস্টের এই প্রতিবেদকের।
এএমকে