ধর্ম যার যার থাকুক, উৎসব হোক সবার

Probhash Amin

১৩ অক্টোবর ২০২১, ০৮:৩০ এএম


ধর্ম যার যার থাকুক, উৎসব হোক সবার

শরতে প্রকৃতির রং সাদা। আকাশে সাদা মেঘের ভেলা আর প্রকৃতিতে কাশফুলের ঢেউ। কিন্তু শরৎ এলেই বাংলার আকাশে-বাতাসে যেন উৎসবের রঙ লাগে। এ উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। মান্না দে তার গানে শরৎ এলেই উৎসবের জন্য মন উচাটন করার কথা বলেছিলেন, ‘আজ শরতের কাশের বনে হাওয়ার লুটোপুটি, মন রয় না রয় না এই বিদেশে চায় যে এবার ছুটি…’। সত্যিই বাতাসে যখন উৎসবের ঘ্রাণ, তখন সবার ইন্দ্রিয়ই তা ছুঁয়ে যায়। এটা ঠিক, দুর্গাপূজা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান। কিন্তু দুর্গাপূজাকে ঘিরে যে উৎসব- শারদীয় দুর্গোৎসব; তা সবার উৎসব, সব বাঙালির আনন্দ আয়োজন। 

অসাম্প্রদায়িক চেতনা বাঙালির রক্তে মিশে আছে। তাই তো ধর্মের ভিত্তিতে গড়া রাষ্ট্র পাকিস্তান টিকতে পেরেছিল মাত্র ২৩ বছর। একাত্তর সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনায়। বাংলাদেশের সংবিধানেও সেই চেতনার ঠাঁই হয়েছে।

ধর্মনিরপেক্ষতা আমাদের সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি। কিন্তু সামরিক শাসকরা বারবার নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। জিয়াউর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় একাত্তরের পরাজিত সাম্প্রদায়িক শক্তি রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়। এরশাদ আরও একদফা বাড়িয়ে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে।

দুর্গাপূজা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান। কিন্তু দুর্গাপূজাকে ঘিরে যে উৎসব- শারদীয় দুর্গোৎসব; তা সবার উৎসব, সব বাঙালির আনন্দ আয়োজন।

আশির দশকে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করার প্রতিবাদ হয়েছিল সম্মিলিতভাবে। তখন দুটি স্লোগান খুব জনপ্রিয় হয়েছিল, ‘যার ধর্ম তার কাছে, রাষ্ট্রের কী করার আছে’। আরেকটি স্লোগান ছিল ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। এই স্লোগান দুটিই আমাদের মৌলিক চেতনাকে ধারণ করে।
মুক্তিযুদ্ধের সময়কার আরেকটি স্লোগানও অল্প কথায় আমাদের মূল চেতনাকে ধারণ করে ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার খৃস্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান; আমরা সবাই বাঙালি’। এটাই আমাদের চেতনা। ধর্মের সাথে জাতীয়তার কোনো বিরোধ নেই। ধর্মের সাথে উৎসবের কোনো বিরোধ নেই। এভাবেই সবাই মিলেমিশে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এটি শুধু কথার কথা নয়। ছেলেবেলা থেকেই আমরা এটি দেখে আসছি। ঈদের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা মুসলমানদের, উৎসবটা সবার। পূজার ধর্মীয় আচার হিন্দুদের, উৎসবটুকু সবার।

ঈদের সেমাই, পূজার নাড়ু সবার ঘরেই পৌঁছে যায়। গত তিনবছর ধরে এই ‘উৎসব সবার’ কথাটি আরও বেশি করে উপলব্ধি করছি। ২০১৯ সাল থেকে কারওয়ান বাজারে এটিএন নিউজের সামনের খালি চত্বরে মিডিয়াপাড়া দুর্গোৎসবের আয়োজন হচ্ছে। এই উৎসবের নাচুনে বুড়ি মুন্নী সাহা, আমি তার ঢোলের বাড়ি। এই উৎসব আয়োজন করতে গিয়ে আমি সর্বজনীনতা টের পেয়েছি আরও ভালো করে।

মূলত বিভিন্ন মিডিয়া হাউজের পৃষ্ঠপোষকতায় এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। প্রথমবার আয়োজনের সময় আমরা ভাবলাম, যেহেতু কারওয়ান বাজারে আয়োজন, তাই এখানকার ব্যবসায়ীদেরও সাথে নেওয়া দরকার।

ব্যবসায়ী নেতারা যেদিন অফিসে এলেন, তাদের দেখে আমরা একটু দমে গেলাম। বেশিরভাগই হজ করে আসা, অধিকাংশের পরনে পাঞ্জাবি-টুপি। আমার আশঙ্কা ছিল কারওয়ান বাজারে পূজার আয়োজনে তারা বাধ সাধবেন না তো! কিন্তু সেই আশঙ্কা অমূলক প্রমাণিত হতে কয়েক মিনিট মাত্র সময় লেগেছে।

ব্যবসায়ী নেতা এবং সাধারণ ব্যবসায়ীরা বিপুল উদ্যমে উৎসব আয়োজনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। প্রতি রাতেই কারওয়ান বাজারে সবজিবাহী ট্রাকের লাইন লেগে যায়। ব্যবসায়ীরা সেই লাইন ঘুরিয়ে দিলেন অন্যদিকে। শৃঙ্খলা রক্ষায় নিজেরাই স্বেচ্ছাসেবী হয়ে গেলেন। পূজার খাবারের জন্য ব্যবসায়ীরা সানন্দে পণ্য সরবরাহ করলেন। দুর্গোৎসবে যেন কারওয়ান বাজারে উৎসবের বান ডাকে।

এটিএন নিউজের এই আয়োজন শুধু পূজায় নয়, সমান তালে চলে ঈদেও। বিদ্যানন্দের সাথে মিলে রোজায় ইফতার বিলি হয়। ঈদে ১০ টাকায় কেনা যায় নতুন পোশাক। পূজায়ও ১০ টাকায় নতুন কাপড় কেনার সুযোগ থাকছে। চাইলে এটিএন নিউজ আর বিদ্যানন্দ বিনামূল্যেই এই পোশাক বিলি করতে পারত। তাতে ভিক্ষার একটা আবরণ থাকত। কিন্তু এখানে সবাই ১০ টাকা হলেও নিজের টাকায় পছন্দ করে, বাছাই করে পোশাক নিতে পারছে। ঈদে বা পূজায় এই পোশাকের লাইনে সব ধর্মের মানুষ দাঁড়ায়। এই যে আনন্দের সর্বজনীনতা এটাই বাংলাদেশ।

কিন্তু কখনো কখনো এই বাংলাদেশকে বড্ড অচেনা মনে হয়। সংখ্যালঘুরা নানাভাবে নির্যাতিত হয়। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুর সংখ্যা ক্রমশ কমছে। এটা সংখ্যাগুরুদের জন্য লজ্জার। কলাবাগান মাঠের শারদীয় দুর্গোৎসব গত কয়েক বছর ধরে ধানমন্ডি-মোহাম্মদপুর এলাকার মানুষের অন্যতম গন্তব্য। কিন্তু এবার সেখানে পূজার অনুমতি মেলেনি। ধর্মনিরপেক্ষতা যে দেশের সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি, সেই দেশে একটি নিয়মিত পূজার আয়োজনের অনুমতি না পাওয়াটা অবিশ্বাস্য।

ধর্মনিরপেক্ষতা যে দেশের সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি, সেই দেশে একটি নিয়মিত পূজার আয়োজনের অনুমতি না পাওয়াটা অবিশ্বাস্য।

আসলে যে দেশের সংখ্যালঘুরা যত ভীত, যত নির্যাতিত; ধরে নিতে হবে সে দেশের সংখ্যাগুরুরা তত খারাপ। সংখ্যাগুরুদের দায়িত্ব হলো সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করা, তাদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের অভয় দেওয়া। আর ইসলাম ধর্মও সবার ধর্ম পালন নিশ্চিত করে। এবার যেমন বিজয়া দশমীর প্রতিমা বিসর্জন পড়েছে শুক্রবারে।

পূজা উদযাপন পরিষদ বলে দিয়েছে, জুমার নামাজের সময় যেন পূজা বা বিসর্জনের কোনো আয়োজন রাখা না হয়। বাংলাদেশে অনেক জায়গায় পাশাপাশি মসজিদ আর মন্দির আছে। আজান এবং নামাজের সময় মন্দিরে পূজা বন্ধ থাকে। আবার মুসলমান যুবকরাই অনেক জায়গায় মণ্ডপ পাহারা দেয়। এভাবেই মিলেমিশে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। 

শুরুতে যেমন বলেছি, সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান থেকে অসাম্প্রদায়িক চেতনাতেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান ক্রমশ অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ভারতও এখন চরম সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশই এই অঞ্চলের অসাম্প্রদায়িক চেতনার শেষ ভরসা হয়ে থাকুক। যেখানে সব ধর্মের মানুষ নিশ্চিন্তে তাদের নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারবে। ধর্ম যার যার থাকুক, উৎসব হোক সবার।

প্রভাষ আমিন ।। বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ
[email protected]

Link copied