১৪৪ বছরের সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড : ইতিহাস ও আধুনিকতার মেলবন্ধন

বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম ঐতিহাসিক ভেন্যুর একটি সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড। যা ক্রিকেট অঙ্গনে এসসিজি নামেই পরিচিত। নারী এশিয়া কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট কাভার করতে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে অবস্থান করা ঢাকা পোস্টের সিনিয়র স্পোর্টস রিপোর্টার আরাফাত জোবায়ের ঘুরে দেখেছেন এসসিজি।
ড্রেসিংরুমে ১৮৮৬ সালের বেঞ্চ
১৮৪৮ সালে সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড স্টেডিয়ামের গোড়াপত্তন। সেই সময় গ্যারিসন গ্রাউন্ড নামেও পরিচিতি ছিল। ১৮৭৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিডনিতে টেস্ট ক্রিকেটের যাত্রা শুরু। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট শুরুর চার বছর পর ড্রেসিংরুমে একটি বেঞ্চ প্রবেশ করে। ১৪০ বছর ধরে অস্ট্রেলিয়ার ড্রেসিংরুমে সেই বেঞ্চ। সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে অস্ট্রেলিয়ার ড্রেসিংরুমের নাম ব্র্যাডম্যান। সেখানে ১৪০ বছর বয়সী সেই বেঞ্চ সবুজ রংয়ে যেন এখনো চির সবুজ। এসসিজির কমিউনিকেশন হেড ফিল হেড বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার ড্রেসিংরুমে ঐতিহ্যের প্রতীক এই বেঞ্চ। সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড কর্তৃপক্ষ এটি বিশেষভাবে যত্ন নিয়ে রাখছে।’

স্টেডিয়ামের আধুনিকায়ন ও সংস্কার হলেও ড্রেসিংরুমে পুরনো আবহ। অস্ট্রেলিয়ার ড্রেসিংরুমে এই ভেন্যুতে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টেস্ট-ওয়ানডে সেঞ্চুরি ও পাঁচ উইকেট পাওয়া ক্রিকেটারদের নামের বোর্ড রয়েছে। একইভাবে সফরকারী দলের জন্য রয়েছে আলাদা বোর্ড। দুই দশকের বেশি সময় টি টোয়েন্টি অনেক ম্যাচ হলেও এজন্য নেই কোনো বোর্ড। বাংলাদেশ সিডনিতে টেস্ট না খেললেও ওয়ানডে খেলেছে। এক দিনের ম্যাচে বাংলাদেশি কোনো ক্রিকেটার সেঞ্চুরি ও পাঁচ উইকেটের কৃতিত্ব না দেখাতে পারায় বোর্ডেও নাম নেই।
ড্রেসিংরুমের নিচ তলায় গ্রাউন্ডসের সরঞ্জাম। সেখানে শতবর্ষ ধরে ব্যবহার হওয়া রোলার মেশিন রয়েছে। রোলার মেশিনের আয়ুষ্কাল খুব বেশি হয় না। এরপরও সেটি পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করে ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখছে এসসিজি।
১৪৮ বছরে ৯ কিউরেটর
রান ও উইকেটের খেলা ক্রিকেট। সেই রান ও উইকেট অনেকাংশে নির্ভর করে পিচের ওপর। তাই ক্রিকেট পিচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পিচ তৈরির কাজ করেন কিউরেটর। ফলে তিনিও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে শুধু ক্রিকেটারদের রেকর্ড নয় কিউরেটরদেরও বোর্ড রয়েছে। সেখানে কে কত দিন দায়িত্ব পালন করেছে সেটাও সুন্দরভাবে লিপিবদ্ধ।
সিডনির উইকেট খানিকটা স্পিন ও ব্যাটিং বান্ধব। ১৮৮২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সিডনিতে মাত্র ৯ জন কিউরেটর দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৪৪ বছর বয়সী ভেন্যুতে প্রধান কিউরেটর সংখ্যা মাত্র নয়জন।

বাংলাদেশের হোম অফ ক্রিকেটে লঙ্কান কিউরেটর গামিনী সিলভা ছিলেন প্রায় এক দশকের বেশি সময়। উইকেটের মান নিয়ে সমালোচনা হওয়ায় তিনি কেন এই পদে দীর্ঘদিন এ নিয়ে প্রশ্ন উঠত প্রায়ই। সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে একজন ৩০ বছরের বেশি কিউরেটরের পদে ছিলেন ৷ ১৪৮ বছরে মাত্র নয় জন কিউরেটর হওয়ায় একজনের গড় মেয়াদ ১৫ বছরের বেশি।
কিউরেটরের পাশের বোর্ডেই রয়েছে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের নাম। সেখানের তালিকাও সংক্ষিপ্ত। প্রায় ১৫০ বছরের ভেন্যু হলেও এসসিজির সিইও তালিকা দশ পার হয়েছে মাত্র।
এসসিজি মেম্বার লাউঞ্জ, ঐতিহ্যের গ্যালারি
টেলিভিশনে দেখা যায় সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ড্রেসিংরুম থেকে ক্রিকেটাররা মাঠে যাচ্ছেন অথবা আউট হয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরছেন দর্শকদের পাশ দিয়ে। ক্রিকেটারদের অতি সান্নিধ্য পাওয়ার সুযোগ কেবল এসসিজি মেম্বারদের। সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে দর্শক ধারণ ক্ষমতা ৪০ হাজারের বেশি। এর মধ্যে ১০ হাজার আসন এসসিজি মেম্বারদের জন্য সংরক্ষিত। সিডনিতে আন্তর্জাতিক বা ঘরোয়া গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ হলে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া সাধারণ কিংবা ভিআইপি অন্য অংশের টিকিট বিক্রি করে। এসসিজি মেম্বারদের টিকিটের বিষয়টি এসসিজি আলাদাভাবেই দেখে। সিডনি ক্রিকেট বা ক্রীড়াঙ্গনে যারা বিশেষ অবদান কিংবা অনুদান দেন তারাই এসসিজি মেম্বার হতে পারেন ৷ গ্লেন ম্যাকগ্রা, স্টিভ ওয়াহসহ আরও কয়েকজন প্রসিদ্ধ ক্রিকেটার এসসিজি মেম্বার। ক্রিকেটের বাইরে ফুটবল, রাগবির অনেক খেলোয়াড় ও কর্মকর্তা এসসিজি মেম্বার৷ এসসিজি মেম্বার লাউঞ্জের অবস্থান দুই ড্রেসিংরুমের মাঝে৷ খেলার বিরতিতে এসসিজি মেম্বাররা মধ্যাহ্নভোজ,পানীয় পান করতে পারেন। যে সুযোগ অন্য সাধারণ দর্শকদের নেই।

সিডনি ক্রিকেট বিশ্বের আধুনিক ভেন্যুর একটি। সময়ের সঙ্গে তাল মেলালেও ইতিহাস ঠিকই ধরে রেখেছে। ১৮৮২ সালে অভিষেক টেস্টের সময় দর্শকদের গ্যালারি ছিল কাঠের। এক শতাব্দীতে অনেক সংস্কার হলেও সেই পুরনো কাঠের গ্যালারি ছোট্ট একটি অংশ রেখেছে ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে।
ঐতিহাসিক ক্রিকেট ভেন্যুতে ফুটবল, রাগবিও
সিডনি মূলত ক্রিকেট ভেন্যু হিসেবে স্বীকৃত হলেও এখানে রাগবি এবং ফুটবলও হয়। সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ব্র্যাডম্যান, বোর্ডারের নামে যেমন গ্যালারি স্ট্যান্ড রয়েছে তেমনি রয়েছে রাগবি খেলোয়াড়দের নামও। সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডের কর্মকর্তা হেডস ভেন্যু ব্যবস্থাপনা নিয়ে বলেন, ‘গ্রীষ্মকালীন সময়ে ক্রিকেট হয় শীতকালে অস্ট্রেলিয়ান স্পোর্টস। এভাবে দীর্ঘদিন থেকে ব্যবহার হয়ে আসছে। তবে এখন অন্য খেলার আন্তর্জাতিক ম্যাচ একটু কমই হয়। ঘরোয়া পর্যায়ের প্রতিযোগিতা হয়। অন্য খেলা হলেও ক্রিকেটের পিচ সুরক্ষিত থাকে। এখানে ১২ টি ক্রিকেট পিচ রয়েছে।’
বাংলাদেশে ঢাকা স্টেডিয়ামে এক সময় ফুটবল ও ক্রিকেট ভাগাভাগি করে খেলা হতো। এখন দুই খেলা ভিন্ন ভিন্ন স্টেডিয়ামে হয়। অস্ট্রেলিয়ার অনেক মাঠেই বিশেষ করে ফুটবল স্টেডিয়ামে রাগবিও হয়। বাংলাদেশে সম্প্রতি রাগবি ম্যাচ ফুটবল স্টেডিয়ামে আয়োজন নিয়ে দুই ফেডারেশনের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ হয়।
লারার এসসিজি
বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম কিংবদন্তি ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্রায়ান লারা সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ২৭৭ রান করেছিলেন। সিডনির কীর্তির জন্য তাঁর মেয়ের নামও রেখেছেন সিডনি। সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডের কমিউনিকেশন অফিসার ফিল হেডস বলেন, ‘লারা বছরে অন্তত একবার হলেও সিডনি ঘুরতে আসেন। একবার তার মেয়েকে সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডেও নিয়ে এসেছিলেন।’ লারা যেমন সিডনিকে ধারণ করেন তেমনি সিডনিও লারার সেই ২৭৭ রানের ইনিংসের স্কোরকার্ডকে অ্যাওয়ে দলের ড্রেসিংরুমের মাঝে সংরক্ষণ করেছে।

ফিল হিউজ কর্নার
অনেক রেকর্ড নানা কীর্তির পাশাপাশি সিডনি শোকেরও সঙ্গী। ২০১৪ সালে সিডনিতেই প্রাদেশিক টুর্নামেন্টে শন অ্যাবটের বাউন্সারে আঘাত পেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ফিল হিউজ। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও পৃথিবী থেকে বিদায় নেন হিউজ। হিউজের অকাল চলে যাওয়া পুরো ক্রিকেটকে কাঁদায়। সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড হিউজের ছবি দিয়ে ছোট্ট কর্নার করে স্মরণে রেখেছে।
মিডিয়া হল অফ অনার
সাংবাদিক হিসেবে প্রেসবক্সের প্রতি বাড়তি আকর্ষণ। সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডের প্রেসবক্স বেশ অসাধারণ। চার তলা উচ্চতায় মনোরম পরিবেশে টুর্নামেন্ট কাভার করা যায়৷ প্রেসবক্স লাউঞ্জ অনেক বড় হওয়ায় ধারাভাষ্যকার, সাবেক ক্রিকেটাররা ম্যাচ চলাকালে আসেন। সাংবাদিকরা তাই সহজেই এসসিজিতে সাবেক তারকাদের সান্নিধ্য পায়। হেডের তথ্য মতে, এসসিজিতে ১২০ জন সাংবাদিক একসঙ্গে বসতে পারেন। মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড অনেক বড় হলেও প্রেসবক্সের আসন সীমিত।

অস্ট্রেলিয়ান সাবেক ক্রিকেটার রিচি বেনো ক্রিকেটের কন্ঠস্বর। প্রয়াত রিচি বেনোর নামে সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডের প্রেসবক্সের নামকরণ করা হয়েছে। ক্রিকেটের প্রচার ও প্রসারে মিডিয়ার ভুমিকা অনেক। তাই দীর্ঘদিন যারা অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ও ক্রীড়ায় মিডিয়ায় অবদান রেখেছে তাদের আলাদা নাম ও কর্ণার রয়েছে। সেখানে ক্যারি প্যাকার, রিচি বেনো থেকে শুরু করে অনেক সাংবাদিক, ক্রীড়া লেখক আছেন। ২০১৪ সাল থেকে এই স্বীকৃতি প্রদান করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের মতো অস্ট্রেলিয়াও সাংবাদিকরা ক্রীড়াবিদদের বর্ষসেরা স্বীকৃতি দেয়৷ অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়া ক্রিকেট এসোসিয়েশন কোন বছর কোন ক্রিকেটাররকে পুরস্কার দিয়েছে সেটার আলাদা বোর্ড রয়েছে প্রেসবক্সে।
জাদুঘরে ব্র্যাডম্যানের টুপি, গ্লাভস
বাংলাদেশে একটি ক্রীড়া জাদুঘর নেই। ক্রীড়ায় উন্নত বিশ্বে প্রতি স্টেডিয়াম,ক্লাব ও ফেডারেশনে আলাদা আলাদা জাদুঘর রয়েছে। সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডের ইতিহাস, কীর্তির তুলনায় অবশ্য জাদুঘর খানিকটা ছোটই। স্টেডিয়ামের এ নম্বর গেট দিয়ে প্রবেশের পরপরই চোখে পড়বে এস.সি.জি মিউজিয়াম।

জাদুঘরে প্রধান আকর্ষণ ডন ব্র্যাডম্যানের স্মৃতি। তার ব্যবহার করা টুপি ও গ্লাভস জাদুঘরে বিশেষভাবে সংরক্ষিত। সিডনি স্টেডিয়ামের পুরনো ছবি, উইজডেনের শুরু থেকে প্রকাশিত সকলসংখ্যা বিশেষভাবে সংগ্রহে রেখেছে এসসিজি কর্তৃপক্ষ। ইংল্যান্ডের অধিনায়ক বেন স্টোকস এবার অস্ট্রেলিয়া সফরে তার বল, জার্সি এসসিজিতে দিয়েছে। সেটা আলাদাভাবে রয়েছে জাদুঘরে। ভারত প্রায়ই সফর করে সিডনিতে। তাই কোহলিসহ সাবেক দুই তিন জনের জার্সি দিয়ে আলাদা কর্নার রয়েছে। সিডনিতে অন্য দেশের জার্সি থাকলেও বাংলাদেশের নেই। হয়তো বাংলাদেশ এখনো সিডনিতে এখনো টেস্ট খেলেনি এজন্য!
ক্রিকেট ছাড়া ফুটবল ও রাগবি খেলাও চলে এই ভেন্যুতে। তাই ক্রিকেটের মধ্যে ছোট্ট করে রাগবি ও ফুটবলের কিছু বিশেষ স্মারকও রয়েছে জাদুঘরে।
এজেড/এফআই