জয়পুরহাটের ক্ষেতলালে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসনিয়া খাতুন (১০) হত্যার সাড়ে তিন মাস অতিবাহিত হলেও এখনো উদঘাটিত হয়নি এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য। মামলার এজাহারভুক্ত ৬ আসামির মধ্যে অন্যতম ৩ জন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে।

হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন ও পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টায় ক্ষেতলালের বটতলী বাজারে মানববন্ধনের ডাক দিয়েছিলেন এলাকাবাসী ও নিহতের স্বজনরা। কর্মসূচি পালনে নির্ধারিত সময়ে লোকজন জড়ো হতে শুরু করলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন ক্ষেতলাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরে আলম সিদ্দিকী। তিনি আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের আশ্বাস দিয়ে মানববন্ধন না করার অনুরোধ করেন। এ কারণে বৃহস্পতিবারের পূর্ব নির্ধারিত মানববন্ধন হয়নি। এর আগেও একই দাবিতে গত বছরের ১২ নভেম্বর মানববন্ধন আয়োজনের ডাক দেওয়া হলেও পুলিশের অনুরোধে সে সময়ও তা স্থগিত করা হয়েছিল।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিহত তাসনিয়া খাতুন ক্ষেতলাল উপজেলার শালবন গ্রামের এরশাদ হোসেনের মেয়ে। সে বটতলী বাজারের সানরাইজ কিন্ডারগার্টেন স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় বাড়ির পাশে খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয় মেয়েটি। এর দুদিন পর ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে প্রতিবেশী একরামুল হোসেনের বাড়ির গোয়ালঘর থেকে তাসনিয়ার অর্ধগলিত বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ জনতা বাড়ির মালিকের স্ত্রী হাবিবা আকতার কুমকুম ও গৃহপরিচারিকা আঞ্জুয়ারা বেগমকে আটক করে পুলিশে দেন। পরবর্তীতে ২০ সেপ্টেম্বর নিহতের বাবা এরশাদুল হক বাদী হয়ে ৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এদিন দুই নারী আসামিকে আদালতে পাঠানো হলে হাবিবা আকতার কুমকুম আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। পরে আসামি একরামুল ২৩ সেপ্টেম্বর আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন প্রার্থনা করেন। আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

নিহত শিশু তাসনিয়ার বাবা এরশাদ হোসেন বলেন, ৬ জন আসামির মধ্যে দুইজনকে জনগণ ধরে দিয়েছে, আর একজন আত্মসমর্পণ করেছে। কিন্তু অন্য তিনজন আসামিকে এখনো ধরা হয়নি। তিনমাস পার হয়ে গেলেও মূল আসামিদেরকে ধরা হয়নি। পুলিশ এখনও হত্যার রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি।

তিনি বলেন, আমার মেয়েকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হতে পারে। তাছাড়া আমার সাথে তাদের (আসামি) কোনো বন্ধুত্ব নেই এবং কোনো শত্রুতাও নেই। আমি অন্য তিন আসামিকে গ্রেপ্তার ও হত্যার রহস্য উদঘাটনের দাবিতে আজকে মানববন্ধন করতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু ওসি স্যার নতুন এসেছেন এবং বিষয়টি দেখবেন বলে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। এজন্য তার ওপরেই ছেড়ে দিয়েছি। এর আগেও এ রকম মানববন্ধন করতে চেয়েছিলাম, তখন এক ওসি স্যার এসে ১৫ দিনের সময় নিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা বিচার পাইনি। এবারও নতুন ওসি স্যারের ওপর ছেড়ে দিলাম। উনি এটি দেখবেন বলে আমি আশা করছি। এ কারণে আমরা দ্বিতীয় বারের মতো মানববন্ধন স্থগিত করেছি।

এলাকার বাসিন্দা আব্দুল আলীম বলেন, আলোচিত শিশু তাসনিয়া হত্যাকাণ্ডের সাড়ে তিন মাস অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের রহস্য পুলিশ উন্মোচিত করতে পারেনি। এখনো অন্যতম ৩ আসামির কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। পুলিশের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকায় আমরা বাধ্য হয়ে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১টায় মানববন্ধনের ডাক দিয়েছিলাম। কিন্তু ওসির অনুরোধে মানববন্ধন স্থগিত করা হয়েছে।

ক্ষেতলাল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরে আলম সিদ্দিকী বলেন, আমি এই থানায় নতুন যোগদান করেছি। বাদীর দাবির প্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এসেছে এবং অপেক্ষমান অবস্থায় আছে। চিকিৎসক কোনো মতামত দেননি। এছাড়া ডিএনএ’র জন্য কাপড় পাঠানো হয়েছে, কিন্তু প্রতিবেদন আসেনি। ডিএনএ প্রতিবেদন আসলে চিকিৎসক চূড়ান্ত মতামত দেবেন এবং বিষয়টি জানা যাবে। সেজন্য ধর্ষণের বিষয়টি এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে পলাতক তিন আসামিকে গ্রেপ্তারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

চম্পক কুমার/আরএআর