চাকরি জীবনে জমানো টাকা অবসরে যাওয়ার পর সময় মতো পাচ্ছেন না বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা। অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের পর্যাপ্ত ফান্ড না থাকায় অনেক শিক্ষক তার জমানো টাকা না পেয়েই মারা যাচ্ছেন। অনেকে টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায়ও মারা যাচ্ছেন। সময় মতো টাকা না পাওয়ায় অনেকের সন্তানের পড়াশোনা, এমনকি মেয়ের বিয়ে পর্যন্ত আটকে যাচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন অবসর ও কল্যাণ বোর্ডের শিক্ষকরা।

রাজধানীর নীলক্ষেতে বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) ভবনে অবসর ও কল্যাণ বোর্ডের অফিসে জমানো টাকা তুলতে গেলে শিক্ষকদের চোখ কান্নায় ভেসে আসে। এ অবস্থায় অবসরপ্রাপ্ত এমপিওভুক্ত ১২ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীকে মুজিববর্ষে উপহার হিসেবে তাদের পাওনা টাকা বুঝিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে অবসর ও কল্যাণ বোর্ড। এজন্য সরকারের কাছে ৮০৪ কোটি টাকা চেয়েছে কর্তৃপক্ষ। 

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সালের ১ জুলাই যারা আবেদন করেছেন তারা এখনও টাকা পাননি। অর্থাৎ অবসরে যাওয়ার প্রায় তিন বছর পরও শিক্ষকরাও তাদের পাওনা বুঝে পাচ্ছেন না। সে সময় থেকে চলতি বছরের ২১ মার্চ পর্যন্ত নিষ্পত্তি করার জন্য আবেদন জমা পড়েছে ২৫ হাজার ৩০৯টি। যা পরিশোধে প্রয়োজন ২ হাজার ৭শ কোটি টাকা।

জানা যায়, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে প্রতি মাসে ছয় শতাংশ হারে যে টাকা কর্তন করা হয় তা দিয়ে বছরে তহবিলে জমা হয় ৭২০ কোটি টাকা। ভাতা দেওয়ার জন্য প্রয়োজন হয় হাজার কোটি টাকা। যেখানে ঘাটতি থাকে ২৮০ কোটি টাকা। মুজিববর্ষে ১২ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর পাওনা পরিশোধ করতে চায় বোর্ড। এজন্য দরকার হবে ১ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। মুজিববর্ষের বাকি আট মাসে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে ছয় শতাংশ করে কর্তনের মাধ্যমে আদায় হবে ৪৮০ কোটি টাকা। ঘাটতি থাকবে ৮০৪ কোটি টাকা। আর মুজিববর্ষের বিশেষ কর্মসূচির আওতায় এ টাকা বিশেষ বরাদ্দ চায় অবসর সুবিধা বোর্ড। সেজন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করেছেন বোর্ডের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ শরীফ আহমদ সাদী।

জানতে চাইলে শরীফ আহমদ সাদী নিজ দফতরে ঢাকা পোস্টকে বলেন, সরকার মুজিববর্ষে সবাইকে কিছু না কিছু উপহার দিচ্ছে। আমরা চাই সারাজীবন আলোর দ্বীপ জ্বালানো এসব শিক্ষকদের জন্য কিছু উপহার নিয়ে আসতে।

তিনি বলেন, মুজিববর্ষে ১২ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীকে উপহার হিসেবে চেক বিতরণ করতে চাই। এজন্য ৮০৪ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ঊর্ধ্বতনরা আমাকে উপহার দেওয়ার ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছেন।  

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকরা জানান, জমানো টাকা পেতে সংশ্লিষ্টদের পেছনে ঘুরে ঘুরে বিনা চিকিৎসায় অনেকের জীবন প্রদীপ নিভে যাচ্ছে। টাকা তুলতে না পেরে মেয়ের বিয়ে দিতে পারছেন না। জীবনের শেষ ইচ্ছে হজ করতে যেতে পারছেন না। অনেক শিক্ষক-কর্মচারী মারা যাওয়ার পর স্বজনরা চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।

স্থায়ী সমাধানের যত উদ্যোগ

শিক্ষকদের এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে এর আগেও অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়। যা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। এর মধ্যে গত কয়েক বছরে এই সংকট কিছুটা কমিয়ে এনেছে বর্তমান সরকার। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫০০ কোটি টাকা সিড দেয় সরকার। সেই টাকাসহ আরও বিশেষ বরাদ্দ মিলে ১ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা পাওয়ার পর অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অপেক্ষার সময় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এখন আবেদন করার পর দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়।

অবসর সুবিধা বোর্ডের সচিব শরীফ আহমদ সাদী জানিয়েছেন, প্রতিবছর বাজেটে বোর্ডের জন্য ২৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলে কোনো ঘাটতি থাকবে না। ঘাটতি পূরণে প্রতিবছর বাজেটে এ অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া হবে। বিকল্প আরও প্রস্তাব তৈরি করেছি। দ্রুত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এসব প্রস্তাব জমা দেওয়া হবে।

প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ শরীফ আহমদ সাদী বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতিবছর ২০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে প্রতি বছর ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা আয় হবে। এছাড়া শিক্ষক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হবে। অবসর বোর্ডের সিড মানির ৬৪৫ কোটি টাকা দিয়েই ব্যাংক পরিচালনা করা যাবে। শিক্ষকরা এ ব্যাংকে লেনদেন করলে ব্যাংকের আয় দিয়ে অর্থের ঘাটতি মেটানো সম্ভব হবে।

জানা গেছে, স্থায়ী আয়ের জন্য রাজধানীতে ১০ কাঠা জমির ওপর একটি ১০তলা ভবন নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ভবনের নিচতলায় অবসর বোর্ডের অফিস করা হবে। যাতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকরা এখানে এসে স্বাভাবিক কাজ করতে পারেন। ওই ভবনে শিক্ষকদের আবাসিক ব্যবস্থাও থাকবে। যাতে কেউ ঢাকায় এলে সেখানে থাকতে পারেন। ভবনের অবশিষ্ট ফ্লোর বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দিয়ে অর্থ সংকট মেটানো সম্ভব হবে। 

এদিকে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করতে কোনো আইন পরিবর্তন করতে হবে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট আইনের ৯ এর ধারায় বলা হয়েছে, বোর্ডের একটি তহবিল থাকবে। এই তহবিলে তিনভাবে অর্থ জমা করা যাবে। এগুলো হলো- সরকার কর্তৃক তহবিল, শিক্ষক-কর্মচারী কর্তৃক বাধ্যতামূলক চাঁদা ও অন্য কোনো উৎস। তৃতীয় উপধারা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ে কোনো আইনি জটিলতা দেখছেন না সচিব। 

সূত্র জানায়, বর্তমানে অবসর বোর্ডে জনবল সংকট থাকায় শিক্ষকদের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করতে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। এজন্য ৭১টি পদ সৃজনের প্রস্তাব করা হয়েছে। অবসর বোর্ডের শুরুতে সিড মানি হিসেবে সরকারের অনুদানের ৮৯ কোটি টাকার লভ্যাংশ থেকে এ ব্যয় মেটানো হবে। বর্তমানে অবসর বোর্ডের স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনসহ অফিস খরচ বাবদ বছরে এক কোটি ব্যয় হয়। আবার সিড মানির লভ্যাংশের চার কোটি টাকা মূলধনের সঙ্গে যোগ হয়। 

বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব মো. অধ্যক্ষ শাহজাহান আলম সাজু বলেন, আমরা বেশিরভাগ আবেদন নিষ্পত্তি করতে কাজ করছি। গত আট মাস ধরে সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করে কাজ করছে সবাই। এরইমধ্যে আট হাজার আবেদনের চেক বিতরণ করা হয়েছে।

এনএম/জেডএস