ব্যারিস্টার মুনিজা কবির

‘স্কুলের সবাই তো অবাক যে বাংলাদেশে একমাত্র ওয়ার্ল্ড হাইয়েস্ট পেলাম। যেটা আমার ৫/৬ বছর আগেও কেউ পায়নি। আমি তো রেজাল্ট শুনে খুশিতে মাস্টার মাইন্ড স্কুল থেকে হেঁটে ধানমন্ডি ২৬ নম্বর বাসায় কখন গিয়েছি টেরই পাইনি’ –কথাগুলো বলছিলেন ‘এ’ লেভেল পরীক্ষায় আইন বিষয়ে ‘বিশ্বের সর্বোচ্চ মার্ক’ পাওয়া মুনিজা কবির। 

রাজধানীর মাস্টার মাইন্ড স্কুল থেকে আইন বিষয়ে এ কৃতিত্ব অর্জনের পর মুনিজার জীবনের বাঁক বদলে যায়। ব্যারিস্টার হওয়ার সুপ্ত বাসনা নিয়ে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে আইনে গ্রাজুয়েশন শেষ করেন। এরপর বার এট ল’ করতে যান লন্ডনে। পরে ব্যারিস্টারি পাস করে ফিরে আসেন দেশে। এখন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে শিক্ষকতা করেন। পাশাপাশি উচ্চ আদালতে আইন পেশাতেও অবদান রাখতে চান। ছোট বেলা থেকে খেলাধুলা, গান ও পড়ালেখায় সমানতালে পারদর্শী মুনিজা তার পড়াশোনা এবং ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন ঢাকা পোস্টের সঙ্গে। শিক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শও দিয়েছেন তিনি। তার সঙ্গে কথা বলেছেন, ঢাকা পোস্টের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেদী হাসান ডালিম

মাস্টার মাইন্ড স্কুল এবং সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার গল্প
ধানমন্ডির সানিডেল থেকে ‘ও’ লেভেল করে মাস্টার মাইন্ডে ভর্তি হলাম। ‘এ’ লেভেলে আমাদের একজন শিক্ষক ছিল ব্যারিস্টার দিনার হক। আমি স্কুলে যতটুকু পড়ার দরকার ছিল ততটুকুই পড়তাম। একটু ফাঁকি মারতাম এদিক-ওদিক। শেষে গিয়ে পড়তাম দিনার স্যারের কাছে। তার একটা ভালো কোচিং সেন্টার ছিল। তিনি খুব সুন্দর করে কীভাবে উত্তর লিখতে হয় তা শেখাতেন। যাই হোক, ‘এ’ লেভেলে আইন বিষয়ে পরীক্ষা দিলাম। এতো পড়েছি যে পরীক্ষা শেষে মনে হলো যে হলে আমি সব লিখে আসতে পারিনি। পরীক্ষার হল থেকে বের হয়ে অনেক কান্না করি। পরে রেজাল্ট যখন এলো, দেখি যে আমাদের ভাইস প্রিন্সিপাল আমার বাবা-মাকে স্কুলে ডেকে অভিনন্দন জানালেন। বললেন, আপনার মেয়ে তো ওয়ার্ল্ড হাইয়েস্ট, ডিসটিংশন পেয়ে গেছে। এটা তো আমরা চিন্তাই করতে পারি না যে আমাদের শিক্ষার্থী এরকম মার্ক পাবে। মাস্টার মাইন্ডে অনেক শিক্ষার্থী আইন নিতো কিন্তু কেউ এতো ভালো মার্ক পেতো না। ওরা খুবই সারপ্রাইজড।

ব্যারিস্টার মুনিজা কবির ও প্রতিবেদক মেহেদী হাসান ডালিম

এর মধ্যে একটা ইন্টারেস্টিং গল্প বলি, এ লেভেলে ফিজিক্স, ক্যামেস্ট্রি, বায়োলজি, ম্যাথমেটিকসের সঙ্গে আমার আইনের দুইটা পার্ট ছিল। অন্য চার সাবজেক্টের সঙ্গে আইনও এক বছরেই পরীক্ষা দিতে চাচ্ছিলাম। এটা শুনে আমার প্রিন্সিপাল আর ভাইস প্রিন্সিপাল ঘাবড়ে গেল। তখন আমার স্কুল টিচার, প্রিন্সিপাল আমাকে আর আমার মাকে স্কুলে ডাকলেন। বললেন, ওর তো চারটা সাবজেক্ট। চারটা সাবজেক্টের সঙ্গে সে এক বছরেই আইনটা দিয়ে দিতে চাচ্ছে। এ লেভেলের পেপারসটা দুই বছরে দিতে হয়। মাকে আমার প্রিন্সিপাল বললেন, আপনার মেয়ে তো একই বছরে আইন দিয়ে দিতে চাচ্ছে। পাঁচটা সাবজেক্ট এক সঙ্গে দিতে চাচ্ছে। এখন ওর রেজাল্ট অনেক খারাপ হবে। বদনামটা আমাদের স্কুলের হবে। তাই ওর একটা সাবজেক্ট ড্রপ করতে হবে। তখন আমার ফিজিক্স ড্রপ করিয়ে দিল এবং বাকিগুলো পরীক্ষা দিলাম। এতো কাহিনী করার পর যখন স্কুলে একটা লেটার এলো ডিরেক্টর বোর্ড থেকে মি. রসাল চিঠি দিয়ে জানালেন মিস. মুনিজা কবির ‘ওয়ার্ল্ড হাইয়েস্ট’। একমাত্র ‘ওয়ার্ল্ড হাইয়েস্ট’। ওই বছরে এ লেভেলে আমি বিশ্বে সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্ত স্টুডেন্ট। আমিই এটা পেয়েছিলাম।

ওই সময়কার অনুভূতি কেমন ছিল?
আমার মনে আছে, ওয়ার্ল্ড হাইয়েস্ট মার্ক পাওয়ার কথা শুনে খুশিতে এতোটাই আত্মভোলা হয়ে গিছিলাম যে আম্মুকে এই খবর দেওয়ার জন্য মাস্টার মাইন্ড থেকে হেঁটে হেঁটে ধানমন্ডি ২৬ নম্বর আমাদের বাসায় চলে গেছি। রিকশায় উঠার প্রয়োজনও মনে করিনি। আম্মুকে গিয়ে বললাম, আম্মু দেখ আমি স্টার পেয়েছি। আম্মু তখন বললেন, এতো ভালো রেজাল্ট করলা। কিন্তু পরীক্ষা দেওয়ার পর তুমি যে এতো কান্না কাটি করলে। ওয়ার্ল্ড হাইয়েস্ট পাওয়ার পর আমি খুবই মোটিভেটেড হয়েছিলাম যে আমি কিছু একটা করতে পারবো।

ব্যারিস্টার মুনিজা কবির ও সাকিফ আলম

স্মরণীয় ঘটনা ও শখ
স্মরণীয় ঘটনা একটাই হতে পারে। ওয়ার্ল্ড হাইয়েস্ট মার্ক পাওয়া। আমার মাস্টার্স থিসিসে যখন ডিস্টিংশন (সম্মান) পেলাম ওটাও একটা মেমোরেবল টাইম। আর আমার শখ হচ্ছে আমি সবই করতে একটু একটু করে পছন্দ করি। আমি টিচিং করতে পছন্দ করি। সবচেয়ে পছন্দ করি খেলাধুলা করতে। আমি একদম স্কুল লাইফ থেকে হ্যান্ডবল, বাস্কেট বল টিমে আছি। ন্যাশনাল টিমের জন্যও প্র্যাকটিস করার কথা ছিল। কিন্তু তখন আমি যাইনি। কারণ তখন আমি অসুস্থ ছিলাম এবং ইল্যান্ডেও চলে যাচ্ছিলাম। তাই ওই চান্স পাইনি। এখন কোনো সুযোগ পেলে অবশ্যই আমি জয়েন করবো। তারপর আরেকটা হচ্ছে আমি গান গাইতে খুব পছন্দ করি। গান কেন পছন্দ করি, কারণ আমার মা খুবই গান পছন্দ করেন। আমার আম্মু কিন্তু বিটিভিতে গান গাইতেন। গানটা শিখলাম আমি স্কুল এবং ছোটবেলায় আমার মা থেকে। আর আর্টও করতেও ভালো লাগে। আমি যখন স্কুলে ছিলাম। সানিডেল এমন একটা স্কুল ছিল যে পড়াশুনা ঠিক রাখো। কিন্তু ওটার সঙ্গে এক্সট্রা কারিকুলাম একটিভিটিজও করতে হবে। আমার আর্ট ক্লাস, মিউজিক ক্লাস হতো। কুকিং ক্লাস, মুটিং ক্লাস হতো। সো আমাদের অনেক বিষয়ে ক্লাস হতো। আমি আর্ট করতাম। আমার আর্ট টিচার আমাকে খুব পছন্দ করতো। উনি মনে করেছিল আমি ও লেভেলে আর্ট নেব। নেইনি দেখে উনি আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল। সো আমার আর্ট খুবই ভাল লাগে। আমি আর্ট করতে খুবই পছন্দ করি। টিচিংও করি। আর আমার নতুন একটা বেকিং বিজনেস শুরু করেছি। বেকস্টার। বেকস্টার হ্ছে ব্যারিস্টার হোবিস। একটা সাইড বিজনেস। বিয়ে বার্ষিকী-জন্মদিনসহ বিভিন্ন উপলক্ষে আমি কেক সেল করে থাকি।

সফল হতে যে গুনগুলো থাকা উচিত
আমি বিলিভ করি সাকসেসের জন্য ওরকম কোনো রুলস নেই। কিন্তু কিছু কিছু জিনিস  অনুসরণ করতে হবে যেটার জন্য সফল হওয়া আরও সহজ হয়। অনেকে অনেক ট্যালেন্টেড থাকে, ব্রিলিয়ান্ট থাকে যেমন বিল গেটস। ওরা অনেক নিচ থেকেই উঠেছে। অনেক  কঠোর পরিশ্রম করে,অনেক সংগ্রাম করে। সবচেয়ে যেটার বেশি প্রয়োজন সেটা হচ্ছে কঠোর পরিশ্রম। হার্ডওয়ার্ক করলে জীবনে অনেক আগানো যায়। দ্বিতীয়ত হচ্ছে, যেটা আমি বলবো, ‘ডু হোয়াট ইউ লাভ অ্যান্ড লাভ হোয়াট টু ডু’। আমি বিশ্বাস করি যদি তুমি এমন একটা সাবজেক্ট নিয়ে পড় যেটা অনেক কঠিন। তুমি ইনজয় করছো না। তুমি আইন পড়েছ বা ডাক্তারি, কিন্তু ইনজয় করছ না। কিন্তু তোমার অনেক ভালো আর্টের হাত আছে ,তুমি অনেক ভালো গান গাও।   যেটাতে তুমি সবচেয়ে ভালো করতে পারবে সেটাই করো। এটা করলে তুমি সফল হতে পারবে।

আইন পড়ুয়াদের কোন কোন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ আছে?
আইন পড়ে অনেক কিছুই করা যায়। আইন পড়ে যে কোর্টে গিয়ে প্র্যাকটিসই করতে হবে এমন নয়। অনেকে তো কোর্টে গিয়ে ইনজয় করে না। যারা চেম্বারে বা কোর্ট প্র্যাকটিসে ইনজয় করবে না তারা ব্যাংকে জব করতে পারো লিগ্যাল এডভাইজার হিসেবে। আবার যেকোন বিজনেস ইন্ডাস্ট্রি বা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিতে ল’ইয়ার হিসেবে জয়েন করতে পারো। সো কনসালটেনসির একটা সাইড আছে। আর ল’ পড়ে তোমরা শিক্ষকতাও করতে পারবে। যেটা আপাতত আমি করছি। এছাড়া তোমরা যেকোন সরকারি চাকরিও করতে পারবে। আইন পড়ে পলিসি ডিপার্টমেন্টেও কোন জব নিতে পারো।  আইন পড়ে যে শুধু কোর্টেই যেতে হবে এমন নয়। আরও অনেক অনেক সেক্টর আছে যেখানে তোমরা জব করতে পারবে। পলিসি নিয়ে, প্লানিং নিয়ে সরকারের সঙ্গে তোমরা কাজ করতে পারো।

যারা আইন পড়তে চায় তাদের উদ্দেশ্যে বলবো, যদি আইন পছন্দ করে থাকো তবে অবশ্যই আইনটা পড়ে যাও। তুমি স্ট্রাগলটাতে থাকো। তুমি যদি একটু ধৈর্য নিয়ে পড়তে পারো এক সময় সুন্দর ক্যারিয়ার গঠনের পাশাপাশি সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারবে। কোর্টে গিয়ে কেস ফাইল করে রিট পিটিশন দায়ের করে সব কিছু করে সমাজের একটা ভালো চেঞ্জ আনতে পারবে। আইন ছাড়া সমাজ রান করতে পারে না। তাই যে যাই বলুক তোমরা আইন পড়তে থাকো। আইন প্র্যাকটিসে লেগে থাকো।

সমাজের মানুষের জন্য যা করতে চান
যখন নিজের অনেক টাকা হয়ে যাবে তখন একটা এনজিও খোলার ইচ্ছে আছে। যদি কিছু এখন আমি সেইভ করতে পারি ওটা দিয়ে ভবিষ্যতে ইনস্টিটিউশন খুলবো। গরিবদের জন্য এনজিও খুলবো। অসহায় মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছে সব সময় আছে।

এমএইচডি/এসএম