ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশ স্বাধীনতার মাত্র পাঁচ দশকে যতটা এগিয়েছে তা সারা পৃথিবীতেই রীতিমতো বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রই এখন বাংলাদেশকে ‘ইমার্জিং টাইগার অব এশিয়া’ আখ্যা দিয়েছে। যা আমাদের জন্য বড় অর্জন বটে। কিন্তু এই অর্জন আরও বহুমাত্রিক হতে পারত।

বিশেষ করে যে দেশে বিপুল জনসংখ্যা কর্মক্ষম সেই দেশে এখনো বেকারত্বের যন্ত্রণা তীব্র। এই যন্ত্রণা তরুণ সমাজের বড় অংশকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে, তাতে অনেক অর্জনই ফিকে হয়ে যাচ্ছে।

এর জন্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার নানা দুর্বলতাই দায়ী। কারণ আমাদের উদ্যমী তরুণ সমাজ সঠিক শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পেলে কতটা সাফল্য পেতে পারে নানা সময় তার উদাহরণ আমরা দেখেছি। কিন্তু সার্বিকভাবে পূর্ণাঙ্গ-দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে এখনো আমরা পেরে উঠিনি। কেন পারিনি, আর পারার জন্য কী করতে পারি আমরা—আজকের লেখায় আমার আলোচনার বিষয়বস্তুই সেটি।

আরও পড়ুন >>> নতুন শিক্ষাক্রমের সমস্যা কোথায়? 

যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে শিক্ষা কমিশন গঠনের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির উদ্যোগ, গমনপোযোগী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, বিনামূল্যে বই বিতরণ, শতভাগ ভর্তি, পাসের হার বৃদ্ধি, শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার হ্রাস, ৬০ শতাংশ সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, ছাত্রছাত্রীর সমতা, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষা—সব মিলিয়ে পাঁচ দশকে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রগতি দৃশ্যমান।

তবে এত অগ্রগতি সত্ত্বেও, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, ২০২১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দেশে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি, মোট জনসংখ্যার ৬.৯১ শতাংশে গিয়ে পৌঁছে।

২০২৪ সালের পূর্বাভাসে এই হার বার্ষিক ১.১৯ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যার বড় কারণ শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে স্নাতকদের অর্জিত দক্ষতা এবং নিয়োগকর্তাদের প্রয়োজনীয় দক্ষতার মধ্যে অমিল, যা লক্ষ লক্ষ তরুণ গ্র্যাজুয়েটদের বেকার বানিয়ে দিচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শিক্ষাখাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকলে একটি কর্মক্ষম শিক্ষিত জনগোষ্ঠী প্রস্তুত করা সম্ভব নয়। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষাখাতে বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে এসব মতামত বরাবরই উপেক্ষিত।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর জরিপের তথ্য সামনে আনা যায়। জরিপের তথ্য বলছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেও ৬৬ শতাংশ শিক্ষার্থী চাকরি পাচ্ছেন না। মাত্র ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর শেষ করে চাকরি পাচ্ছেন।

একটা নির্দিষ্ট অংশ চাকরি পাওয়ার জন্য অন্য কোনো বিষয়ে স্নাতকোত্তর বা কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করছেন কিংবা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। ৩ শতাংশ নিজ উদ্যোগে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছেন। দেশে প্রতি বছর শ্রমশক্তিতে যুক্ত হচ্ছেন ২০ লাখ মানুষ। সেই অনুযায়ী কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় বড় অংশ বেকার থেকে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন >>> জিপিএ-৫ তৈরির কারখানা! 

কেন দক্ষ জনবল তৈরি সম্ভব হচ্ছে না, এর কারণ যদি খোঁজা হয় তাহলে সামনে আসবেবাংলাদেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক স্তরে প্রদত্ত শিক্ষার গুণমান শক্তিশালী মানবসম্পদ তৈরি করতে পারার মতো নয়।

বিশেষত, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত মানদণ্ড অনুযায়ী না হওয়া, নাজুক অবকাঠামো, দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ ছাড়া পাঠদান, শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি শিক্ষকদের জন্য পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ সুবিধা নিশ্চিত করতে পারিনি আমরা।

নিম্নমানের প্রারম্ভিক শৈশব উন্নয়ন কর্মসূচি আমাদের শিশুদের বিকাশ ব্যাহত করছে যা মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদানের জন্য অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। এসব সমস্যার কারণে গুণগতমান অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে শিক্ষা।

একটি দেশের সামগ্রিক সাক্ষরতা, গ্র্যাজুয়েশন ও স্কুলে ভর্তির হারসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয় জাতিসংঘের হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সের (এইচডিআই) বিশ্ব শিক্ষা ইনডেক্স।

এই ইনডেক্সের তথ্যমতে, যেসব দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আদর্শ হিসেবে ধরা হয়, তাদের মধ্যে জার্মানি প্রথম, ফিনল্যান্ড দ্বিতীয়, এভাবে আইসল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে যথাক্রমে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম অবস্থানে আছে। সেই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১২১ নম্বরে। কী কারণে প্রথম শ্রেণির দেশগুলোর শিক্ষার অবস্থা উন্নত এটি পর্যালোচনায় বরাবরই তাদের শিক্ষাখাতে ব্যয়ের বিষয়টি সামনে আসে।

জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো) দেশের শিক্ষাখাতে জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ বা বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দের পরামর্শ দেয়। যেসব দেশ তাদের শিক্ষাখাতে উপরের দিকে আছে সেই দেশগুলো শিক্ষাখাতে গড়ে জিডিপির ৪ থেকে ৫ শতাংশ ব্যয় করে এবং তার সুফলও ভোগ করছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শিক্ষাখাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকলে একটি কর্মক্ষম শিক্ষিত জনগোষ্ঠী প্রস্তুত করা সম্ভব নয়। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষাখাতে বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে এসব মতামত বরাবরই উপেক্ষিত।

আরও পড়ুন >>> সৃজনশীল ও শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থা কেন জরুরি?

বাংলাদেশের বিগত কয়েক বছরের বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যাবে, সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশে এই অনুপাত ছিল যথাক্রমে ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এর আগে বছরগুলোয়ও জিডিপির ২ শতাংশের বেশি বরাদ্দ শিক্ষায় রাখা হয়নি। বাজেটের ২০ শতাংশ নির্দেশনা থাকলেও গতবছর মাত্র ১২.১ শতাংশ বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

অর্থবছর

মোট বরাদ্দ (কোটি টাকায়)

মোট বাজেটের শতাংশ

শিক্ষাখাতে জিডিপির ন্যূনতম শতাংশ

২০২২-২০২৩

৮১৪৪৯

১২.১

১.৮৩

২০২১-২০২২

৭১,৯৫১

১১.৯১

২.০৮

২০২০-২০২১

৬৬,৪০০

১১.৬৯

২.০৯

২০১৯-২০২০

৭৯,৪৮৬

১৫.২০

২.৭৫

২০১৮-২০১৯

৬৬,২৭৩

১৪.৯৭

২.৬১

কম বরাদ্দের এই বাজেটের কারণে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়ন এখনো সম্ভব হয়নি। যদিও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত বিষয়ে পাঠদানের গুরুত্ব সম্পর্কে বিশেষভাবে আলোচনা হচ্ছে।

তবে দেশের এমন অনেক মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে যেখানে বিজ্ঞান-সামগ্রীর সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ নেই শিক্ষার্থীদের। যারা পাঠদান করাচ্ছেন তাদের অনেকেই আছেন যাদের ওই বিষয় সম্পর্কে ডিগ্রি নেই। এর ফলে শিক্ষায় আনন্দ পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা। যে কারণে তুলনামূলক সহজ ভাবছে বলেই বিজ্ঞান ছেড়ে অন্য বিষয়ে পড়ালেখার জন্য ঝুঁকছে তারা।

কম বরাদ্দের এই বাজেটের কারণে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়ন এখনো সম্ভব হয়নি।

উচ্চশিক্ষার সমস্যাও নেহায়েত কম নয়। যারা প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে উচ্চশিক্ষায় পদার্পণ করছে তারা শিখে আসতে পারেনি বলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে নতুন করে শিখতে চেষ্টা করছে। সেখানেও রয়েছে সংকট। পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক সামগ্রীসহ গবেষণাগারের অভাব। সংকট আছে উপকরণ ও প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যে বাজেট দেওয়া হচ্ছে তার ৯৫ থেকে ৯৮ শতাংশই ব্যয় হচ্ছে বেতন-ভাতা, ব্যবস্থাপনায়। ইউজিসির তথ্য বলছে, ২ শতাংশ গবেষণার জন্য বরাদ্দ রাখলেও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় সেই অর্থও ব্যয় করতে পারছে না।

আরও পড়ুন >>> শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন : বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ 

এভাবে চললে বৈশ্বিক শিক্ষা ও কর্মসংস্থান যেভাবে দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে সেই জন্য দক্ষ জনসম্পদ তৈরিই এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। দেশের শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, চাকরিদাতারা দক্ষ জনবল পাচ্ছেন না।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর বক্তব্য, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এমন কারখানায় পরিণত হয়েছে, যেখানে কর্মহীন মানুষ তৈরি হচ্ছে।’ কিন্তু কোন কারণে এই কর্মহীন মানুষ তৈরি হচ্ছে তার কারণ খুঁজতে কেউ সচেষ্ট হচ্ছেন না।

ড. প্রদীপ কুমার পাণ্ডে ।। অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়