ঈদুল ফিতর নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভাবনা

ঈদুল ফিতর মানবতার আনন্দ, সংযম ও আত্মশুদ্ধির এক অনন্য উৎসব। রমাদানের সাধনার পর এটি ভ্রাতৃত্ব, দানশীলতা ও কৃতজ্ঞতার বার্তা নিয়ে আসে, যেখানে ধনী-গরিবের ভেদাভেদ ভুলে সবাই এক কাতারে দাঁড়ায়। তবে ভোগবাদ ও সামাজিক বৈষম্যে কখনও এর সৌন্দর্য ম্লান হয়। তাই সংযম, সহমর্মিতা ও ন্যায়ের চর্চার মাধ্যমে সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ গঠনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষার্থীর ভাবনা তুলে ধরছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক আতিকুর রহমান।
বিজ্ঞাপন
ঈদুল ফিতর সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের সেতুবন্ধন
মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হলো ঈদুল ফিতর। দীর্ঘ এক মাস রমজান মাসের সিয়াম সাধনার পর আসে এই আনন্দঘন দিনটি। এই এক মাসের রোজা আমাদের সংযম, সহমর্মিতা ও মানবতার শিক্ষা দেয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা চাইলে ধনী-গরিব, মুসলিম-অমুসলিম সবাই মিলেই একটি সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে পারি। ধনীরা চাইলে সমাজের নিম্নবিত্ত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করতে পারে, আর সবাই একসাথে হাত ধরে চললে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে সম্প্রীতি ও শান্তি।
আমার কাছে ঈদের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো—দূর-দুরান্ত থেকে মানুষের বাড়ি ফেরা। হাজারো কর্মব্যস্ততার মাঝেও মানুষ শিকড়ের টানে ফিরে আসে আপন ঘরে, প্রিয়জনদের কাছে। পরিবারের সঙ্গে কাটানো এই মধুর মুহূর্তগুলোর জন্যই যেন সারা বছর অপেক্ষা করে থাকে সবাই। বাচ্চা থেকে বৃদ্ধ, ধনী থেকে গরিব—সবাইকে এক আনন্দের বন্ধনে আবদ্ধ করে ঈদ। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের মাঝেই ঈদ মানে ঐক্য, নতুন করে সেজে ওঠা, আর একে অপরের সঙ্গে ভালোবাসা ও আনন্দ ভাগাভাগি করা।
বিজ্ঞাপন
-ফাইরিজা আইরিন ফিজা
শিক্ষার্থী, ম্যানেজমেন্ট বিভাগ
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ঈদ: স্মৃতি আর বাস্তবতার মিশেল
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ঈদের আমেজ যেন একটু অন্যভাবেই শুরু হয়। রমজানের শুরুতেই বছরের ঈদের বাজারের প্রচ্ছদের হালচাল থেকে শুরু হয়ে আলোচনা থামে বিকাশে সালামি আদান-প্রদানের আর ঈদ কার্ডের ভার্চুয়াল সম্প্রীতির বন্ধনে। পরিবার থেকে দূরে থাকতে থাকতে ঈদের দিনটাতেও নিজেকে কখনও কখনও মেহমান মনে হয়। ছোটবেলার মতো নতুন জামা নিয়ে উচ্ছ্বাস, শোরগোল করে মেহেদি দেওয়ার সেই প্রাণচঞ্চল আনন্দটাও কেমন যেন আর আগের মতো কাজ করে না।
বিজ্ঞাপন
তবু ঈদের সকাল এলেই মায়ের হাতে রান্না করা সেমাইয়ে অনুভব হয় ঈদ আসলেই এসেছে! এরপর পরিবারের সবার আদুরে হয়ে সারাদিন দাপড়ে বেড়ানো ছোট্ট শিশুটির ঈদের আনন্দে সামিল হয়ে উঠি অজান্তেই। তখন মনে হয় সময় বদলেছে, জায়গা বদলেছে, কিন্তু ঈদের অনুভূতিটা কোথাও গভীরে ঠিকই রয়ে গেছে। হয়তো তাই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ঈদটা একটু সাদামাটা আর স্মৃতির ভেতর ছোটবেলার ঈদকে খুঁজে পাওয়ার মধ্যেই।
-তাহসিনা রহমান
শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, চবি
ঈদুল ফিতরের আনন্দ আসুক সকল প্রাণে
ঈদুল ফিতর শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি মানবতার গভীর শিক্ষা ও সাম্যের এক উজ্জ্বল আহ্বান। এক মাসের সংযম, আত্মশুদ্ধি ও ধৈর্যের সাধনার পর ঈদ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সত্যিকারের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হয়। তাই ঈদের আনন্দ কেবল ধনীদের অট্টালিকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা ছড়িয়ে পড়বে গরিবের ছোট্ট ঘরেও, যেখানে একটি হাসিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় সম্পদ। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কৃষক ও শ্রমিক—সমাজের প্রতিটি মানুষই এই উৎসবের সমান অংশীদার।
ঈদ আমাদের শেখায় সহমর্মিতা, দানশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মূল্য। পরিবার, পরিজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের বন্ধন এই দিনে নতুন করে দৃঢ় হয়। কেউ যেন অভাব, একাকীত্ব বা বঞ্চনার কষ্ট নিয়ে ঈদের দিন পার না করে—এই দায়িত্বও আমাদের সবার। তাই ভালোবাসা, সহযোগিতা ও মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমরা যদি একে অপরের পাশে দাঁড়াই, তবেই ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে উঠবে। তখন ঈদ হবে কেবল একটি দিন নয়, বরং মানবতার আলোয় ভরা এক অনন্য মিলনের উৎসব।
-মুহাম্মাদ রিয়াদ উদ্দিন
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, চবি
ঈদুল ফিতরে ভোগান্তি নয়, স্বস্তি চাই
মুসলমানদের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। এক মাস সিয়াম সাধনার পর এই উৎসব আনন্দ ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা নিয়ে আসে। তবে প্রতি বছর ঈদকে কেন্দ্র করে বাজার ব্যবস্থাপনা ও যাতায়াতে কিছু অসঙ্গতি দেখা যায়, যা সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ঈদের আগে বাজারে ক্রেতাদের ভিড় বেড়ে যায়। এ সময় অনেক ক্ষেত্রে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম সংকট, অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি এবং ফুটপাত দখল করে দোকান বসানোর মতো ঘটনা দেখা যায়, যা বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে, ঈদের সময় শহর থেকে গ্রামে মানুষের ব্যাপক যাত্রার ফলে সড়ক, রেল ও নৌপথে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, সময়সূচি লঙ্ঘন ও যানজট মানুষের যাত্রাকে দুর্ভোগে পরিণত করে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাজার তদারকি জোরদার, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, পর্যাপ্ত যানবাহনের ব্যবস্থা এবং যাত্রীদের সচেতন ও পরিকল্পিত যাতায়াত নিশ্চিত করা জরুরি।
-ওবায়দুল্লাহ মল্লিক
শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, চবি
শ্রেণিবৈষম্যহীন সমাজ গঠনে প্রয়োজন ঈদের শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন
মুমিনের জন্য সর্বোত্তম মাস হলো পবিত্র রমজানের মাস। রমজানের সিয়াম পালন শেষে আসে মুমিনের বহুল প্রতীক্ষিত এবং সবচেয়ে খুশির ঈদ। এই ঈদ এসে আমাদেরকে জানিয়ে দেয় যে, কষ্ট, ধৈর্য, সহিষ্ণুতা এবং আত্মসংযমের পরেই মানুষের সফলতা এবং সুখ আসে। আর ঈদগাহে অনুষ্ঠিত হওয়া ঈদের জামাতের কাতারের সারিগুলো আমাদেরকে জানিয়ে দেয় যে, এই পৃথিবীতে মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই।
ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু জাতপাত বলে নেই কোনো বিভেদ কিংবা ব্যবধান। সবাই মানুষ। সবাই সমান ও সবাই এক আল্লাহর বান্দা। রমজান এবং ঈদ আমাদেরকে দানশীলতা, পরোপকারিতা, ধৈর্য, সহিষ্ণুতা এবং উদারতার যে শিক্ষা দেয়, তা যদি আমরা আমাদের বাস্তব জীবনে গঠন করতে পারি, তাহলে আমাদের জীবন সুন্দর হবে। সুন্দর এবং সুবাসিত হবে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র।
-ইমরান নাজির
শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, চবি
আতিকুর রহমান/এসএইচএ