যেখানে অন্যরা থামে, ঢাকা পোস্টের শুরু সেখানেই

২০২৫ সালের ১৩ জানুয়ারি আমার সাংবাদিকতা জীবনের এক স্মরণীয় দিন। সেদিনই আনঅফিসিয়ালি যুক্ত হই ঢাকা পোস্টের সঙ্গে। শুরুটা ছিল একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দিয়ে। ভূমিহীনদের জন্য বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দেওয়া ‘উপহারের ঘর’প্রকল্পের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
কাগজে-কলমে আশ্রয়ের স্বপ্ন থাকলেও বাস্তবে দেখেছিলাম ভাঙা দেওয়াল, ফাঁকা ঘর আর হতাশ মানুষের দীর্ঘশ্বাস। ১৫০টি ঘরের মধ্যে প্রায় ১২০টি ফাঁকা এই তথ্য কেবল একটি পরিসংখ্যান ছিল না, এটি ছিল রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও বাস্তবতার নির্মম ব্যবধানের প্রতিচ্ছবি। নদী-ঘেষা দুর্গম অবস্থান, যাতায়াতের অনুপযোগী পথ, কর্মসংস্থানের অভাব—সব মিলিয়ে অনেক ভূমিহীন পরিবার বাধ্য হয়েছেন ঘর বিক্রি করতে। অভিযোগ ছিল, কিছু অসাধু চক্র ফাঁকা ঘরগুলোকে ব্যবহার করছিল অসামাজিক কর্মকাণ্ডে।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর জেলায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। প্রশাসন নড়ে বসে, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা যোগাযোগ করেন, শুরু হয় তদন্ত। পরবর্তীতে বন্ধ হয় সেই অনৈতিক কার্যক্রম। সেইসঙ্গে প্রকৃত উপকারভোগীদের আশ্রয় নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেদিন প্রথমবার উপলব্ধি করি, সংবাদ কেবল শব্দের বিন্যাস নয়, এটি পরিবর্তনের শক্তি। আর সেই শক্তির নাম ঢাকা পোস্ট। ঠাকুরগাঁওয়ে মানুষ বলতে শুরু করল, ‘ঢাকা পোস্ট মানেই সাহসী প্রতিবেদন।’
১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয় আমার অফিসিয়াল পথচলা। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কাজের অভিজ্ঞতা থাকলেও এখানে পেয়েছি অনুসন্ধানের স্বাধীনতা, সত্য প্রকাশের সাহস এবং শেখার নিরন্তর পরিবেশ। আমার কাছে ঢাকা পোস্ট শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি এক চলমান শিক্ষালয়, যেখানে প্রতিটি প্রতিবেদন আমাকে আরও দায়িত্বশীল, আরও সচেতন করেছে। এই সময়টাতে একের পর এক অনুসন্ধানী ও মানবিক প্রতিবেদন করেছি।
বাংলাদেশের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) এ শিক্ষার্থীদের নাম ব্যবহার করে অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র প্রথম প্রকাশ করে ঢাকা পোস্ট। সেই প্রতিবেদন প্রকাশের পর নানাভাবে হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। তবুও সত্যের জায়গা থেকে সরে দাঁড়াইনি। কর্তৃপক্ষের টনক নড়েছিল—এটাই ছিল সান্ত্বনা।
ঠাকুরগাঁও জেলা রেজিস্ট্রি অফিসে জমি কেনাবেচা ও দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকারি মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ অর্থ আদায়ের অভিযোগ ছিল দীর্ঘদিনের। কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায়নি। সাত দিনের গোপন অনুসন্ধানের পর প্রকাশ করি প্রতিবেদন, যেখানে দলিল লেখক সমিতির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির চিত্র উঠে আসে। প্রতিবেদন প্রকাশের পর আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দেওয়া হয়, রাজনৈতিক মহলেও চাপ সৃষ্টির চেষ্টা চলে। কিন্তু সত্যের জায়গায় অটল ছিলাম। পরবর্তীতে জেলা রেজিস্ট্রি অফিস দলিল লেখক সমিতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়।
একইভাবে বিনা নোটিশে গ্রাহকের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও হয়রানির অভিযোগে ঠাকুরগাঁও নেসকোর বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে ভুক্তভোগীরা জেলা লিগ্যাল এইডের দ্বারস্থ হন। বিচারকের তলবে বিদ্যুৎ বিভাগ লিখিত অঙ্গীকার দেয় বিনা নোটিশে আর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে না। সংবাদ যে নাগরিক অধিকারের রক্ষাকবচ হতে পারে, এটি ছিল তার বাস্তব উদাহরণ।
ভূমি অফিস নিয়েও ছিল দীর্ঘদিনের অভিযোগ। তহশিলদারদের বিরুদ্ধে ঘুষ ছাড়া কাজ না করার অভিযোগ প্রতিনিয়ত আসছিল। আবুল কালাম আজাদ নামে এক তহশিলদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে ঘুষের পুরো টাকা না পেয়ে নামজারি বাতিল করেন। এই শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের পরদিনই জেলা প্রশাসক তাকে শোকজ করেন। সংবাদ আবারও তার দায়িত্ব পালন করে।
ভূমিহীনদের ঘর প্রকল্পের পর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত হয় ঠাকুরগাঁও লিগ্যাল এইড কার্যক্রম নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন। জেলার অসংখ্য মানুষ জানতেন না, সরকারিভাবে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অর্থের অভাবে অনেক অসহায় মানুষ ন্যায়বিচারের পথে পা রাখতে পারছিলেন না।
লিগ্যাল এইড কমিটির কার্যক্রম, আবেদন প্রক্রিয়া ও সুবিধাভোগীদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার পর জেলায় ব্যাপক সাড়া পড়ে। আদালত প্রাঙ্গণে বাড়তে থাকে মানুষের উপস্থিতি, আবেদন জমা পড়তে থাকে একের পর এক। অনেকেই জানান সংবাদটি না দেখলে তারা কখনোই এই অধিকার সম্পর্কে জানতেন না। বিচার বিভাগও এই উদ্যোগের প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। আজ ঠাকুরগাঁওয়ে লিগ্যাল এইড সম্পর্কে সচেতনতা অনেক বেড়েছে। অসহায় পরিবার বিনামূল্যে আইনজীবী পাচ্ছেন, মামলা পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছেন, ন্যায়বিচারের পথে হাঁটছেন। এই পরিবর্তনের অংশ হতে পারা আমার সাংবাদিকতা জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে ফিরে তাকালে মনে হয় একটি সংবাদমাধ্যমের আসল শক্তি তার দালানে নয়, তার সাহসে, তার আকারে নয়, তার আদর্শে।
ঢাকা পোস্ট আমাকে পরিচিতি দিয়েছে, দায়িত্ববোধ শিখিয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ে আজ যে আস্থা, যে সাহসের প্রতীক হয়ে উঠেছে ঢাকা পোস্ট তার ক্ষুদ্র একজন সহযাত্রী হতে পেরে আমি গর্বিত। আমার প্রত্যাশা সত্যের পথে, মানুষের পক্ষে, সাহসী ও মানবিক সাংবাদিকতার ধারায় আরও বহু বছর এগিয়ে যাক ঢাকা পোস্ট। আর আমি যেন সেই আলোকযাত্রার একজন নিবেদিত সহযাত্রী হয়ে থাকতে পারি দীর্ঘদিন।
শুভ জন্মদিন ঢাকা পোস্ট।
এএমকে