বিজ্ঞাপন

ঝালকাঠিতে জ্বালানি তেলের বাজার স্বাভাবিক, পাম্পে নেই ভিড়

অ+
অ-
ঝালকাঠিতে জ্বালানি তেলের বাজার স্বাভাবিক, পাম্পে নেই ভিড়

‎মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত এবং ইরান-ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রভাব দেশের জ্বালানি খাতে উদ্বেগ তৈরি করলেও ঝালকাঠিতে এখনো পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

‎রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পেট্রোল পাম্পে তেল নিতে ভিড় দেখা গেলেও ঝালকাঠিতে তেমন কোনো চাপ বা বিশৃঙ্খলা নেই। জেলার বিভিন্ন পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, স্বাভাবিক সময়ের মতোই জ্বালানি বিক্রি চলছে। কোথাও দীর্ঘ লাইন বা হুড়োহুড়ির দৃশ্য নেই। মোটরসাইকেল চালকরা ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত লিমিটে তেল নিতে পারছেন। দূরের যাত্রীরা এর চেয়ে বেশিও পাচ্ছেন। বাস-ট্রাক-পিকআপসহ অন্যান্য পরিবহন চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছে।

‎সংশ্লিষ্টরা জানান, জেলায় মোট সাতটি পেট্রোল পাম্প রয়েছে, যার অধিকাংশই বরিশাল-খুলনা মহাসড়কের পাশে অবস্থিত। এই মহাসড়কটি দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট রুট হওয়ায় বাইরের জেলার যানবাহনের চালকরা এই জেলার পাম্পগুলো থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে। তবুও এখন পর্যন্ত সরবরাহে কোনো বিঘ্ন ঘটেনি। তেল নিতে যানবাহনের বৈধ কাগজপত্র দেখানোর কোনো বাধ্যবাধকতাও জারি করা হয়নি জেলা প্রশাসন থেকে।

‎শুধু স্থানীয় চাহিদাই নয়, পাশের জেলা ও উপজেলার অনেক চালক ঝালকাঠিতে এসে তেল নিচ্ছেন। এরপরও জেলার চাহিদা নির্বিঘ্নে পূরণ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পাম্প সংশ্লিষ্টরা। খুচরা দোকানেও তেল পাওয়া যাচ্ছে, তবে কিছু কিছু দোকানে প্রতি লিটারে পাঁচ থেকে সাত টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

‎খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঝালকাঠিতে রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি বড় তেল কোম্পানির ডিপো থাকায় এখানকার সরবরাহ ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড এবং যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ডিপো থেকে প্রতিদিন বরিশাল বিভাগসহ দক্ষিণের দশটি জেলায় ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন সরবরাহ করা হয়।

‎সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম থেকে ট্যাংকারে করে তেল এনে ঝালকাঠির ডিপোগুলোতে সংরক্ষণ করা হয়। পরে সেখান থেকে ট্যাংকলরির মাধ্যমে বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলাসহ আশপাশের জেলায় সরবরাহ দেওয়া হয়। ফলে দেশের অন্য কোথাও চাপ তৈরি হলেও ঝালকাঠিতে এখনো তার প্রভাব পড়েনি।

‎তবে কিছু ক্ষেত্রে বাড়তি চাহিদার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। পাম্প কর্মচারীরা জানান, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে কিছু মোটরসাইকেল চালক প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনে মজুত করার চেষ্টা করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব ও অনিশ্চয়তার কারণে এই প্রবণতা বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

‎সিটি ট্রেডের খুচরা তেল ব্যবসায়ী নোবেল বলেন, আগের তুলনায় এখন কিছুটা বেশি মানুষ তেল নিচ্ছে। অনেকেই প্রয়োজনের বাইরে কিনে রেখে দিচ্ছেন। তবে সরবরাহ ঠিক থাকায় এখনো কোনো সংকট দেখা যায়নি। কোনো দোকানদার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে পাঁচ-সাত টাকা বেশি দামে বিক্রি করছেন।

‎মেসার্স আনযার ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার উজ্জল মন্ডল বলেন, আমাদের পাম্পে পর্যাপ্ত তেল রয়েছে, কোনো সংকট নেই। ডিপো থেকে নিয়মিত তেল আসছে। তবে কিছু চালক বারবার এসে তেল নিচ্ছেন, বোঝা যায় তারা মজুত করছেন। এজন্য আমরা ২০০ থেকে ৩০০ টাকার বেশি দিচ্ছি না। তবে দূরপাল্লার যাত্রী হলে বিবেচনা করা হয়। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ হাজার লিটার জ্বালানি বিক্রি হচ্ছে।

‎বিএম পরিবহনের চালক মানিক খান বলেন, আমি নিয়মিত এই রুটে গাড়ি চালাই। এখনো তেলের জন্য কোনো সমস্যা হয়নি। লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে না, সহজেই তেল পাওয়া যাচ্ছে। তবে বাস চালকরা বাড়তি তেল নিচ্ছেন, এটা ঠিক না।

‎ঝালকাঠির পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক রনি বলেন, পরিবহন চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক আছে। তেলের কোনো সংকট নেই। তবে কেউ যদি অপ্রয়োজনীয়ভাবে তেল মজুত করে, তাহলে ভবিষ্যতে সমস্যা হতে পারে। আমরা শ্রমিকদের এ বিষয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দিচ্ছি।

‎ঝালকাঠি বাস মালিক সমিতির সভাপতি আনিসুর রহমান বলেন, এখন পর্যন্ত ঝালকাঠিতে জ্বালানি নিয়ে কোনো সংকট নেই। আমাদের সমিতির শতাধিক বাস স্বাভাবিকভাবে চলাচল করছে। তবে অপ্রয়োজনীয় মজুত হলে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে।

‎মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ঝালকাঠি ডিপোর ইনচার্জ শাহীন আলম বলেন, আমাদের ডিপোতে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং নিয়মিত সরবরাহ আসছে। আমরা তালিকা অনুযায়ী জেলার প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি দিচ্ছি। পাশাপাশি পাশের জেলা ও উপজেলাগুলোতেও সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। এখান থেকে দক্ষিণাঞ্চলের ১০টির বেশি জেলায় তেল পাঠানো হয়। এই মুহূর্তে সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই। তবে ডিপোর ধারণক্ষমতা ও দৈনিক লোড-আনলোডের পরিমাণ সম্পর্কে তিনি কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি।

‎পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও বরিশাল বিভাগীয় কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি মীর জিয়াউদ্দিন মিজান বলেন, ঝালকাঠিতে আমাদের তিনটি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। পাশের জেলা থেকে অনেক চালক এখানে তেল নিতে আসেন। তারপরও সরবরাহ স্বাভাবিক আছে। তবে মজুত করার প্রবণতা বাড়ছে, যা উদ্বেগজনক। প্রতিদিনের চাহিদা সহজেই পূরণ করা যাচ্ছে।

‎জেলা প্রশাসক মো. মমিন উদ্দিন বলেন, ঝালকাঠিতে কোনো জ্বালানি সংকট নেই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন নজরদারিতে রয়েছে। ডিপোতে সেনাবাহিনী ও পাম্পগুলোতে পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কোনো ধরনের কৃত্রিম সংকট বা মজুত ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

‎বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে, যার প্রভাব ধীরে ধীরে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও পড়তে পারে। তবে ডিপোসমৃদ্ধ জেলা হওয়ায় আপাতত ঝালকাঠিতে স্বস্তি বিরাজ করছে। যদিও অযৌক্তিক মজুত প্রবণতা বাড়লে ভবিষ্যতে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

‎মো. শাহীন আলম/এএমকে

বিজ্ঞাপন