ওয়াজে কী বলা হয়

Fatihul Kadir Samrat

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:৩২ পিএম


ওয়াজে কী বলা হয়

কথার কোনো টাকসো নাই। খোদার দেওয়া মুখে যা খুশি তাই বলা যায়। লাগামহীন কথার কারিগর মূলত রাজনীতি ও ওয়াজের মাঠের খেলোয়াড়গণ। ‘গণ’ বললাম বটে কিন্তু তা সাকুল্যবাচক নয়। কমসংখ্যক হলেও উভয় মহলে দায়িত্বশীল মানুষ অবশ্যই আছেন। কথার লাগামটা জিহ্বায় নয়, বিচারবুদ্ধিতে, দায়িত্বশীলতায়।

রাজনীতির মাঠে সবকিছু জায়েজ কারণ সেখানে রেফারি হলো জনগণ, যাদের হাতে লাল কার্ড হলুদ কার্ড কিছুই নেই। ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই’ অতএব রাজনীতির মাঠে ফ্রি-স্টাইল কথার খেলা নিয়ে মানুষ মাথা ঘামায় না। কিন্তু ওয়াজের মাঠে ফ্রি-স্টাইল কথার সুযোগ নেই। কারণ কথা বলার বিষয়ে বিধিবিধান দিয়েছে খোদ কোরআন। সৃষ্টিকর্তার দেওয়া বিবেক, জিহ্বা ও ভাষার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার হলে এপারে কিছু না হলেও ওপারে লাল কার্ড অবধারিত।

ওয়াজের মাঠ দাপিয়ে যারা বেড়ান, তাদের অনেকে মাইক আর শ্রোতা সামনে পেলে ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্বশীলতার কথা অবলীলায় ভুলে যান। জিহ্বা লাগামছাড়া হয়ে যায় তাদের। তাদের অনেক কথা সমাজে বিভেদ ও বিদ্বেষ ছড়ায়। ইসলাম সম্পর্কেও মানুষের কাছে ভুল বার্তা যায়।

ওয়াজ-বাণিজ্যের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজেদের কাটতি বাড়াতে অনেক হুজুর যা বলেন তা সরাসরি ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তবু আমি ওয়াজ শুনি। এ ক্ষেত্রে আমার কাছে শিয়া, সুন্নি, খারেজি, ইবাদি সব মত ও পথের কথা শুনি। ইসলামের উপদলীয় বাহাস বা মুনাজারা শুনে বিভক্তির স্বরূপ বুঝতে চেষ্টা করি। বিশ্বের নামকরা সব ধর্মীয় স্কলারের আমি ফলোয়ার। বাংলাদেশের তাহেরী থেকে ওলিপুরী― কারও ওয়াজ বাদ দিইনি। কিছু শুনি জানার জন্য, কিছু শুনি মানার জন্য।

বাংলাদেশের ওয়াজ মাহফিলগুলো অনেক সময় বিষোদগার ও কাদা-ছোড়াছুড়ির নোংরা মাঠ হয়ে দাঁড়ায়। মত ও পথের পার্থক্যে অনেক হুজুর অন্যের মতকে শুধু অগ্রাহ্যই করেন না, বাতিলও করেন। প্রত্যেকে সঠিক এই বিশ্বাসে অনড়। কথায় কথায় অন্যকে কাফের-মুরতাদ ঘোষণা দেওয়া কিছু আলেমের অভ্যাস। কাফের-মুরতাদ ঘোষণার ঠিকাদারি নেওয়া এসব হুজুর এ ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা থোড়াই কেয়ার করেন। বেরলভী ও দেওবন্দিরা কেউ কাউকে ছাড়ে না। আলেমদের কথা ঠিক হলে দেশে কোনো মুসলমান থাকার কথা নয়, সব কাফের-মুরতাদ।

ওয়াজ-বাণিজ্যের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজেদের কাটতি বাড়াতে অনেক হুজুর যা বলেন, তা সরাসরি ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ... বিশ্বের নামকরা সব ধর্মীয় স্কলারের আমি ফলোয়ার। বাংলাদেশের তাহেরী থেকে ওলিপুরী― কারও ওয়াজ বাদ দিইনি। কিছু শুনি জানার জন্য, কিছু শুনি মানার জন্য।

আল্লাহ বাক প্রত্যঙ্গ দিয়েছেন কিন্তু তার যথেচ্ছ ব্যবহারের স্বাধীনতা দেননি। প্রতিটি কথার হিসাব চুকাতে হবে আল্লাহর কাছে। আর সেই কথা যদি সমাজে বিভক্তি ও ফেতনা-ফ্যাসাদ তৈরির সহায়ক হয়, তাহলে আল্লাহর দেওয়া কঠিন শাস্তি অবধারিত। কথার কারিগর হুজুরদের কেউ কেউ ওয়াজ বাজারের কাটতি বুঝে কথার কারিকুরি করতে গিয়ে আল্লাহর নির্দেশনাকে উপেক্ষা করে যান। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাকে তার জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের সঠিক ব্যবহারের নিশ্চয়তা দিতে পারবে, আমি তাকে জান্নাতের নিশ্চয়তা দিতে পারব।’ (সহিহ বুখারি)

কাফের-মুরতাদ ফতোয়া দেওয়া আমাদের দেশে যেভাবে ডালভাত বানিয়েছেন অনেক হুজুর, বিষয়টা আসলে তেমন নয়। চূড়ান্ত প্রমাণ সাপেক্ষে কেবল অধিকারপ্রাপ্ত ব্যক্তিই এমন ফতোয়া দিতে পারেন। হাদিস অনুযায়ী কেউ যদি কাউকে কাফের বলে এবং ঐ ব্যক্তির কুফরি না করে থাকে, তাহলে যে কাফের বলবে সে-ই কাফের হয়ে যাবে। এই কঠিন বার্তাটি আমাদের আলেমদের অনেকে আমলে নেন বলে মনে হয় না। কিছু লোক দৃশ্যত মুসলমান হয়েছিল কিন্তু মন থেকে হয়নি। তারা ইসলামের ক্ষতি চাইত। সাহাবিরা তাদের বিষয়ে রাসুল (সা.)-কে জানালে তিনি বলেন, ‘কারও মনের খবর রাখা নবীর কাজ নয়। মনের খবর রাখা আল্লাহর কাজ। কাজেই ঐসব আপাতদৃষ্ট মুসলমানদের কিছু বলা যাবে না।’

কাফের-মুরতাদ ফতোয়া দেওয়া আমাদের দেশে যেভাবে ডালভাত বানিয়েছেন অনেক হুজুর, বিষয়টা আসলে তেমন নয়। চূড়ান্ত প্রমাণ সাপেক্ষে কেবল অধিকারপ্রাপ্ত ব্যক্তিই এমন ফতোয়া দিতে পারেন।

খলিফা উমর ইবনে খাত্তাবের শাসনামলে ইবনে মাজউন নামে পরিচিত এক ব্যক্তি ইসলামে মদ্যপানের অনুমতি রয়েছে বলে বিবৃতি দেন। খলিফা এ জন্য তাকে কাফের ঘোষণা না করে বললেন, ‘এ ব্যাপারে কোনো রায় ঘোষণার আগে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য সাক্ষ্য-প্রমাণসহ যাচাই করা প্রয়োজন।’ কথায় কথায় ফতোয়া দেওয়া তো রীতিমতো নিষিদ্ধ।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যারা দ্রুত ফতোয়া বা সিদ্ধান্ত দেয়, তারা জাহান্নামে যাবে।’ (দারেমি, হা. নং-১৫৭) আলেমগণ নিজেদের নবী-রাসুলদের ওয়ারিশ বলে দাবি করেন। হাদিসের সূত্রে আমাদের তা মানতেও কোনো দ্বিধা নেই। তারা অবশ্যই সম্মানিত ব্যক্তি। কিন্তু নবী-রাসুলের ওয়ারিশ যারা, তাদের কথা ও আচরণও তো নবী-রাসুলের মতোই হতে হবে। নবী-রাসুলগণ অবান্তর ও প্রমাণশূন্য কথা বলেননি কখনো। তারা শান্তি ও সমঝোতাকে ঊর্ধ্বে রেখেছেন। বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন। তাদের এদেশীয় ওয়ারিশদের কেউ কেউ তাদের পূর্বপুরুষদের আদর্শ অনেকখানি যে ভুলে গেছেন, এটা নিয়ে অনেকের সন্দেহ নেই।

ইসলামের ছায়ায় সবাইকে ডেকে আনা আলেমদের কাজ, কাউকে খারিজ করা নয়। তাদের কথার মাধুর্য, বিনয় ও সহানুভূতিতে মানুষ ইসলামে আকৃষ্ট হবেন, এটাই কাম্য। তাদের প্রতিটি কথা হবে সুচিন্তিত ও যৌক্তিক। কিন্তু আমরা মাঠের চিত্র যা দেখছি, তা খুবই হতাশাজনক। হুজুররা যদি কথার কথা বলেন, কথা বলাটাকে বাণিজ্য হিসেবে নেন, তাহলে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের অবস্থা হবে শোচনীয়।

ফাতিহুল কাদির সম্রাট ।। বিভাগীয় প্রধান, বাংলা, লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজ

Link copied