একুশের অঙ্গীকার : ভাষার মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্রের সক্রিয় দায়িত্ব

মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রাক্কালে যখন আমরা একুশের প্রভাতে শহীদ মিনারের দিকে মুখ করি, তখন শুধু ফুল দেওয়া বা শোকের আনুষ্ঠানিকতা পালনের মধ্যেই আমাদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ থাকে না। ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া মানুষের স্মৃতি আমাদের সামনে এক গভীর প্রশ্নও উত্থাপন করে— আমরা কি সত্যিই সেই ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে পেরেছি। আমরা কি আমাদের কথাবার্তা, রাজনৈতিক আচরণ ও সামাজিক যোগাযোগে বাংলা ভাষাকে তার সৌন্দর্য, শালীনতা ও মানবিকতার আসনে প্রতিষ্ঠিত রাখতে পেরেছি। নাকি ক্রমশ এমন এক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছি, যেখানে ভাষা কেবল আঘাতের হাতিয়ার, বিভাজনের অস্ত্র এবং সাময়িক জনপ্রিয়তার মাধ্যম হয়ে উঠছে।
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির আত্মত্যাগ কেবল ভাষার স্বীকৃতির দাবি ছিল না, এটি ছিল আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক মর্যাদার প্রশ্ন। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৯ সালে UNESCO একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যা ২০০০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে। এই স্বীকৃতি আমাদের গৌরবের, কিন্তু একই সঙ্গে এটি আমাদের ওপর দায়িত্বও আরোপ করে। বিশ্ব যখন মাতৃভাষার সুরক্ষা ও বিকাশের প্রশ্নে আমাদের দিকে তাকায়, তখন আমাদের নিজেদের ভাষাচর্চা, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সামাজিক যোগাযোগের মান কেমন, তা নিয়ে আত্মসমালোচনা জরুরি হয়ে পড়ে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের মত প্রকাশের ক্ষেত্র বিস্তৃত করেছে। যে তরুণ প্রজন্ম একসময় সীমিত পরিসরে কথা বলত, তারা এখন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। এই পরিবর্তন গণতন্ত্রের জন্য সম্ভাবনাময়। কিন্তু একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে, ভাষার শালীনতা ও যুক্তির চর্চা অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়, মতের ভিন্নতা সামনে আসে, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু মতের পার্থক্য যখন ব্যক্তিগত আক্রমণ, কুরুচিপূর্ণ শব্দচয়ন এবং বিদ্বেষমূলক বক্তব্যে রূপ নেয়, তখন তা শুধু রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেই নয়, ভাষার ঐতিহ্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বাংলা ভাষা প্রতিবাদের ভাষা, কিন্তু তা ছিল মর্যাদার প্রতিবাদ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখেছেন, কিন্তু তার ভাষা কখনো শালীনতার সীমা ছাড়ায়নি। কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহের কবিতা লিখেছেন, তবুও শব্দে ছিল শিল্পের দীপ্তি, মানবিকতার আবেদন। ভাষা যে শক্তিশালী হতে পারে, অথচ অশালীন না হয়ে, সেই শিক্ষাই আমাদের সাহিত্যিক ঐতিহ্য দিয়েছে। একুশের চেতনাও সেই ধারারই অংশ। অথচ আজ অনেকেই মনে করেন, উচ্চস্বরে আক্রমণ করাই শক্তির প্রমাণ। ভদ্র ভাষাকে দুর্বলতা ভাবার এই প্রবণতা আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরকে ক্রমেই কঠোর ও অসহনশীল করে তুলছে।
মহান শহীদ দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। কিন্তু ভাষার মর্যাদা রক্ষা মানে শুধু বিদেশি ভাষার আধিপত্যের বিরোধিতা নয়। ভাষার ভেতরের নৈতিকতা ও সৌন্দর্য রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যদি আমরা নিজেরাই বাংলা ভাষাকে গালাগালি, অপমান ও বিদ্বেষের বাহনে পরিণত করি, তবে শহীদদের আত্মত্যাগের চেতনাকে আমরা কতটা ধারণ করছি, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
এই প্রেক্ষাপটে নবগঠিত বিএনপি সরকারের প্রতি একটি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিভাজনের পর মানুষ একটি স্থিতিশীল, শালীন ও অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখতে চায়। ভাষার প্রশ্নে সরকার প্রতীকী ও কার্যকর উভয় ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে। প্রথমত, রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি আচরণবিধি প্রণয়ন করা যেতে পারে, যেখানে নির্বাচনী প্রচারণা ও জনসমাবেশে শালীন ভাষা ব্যবহারের নীতিমালা স্পষ্ট থাকবে। এটি কেবল কাগুজে নথি না হয়ে বাস্তব প্রয়োগযোগ্য হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থায় ভাষা ও নাগরিকতার সম্পর্ককে নতুনভাবে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একুশের ইতিহাসকে শুধু পরীক্ষার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না রেখে, ভাষার নৈতিক ব্যবহার, মতভেদের সংস্কৃতি এবং যুক্তিনির্ভর বিতর্কের প্রশিক্ষণ স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। তরুণদের বোঝাতে হবে, তীব্র সমালোচনা করা যায়, কিন্তু তা শালীন ও তথ্যভিত্তিক ভাষায়ও সম্ভব।
তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ উৎসাহিত করতে সরকার নীতিগত উদ্যোগ নিতে পারে। এটি কোনোভাবেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করার অজুহাত হওয়া উচিত নয়। বরং ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো, ভুয়া তথ্য শনাক্ত করার প্রশিক্ষণ এবং ঘৃণামূলক বক্তব্যের সামাজিক ক্ষতি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। তরুণ প্রজন্মই এখানে প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত, কারণ তারাই ডিজিটাল পরিসরের সবচেয়ে সক্রিয় অংশ।
চতুর্থত, রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার মানসম্মত ব্যবহার নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি। সরকারি দপ্তর, আদালত, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় বাংলা ভাষার পরিশীলিত ও প্রমিত ব্যবহার বাড়াতে প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিতে বাংলার ব্যবহার সম্প্রসারণ, মানসম্পন্ন অনুবাদ এবং বৈজ্ঞানিক পরিভাষা উন্নয়নে একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে। ভাষা দিবসের আবেগকে বাস্তব উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত না করলে তা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে।
নবগঠিত সরকার চাইলে একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে একটি জাতীয় সংলাপের উদ্যোগ নিতে পারে, যেখানে রাজনৈতিক দল, শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতিকর্মী, তরুণ প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যম একত্রে বসে ভাষা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করবে। মতভেদ থাকবে, কিন্তু সেই মতভেদের প্রকাশই হবে শালীন ও যুক্তিপূর্ণ ভাষার অনুশীলন। এই ধরনের উদ্যোগ প্রতীকী হলেও তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
মাতৃভাষা দিবসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বহুভাষিকতার প্রতি সম্মান। বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা রয়েছে। একুশের চেতনা আমাদের শেখায়, মাতৃভাষার অধিকার সর্বজনীন। সুতরাং রাষ্ট্র যদি সত্যিই ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে চায়, তবে এসব ভাষার সংরক্ষণ ও বিকাশের জন্যও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এতে বাংলা ভাষার মর্যাদা কমবে না; বরং ভাষাগত সহনশীলতা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান বৃদ্ধি পাবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র কেবল ভোটের প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি ভাষা ও আচরণের সংস্কৃতি। সংসদে বিতর্ক, টেলিভিশন টকশো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা— সব জায়গায় যদি ভাষা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, তবে সেই গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হয়। নবগঠিত বিএনপি সরকারের সামনে তাই শুধু প্রশাসনিক বা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ নয়, একটি নৈতিক চ্যালেঞ্জও রয়েছে। তারা যদি নিজেদের বক্তব্য, নীতিনির্ধারণ ও রাজনৈতিক আচরণে শালীনতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে, তবে তা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
মহান শহীদ দিবসের প্রভাতে আমরা যখন “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি” গানটি স্মরণ করি, তখন আমাদের ভাবতে হবে, এই রক্ত কেবল ভাষার স্বীকৃতির জন্য ছিল না; এটি ছিল মর্যাদার জন্য। সেই মর্যাদা আজ আমাদের ভাষায়, আমাদের রাজনৈতিক আচরণে, আমাদের সামাজিক যোগাযোগে প্রতিফলিত হচ্ছে কি না, সেটিই আসল প্রশ্ন। যদি ভাষা বিদ্বেষের বাহন হয়ে ওঠে, তবে আমরা ইতিহাসের সঙ্গে অবিচার করি।
এখন সময় এসেছে ভাষাকে আবারও মানবিকতার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু না ভেবে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা, মতভেদকে বিভাজন না ভেবে বৈচিত্র্য হিসেবে গ্রহণ করা এবং আবেগের বদলে যুক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া— এই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েরই উদ্যোগ প্রয়োজন। নবগঠিত বিএনপি সরকার যদি একুশকে ধারণ করে একটি সুস্পষ্ট বার্তা দেয় যে রাজনৈতিক ভাষায় শালীনতা ও সহনশীলতা বজায় রাখা হবে এবং সে অনুযায়ী নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে, তবে তা জাতির জন্য ইতিবাচক দিকনির্দেশনা হয়ে উঠতে পারে।
একুশ আমাদের শিখিয়েছে, ভাষা বাঁচে মানুষের চর্চায়। সেই চর্চা যদি মর্যাদাপূর্ণ হয়, তবে ভাষা সমৃদ্ধ হয়; আর যদি তা কুরুচি ও বিদ্বেষে ভরে যায়, তবে ভাষা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আগামী প্রজন্মের হাতে আমরা কেমন ভাষা তুলে দিতে চাই, সেটিই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে আমাদের অঙ্গীকার হোক, আমরা ভাষাকে আঘাতের নয়, আলোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করব। আর রাষ্ট্র যেন সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পথে নেতৃত্ব দেয়। তখনই একুশের আত্মত্যাগ সত্যিকার অর্থে সার্থক হবে।
ড. খালিদুর রহমান : অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়