নগর স্বাস্থ্য : তরুণদের অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন

দেশের দ্রুত বর্ধনশীল শহরগুলোয় জনস্বাস্থ্য আজ এক বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়নের ফলে শহরাঞ্চলে জনসংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও। বিশেষ করে বস্তি ও স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠী নানা ধরনের স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। অপরিকল্পিত বাসস্থান, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের অভাব, দূষিত পরিবেশ, অপুষ্টি এবং মানসিক চাপ নগর স্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে (World Bank, Urban Health in Bangladesh)। এই বাস্তবতায় নগর স্বাস্থ্য উন্নয়নে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
তরুণরা শুধু নগর স্বাস্থ্যসেবার উপকারভোগী নয়, বরং তারা পরিবর্তনের চালিকাশক্তি। তাদের শক্তি, সৃজনশীলতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং কমিউনিটির সঙ্গে সংযোগ নগর স্বাস্থ্যসেবাকে আরও কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন শহরে তরুণরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে জরুরি সেবা প্রদান, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।
ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোয় নগর মাতৃসদন, আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সার্ভিস (UPHC) এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে তরুণরা সরাসরি স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছে। বিশেষ করে শহরের বস্তি এলাকায় গর্ভবতী নারী, শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবায় তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের অবদান দিন দিন বাড়ছে।
স্বাস্থ্যবিষয়ক র্যালি, ক্যাম্পেইন এবং বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে তরুণরা সাধারণ মানুষের মাঝে জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় তথ্য ও বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে তরুণরা শুধু তথ্য প্রচারই করছে না বরং মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণগত পরিবর্তন আনতেও সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (BDRCS) ও বিভিন্ন স্থানীয় সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত তরুণরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অগ্নিকাণ্ড, মহামারী এবং অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে আসছে। এসব সংকটকালে তারা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সম্মুখ সারিতে থেকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ায় এবং দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দিতে সক্রিয়ভাবে কাজ করে।
বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় শহরাঞ্চলে তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এ সময়ে ৫০,০০০-এর বেশি তরুণ স্বেচ্ছাসেবক স্বাস্থ্য সচেতনতা ও সহায়তা কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছিল (BDRCS Annual Report, 2021)।
তারা স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি, মাস্ক ও অন্যান্য সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ, হাত ধোয়ার অভ্যাস ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার গুরুত্ব প্রচার এবং টিকা গ্রহণে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে মহামারি মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখে। এ অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, সঠিক দিকনির্দেশনা ও সুযোগ পেলে তরুণরা সংকট মোকাবিলায় নির্ভরযোগ্য শক্তি হতে পারে।
নগর জীবনের চাপ, বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলছে। তরুণরা মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, কাউন্সিলিং সেশন আয়োজন এবং সামাজিক সহায়তামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে এই সমস্যাগুলো মোকাবিলায় ভূমিকা রাখছে। বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিষয়ক র্যালি, আলোচনা সভা ও কমিউনিটি কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা মানসিক স্বাস্থ্যকে সামাজিক আলোচনার মূলধারায় আনছে (WHO Bangladesh – Mental Health)।
বাংলাদেশে, বিশেষ করে বস্তি ও অনগ্রসর এলাকায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে তরুণদের এই সক্রিয় অংশগ্রহণকে আরও সুসংগঠিত ও বেগবান করা অত্যন্ত প্রয়োজন। নগর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি, সীমিত সেবা প্রাপ্তি ও সচেতনতার ঘাটতি মোকাবিলায় তরুণরা একটি কার্যকর পরিবর্তন-দূত হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সেই ভূমিকা ফলপ্রসূ করতে হলে তাদের অংশগ্রহণকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও সহায়তার আওতায় আনতে হবে।
এ লক্ষ্যে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তরুণদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা জরুরি, যাতে তারা বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে নগর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় মতামত দিতে পারে (UNFPA – Youth-friendly Policy Framework)।
স্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও কমিউনিটি নেতৃত্ব বিষয়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের দক্ষতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবায় প্রণোদনা, স্বীকৃতি ও ক্যারিয়ারভিত্তিক সুযোগ তৈরি করলে তাদের সম্পৃক্ততা আরও শক্তিশালী হবে ও দায়বদ্ধতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
সরকার, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমন্বিত ও ধারাবাহিক উদ্যোগের মাধ্যমে তরুণদের ক্ষমতায়ন করা গেলে নগর স্বাস্থ্যসেবায় একটি ইতিবাচক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই পরিবর্তন আনা সম্ভব। তরুণদের উদ্যম, নেতৃত্ব ও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে শহরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীসহ সামগ্রিক নগর জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন নিশ্চিত করা যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি সুস্থ ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে সহায়ক হবে।
নগর স্বাস্থ্য কেবল অবকাঠামো বা সেবা সম্প্রসারণের বিষয় নয়; এটি সমতা, অংশগ্রহণ ও মানবিক উন্নয়নের প্রশ্ন। আর সেই ভবিষ্যৎ গঠনে তরুণরাই হতে পারে সবচেয়ে শক্তিশালী অংশীদার।
তথ্যঋণ:
১। World Bank, Urban Health in Bangladesh World Health Organization (WHO). Urban Health and Equity.
২। Local Government Division (LGD), Bangladesh. Urban Primary Health Care Services Project (UPHCSP).
৩। Bangladesh Red Crescent Society
৪। BDRCS Annual Report, 2021
৫। WHO Bangladesh – Mental Health
৬। UNFPA – Youth-friendly Policy Framework
অভিজিৎ কুমার সিংহ : রিসার্চ অ্যান্ড কমিউনিকেশন অফিসার, এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট
[email protected]