পানের বরজে কাজ করছেন সন্ধ্যা রাণী মন্ডল

একটা সময় অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। অন্যের জমি বর্গা নিয়ে দুই ফসলি জমিতে ধান চাষ করে চলতো সংসার। এখন সেই জমিতে ধানের পাশাপাশি পান চাষ করে ভাগ্য ফিরেছে সন্ধ্যা রাণী মন্ডলের (৩৬)। তিনি নওগাঁ সদর উপজেলার কিত্তিপুর ইউনিয়নের জাগেশ্বর গ্রামের নিখিল চন্দ্র মন্ডলের (৪৬) স্ত্রী।

নওগাঁ সদর উপজেলার কিত্তিপুর ইউনিয়নের জাগেশ্বর গ্রামে পৌঁছালে দেখা মিলবে শত শত পানের বরজের। গ্রামের প্রতিটি বাড়ির মানুষ কৃষি জমিতে পানের বরজ গড়ে তুলেছেন। সব মিলিয়ে প্রায় ১০০-১৫০ বরজ নিয়ে গ্রামটি এখন পান পাতার গ্রাম নামে পরিচিতি লাভ করেছে।

১০-১৫ বছর ধরে এলাকার চাষিরা ধানের পাশপাশি পান পাতা চাষ করে লাভের মুখ দেখছেন। আবহাওয়া এবং চাষ পদ্ধতি অনুকূল হওয়ায় পান পাতা চাষ বৃদ্ধি পেয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।

সন্ধ্যা রাণী মন্ডল ঢাকা পোস্টকে বলেন, ৩ বছর আগে প্রতিবেশীর কাছ থেকে জানতে পারি পান চাষে ধানের থেকে লাভ বেশি। সেই কারণে আমাদের জায়গায় পানের বরজ তৈরি করি। এখন আর কোনো অভাব নেই। বড় মেয়ে ছন্দা রাণী (১৭) পড়াশোনা করছে নওগাঁ বিএমসি সরকারি মহিলা কলেজে আর ছোট ছেলে কৃষ্ণ চন্দ্র মন্ডল (১২) সপ্তম শ্রেণিতে কিত্তিপুর হাই স্কুলে। সংসারের কাজের ফাঁকে পানের বরজ তৈরি করে বছরে এক লাখ টাকা আয় হচ্ছে। 

জাগেস্বর গ্রামের সুরেন সরকার গত আশ্বিন মাসে পরলোকগমন করেন। তার স্ত্রী সন্তান নিয়ে পড়েন বিপাকে। তখন ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে স্বামীর রেখে যাওয়া দুটি পানের বরজ দেখাশোনা শুরু করেন। এখন পান বিক্রি করে সংসারে ফিরে এসেছে সচ্ছলতা। 

নওগাঁয় দিন দিন বাড়ছে পান চাষ। ধান, আলুসহ অন্যান্য ফসলের চেয়ে পান চাষ লাভজনক হওয়ায় অনেকেই ঝুঁকছেন পান চাষে। জেলার সদর উপজেলার বেশ কিছু গ্রামের মাঠে নিজ মেধা ও উদ্যোগে পান চাষ করে ব্যাপক সফলতা পাচ্ছেন কৃষকরা। বিঘা প্রতি পানের বরজে প্রায় ১ লাখ টাকা খরচ করে পরবর্তী বছর থেকে লাভ করছেন ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা।

কলেজ পড়ুয়া কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, করোনাকালীন বাড়িতে চুপচাপ বসে ছিলাম। এ সময় গ্রামের নারীদের দেখে উৎসাহ পায়। নিজেদের জমিতে বরজ তৈরি করি।

কৃষক অমল চন্দ্র মহন্ত বলেন, প্রতিবিঘা জমির পানের বরজে মাটির আইল, বেড়া, ছাউনি, শ্রমিক, পানের লতাসহ এক লাখ টাকা প্রাথমিক অবস্থায় খরচ হয়। পরের বছর খরচ খুবই সামান্য হয়। কারণ একটি পানের বরজ সংস্কার ছাড়া ৪০-৪৫ বছর পর্যন্ত অক্ষুণ্ন থাকে। একটি বরজ থেকে ২ পোয়া (১২৮টি) পর্যন্ত পান পাওয়া যায়। বড় পান পুরাতন ১ পোয়া ৩ হাজার টাকা থেকে ৪ হাজার টাকা, মাঝারি পান ১ পোয়া ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৫০০ এবং ছোট পান ৫০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।

তিনি বলেন, একটি বরজ থেকে মৌসুমে ১ থেকে ১.৫ লাখ টাকার পান পাতা বিক্রি করেন তিনি। তবে জেলায় পান বিক্রির নির্ধারিত কোনো পাইকারি হাট বা বাজার নেই। ফলে পার্শ্ববর্তী দিনাজপুর জেলায় পান বিক্রি করতে বিড়ম্বনায় পড়তে হয় পান চাষিদের। জেলায় লাভজনক ফসল পানের চাষ বাড়াতে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন জেলা কৃষি বিভাগ।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কর্মকর্তা মো. সামসুল ওয়াদুদ ঢাকা পোস্টকে জানান, পান পাতাকে ঔষধি খাবার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এর চাষ পদ্ধতিতে কীটনাশকের ব্যবহার বেশি হলে পান পাতার ঔষধি গুণাগুন নষ্ট হয়ে যায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর থেকে পান চাষিদের কীটনাশকের ব্যবহার কম করার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। এ ছাড়া ধান চাষের পাশপাশি পান চাষে সার্বিক সহযোগিতা করছে কৃষি বিভাগ।

এসপি