পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে করোনার মারাত্মক সংক্রামক ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ডেল্টা ব্যাপকভাবে প্রাধান্য বিস্তার করেছে। ভ্যারিয়েন্টটি দেশব্যাপী ধীরে ধীরে ছড়াচ্ছে বলে সোমবার (২১ জুন) সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মারতা টেমিদো।

তিনি জানান, পর্তুগালের মোট সংক্রমণের ৭০ শতাংশের বেশি সংক্রমিত অঞ্চল হচ্ছে রাজধানী লিসবন এবং মৃত্যুর হারেও একই চিত্র লক্ষ্য করা যায়। যেমন- গত সোমবার দেশব্যাপী আক্রান্ত হয়েছে ৭৫৬ জন, এর মধ্যে লিসবনে ৪৮৪ জন। অপরদিকে মারা যাওয়া ৩ জনই লিসবন এলাকার বাসিন্দা।

সংক্রমণ পরিস্থিতিতে গত ১৪ জুন পুরো দেশ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরলেও রাজধানীসহ কয়েকটি মিউনিসিপ্যালিটি ফিরে গেছে আরও কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে। তাছাড়া কয়েকজন বিশেষজ্ঞ এবং খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন উচ্চ সংক্রমণ রোধে লিসবন এলাকায় কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা প্রয়োজন। যে কারণে গত সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে লিসবনবাসী পুরো দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ এই জোন থেকে বের হতে পারেননি, কেউ প্রবেশও করতে পারেননি।

তবে বর্তমান সংক্রমণ পরিস্থিতির যদি উন্নতি না হয় তাহলে লিসবন খুব শিগগিরই জরুরি অবস্থাকালীন সময়ে যেসব কঠোর বিধিনিষেধ পর্যায়ে ছিল সে দিকেই ফিরে যাবে। গ্রীষ্মের আগমনের আনন্দে এবং সংক্রমণ পরিস্থিতির উন্নতি সব মিলিয়ে নতুন করে স্বপ্ন বোনা রাজধানীবাসীর মধ্যে আবার অস্বস্তি ফিরে আসছে, ব্যবসায়ীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ সোজা হওয়ার আগেই আবার তা কুঁজো হয়ে যাচ্ছে।

পর্তুগাল জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের গবেষক ডক্টর রিকার্দো জর্জ জানিয়েছেন, জুন মাসে সংক্রমণের ৬০ শতাংশই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট এবং সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হচ্ছে লিসবনের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট যুক্তরাজ্যের আলফা ভ্যারিয়েন্টের চেয়ে ৬০ শতাংশ বেশি সংক্রমক। 

লিসবনে বসবাসকারী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে এই উচ্চ সংক্রমণের প্রভাব পড়েছে গত মে এবং জুন মাসে। এখানে বসবাসকারী অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে অনেকেই সংক্রমিত হওয়ার বিষয়টি অন্যকে অবহিত না করার কারণে সঠিক হিসেব পাওয়া যাচ্ছে না। তবে প্রতিদিনই আশঙ্কাজনক হারে লিসবনের বাংলাদেশ কমিউনিটিতে সংক্রমণ বাড়ছে।

রাজধানীকে রক্ষা করার জন্য গত ৩১ মার্চ নগর পিতা ফার্নান্দো মেদিনা নগরীর সব নাগরিকদের প্রতি মাসে বিনামূল্যে সর্বোচ্চ দুটি করে পরীক্ষা করানোর প্রকল্প ঘোষণা করেন। কিন্তু বর্তমানে উচ্চ সংক্রমণের কারণে এখন থেকে নাগরিকরা যতবার খুশি পরীক্ষা করতে পারবেন। তাছাড়া নগরীর বাসিন্দা না হলেও করোনা পরীক্ষা করা যাবে, যা এর আগে নগরীর স্থায়ী বাসিন্দা কি না তা যাচাই করা হতো। এছাড়া এরইমধ্যে চালু করা নগরীর জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় ভ্রাম্যমাণ করোনা পরীক্ষা কার্যক্রম চালু থাকবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী অপর এক বিবৃতিতে বলেছেন, আমাদের এই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টকে পরাজিত করার জন্য সময় বাঁচাতে হবে। সেজন্য প্রয়োজন বেশি পরিমাণে ভ্যাকসিন প্রদান করা। সেই লক্ষ্যে আগামী জুলাই মাস থেকে প্রতিদিন ১ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি মানুষকে টিকা প্রয়োগ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এদিকে গত ২০ জুন থেকে ত্রিশোর্ধ্বদের টিকা দেওয়ার অ্যাপয়েনমেন্ট প্রক্রিয়া চালু করার কথা থাকলেও ২১ জুন থেকে ৩৭ বছরের বেশি বয়সীদের টিকা প্রদানের জন্য অ্যাপয়েনমেন্ট শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পোর্টাল থেকে নির্দিষ্ট সময় নির্বাচন করে 
এ অ্যাপয়েনমেন্ট নেওয়া যাবে। পর্যায়ক্রমে বয়সভিত্তিক অ্যাপয়েনমেন্ট প্রক্রিয়া চালু থাকবে, যা প্রতি সপ্তাহে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে আপডেট করা হবে। স্বাস্থ্য নম্বরবিহীন অনিয়মিত অভিবাসীরাও করোনা টিকার জন্য রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন।

উল্লেখ্য, পর্তুগালে টিকা কার্যক্রম শুরুর পর গত ১৮ জুনের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী সর্বমোট ৭০ লাখ ৯৮ হাজার ৫৯৪ জন করোনার টিকা গ্রহণ করেছেন। যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশের বেশি। তবে এর মধ্যে প্রথম ডোজ নিয়েছেন ৪৬ লাখ ২১ হাজার ৯৪ জন এবং পূর্ণ ডোজ নিয়েছেন ২৪ লাখ ৭৬ হাজার ৬৪৮ জন।

অপরদিকে ২১ জুন পর্যন্ত সর্বমোট করোন আক্রান্ত হয়েছেন ৮ লাখ ৬৫ হাজার ৮০৬ জন এবং মারা গেছেন ১৭ হাজার ৬৮ জন। এ পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন ৮ লাখ ২০ হাজার ৮১ জন। বর্তমানে ২৮ হাজার ৬৫৭ জন আক্রান্ত অবস্থায় আছেন এবং আগের তুলনায় ধীরে ধীরে হাসপাতালে রোগী ভর্তির সংখ্যাও বাড়ছে।

জেডএস