চাষিরা ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে আনারস নিয়ে আসছেন

মৌসুমের আগেই রাঙামাটির স্থানীয় বাজারে আসতে শুরু করেছে হানিকুইন জাতের আনারস। জেলার নানিয়ারচর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আনারস চাষিরা ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে আনারস নিয়ে আসছেন জেলা সদরের বনরূপা সমতাঘাটের ভাসমান পাইকার বাজারে। সেখান থেকে স্থানীয় ও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পাইকাররা পাইকারি দরে আনারস কিনছেন।

চাষিরা জানান, এখন আনারসের মৌসুম না হলেও পাহাড়ের কয়েক বছর ধরে আগাম ফলন আসা আনারস চাষ হচ্ছে। এতে মৌসুমে উৎপাদিত আনারসের থেকে আগাম আনারসে বাড়তি লাভবান করতে পারেন তারা। কিন্তু মৌসুমে অনেক কৃষককেই আনারস চাষ করে লোকসানে পড়তে হয়।

নানিয়ারচর উপজেলার হাতিমারা এলাকায় ২০ হাজার আনারসের চারা সৃজন করেছেন সজীব চাকমা। বুধবার সাপ্তাহিক হাটে তিন হাজার আনারস এনেছেন বিক্রির জন্য। তিনি প্রতি পিস আনারস ১০ থেকে ১২ টাকা দাম হাঁকালেও বিক্রি করেছেন ৯ টাকা দরে। সজীব জানান, যেহেতু মৌসুমে আমরা ভালো দাম পাই না, তাই এখন আগাম চাষ করি। যেহেতু আগাম আনারসের চাহিদা রয়েছে; তাতে আরও বাড়তি দাম পেলে আমরা আরও লাভবান হতাম।

রাঙামাটি সদর উপজেলার কুতুকছড়ি এলাকা আগত আনারস বাগানের মালিক পুতুল চাকমা জানান, আমি এ বছর ১৫ হাজার আনারস চাষ করেছি। বুধবার সাপ্তাহিক হাটবারে আগাম আনারসের পাইকারি বাজারদর দেখতে এলাম। বাজারে ৭ থেকে ৯ টাকা দরে মাঝারি ও বড় আকারের আনারস বিক্রি হচ্ছে। ভাবছি আমিও আগামী হাটবারে এখানে আনারস আনব।

নানিয়ারচর উপজেলার মরাচেঙ্গী এলাকার চাষি রত্নবিকাশ চাকমা জানান, আগাম মৌসুমে বাড়তি দাম পাওয়ার জন্য তিন হাজার আনারস এনেছি। কুয়াশার কারণে দাম এখন কিছুটা কমে গেছে। যে আনারস আমরা আগাম হিসেবে প্রতি পিস ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি করতে পারতাম, সেগুলো এখন ৮ থেকে ৯ টাকার বিক্রি করতে হচ্ছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পাইকাররা যে দাম বলছেন, এতে বিক্রি করলে আমাদের খুব একটা লাভ হচ্ছে না। এই দামে বিক্রি করলে খরচ বাদ দিলে তেমন লাভবান হচ্ছি না আমরা।

নৌকায় ভর্তি করা হচ্ছে আনারস

পাইকার ফল ব্যবসায়ী আবুল কালাম জানান, আগাম আনারস হওয়ায় মৌসুমের চেয়ে এখন দাম অনেক ঊর্ধ্বে। মৌসুমে প্রতি পিস ৪ থেকে ৫ টাকা কিনলেও এখন কিনতে হচ্ছে ৮ থেকে ৯ টাকা দরে। আমরা এগুলো ১২ থেকে ১৩ টাকা দরে বিক্রি করে থাকি। এ কাজের সঙ্গে জড়িত শ্রমিক আল আমিন জানান, আমরা এখানে চাষিদের আনা আনারসগুলো পাইকাররা কিনে নেওয়ার পর সেগুলো আলাদা বোটে ট্রাকে ওঠানোর কাজটি করে থাকি। এরপর ট্রাকে ভরে আনারসগুলো দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। কেবল আনারসই না, পাহাড়ে উৎপাদিত বিভিন্ন মৌসুমি ফল লোড-আনলোডের কাজে আমরা জড়িত থাকি।

এদিকে বুধবার সকালে বনরূপা বাজার পরিদর্শন করে দেখা গেছে, স্থানীয়ভাবে খুচরা বাজারে প্রতি জোড়া মাঝারি আকারের আনারস বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা দরে। বড় আকারের আনারস বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা জোড়া। স্থানীয় উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী অনন্ত চাকমা জানান, আমি চাষিদের থেকে কিনে অনলাইনে অর্ডারের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে আনারসসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফল বিক্রি করে থাকি। বাজারে এলাম আনারসের দর দেখতে। আগাম আনারস হওয়ায় আশা করছি ব্যবসায়ে ভালো সাড়া পাব।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) রাঙামাটি কার্যালয়ের উপপরিচালক কৃষ্ণ প্রসাদ মল্লিক জানান, রাঙামাটির ১০টি উপজেলায় কমবেশি আনারস চাষ হলেও নানিয়ারচর ও রাঙামাটি সদরে বেশি চাষ হয়ে থাকে। গত মৌসুমে রাঙামাটির ১০টি উপজেলায় ২ হাজার ১৩০ হেক্টর জমিতে ৫৫ হাজার ৮৫০ টন আনারস উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে নানিয়ারচরে ১০৭০ ও সদর উপজেলায় ৫৭০ হেক্টর। চলতি বছর চাষের জমি আরও বাড়বে। এখন পর্যন্ত কৃষি বিভাগের হিসাবে ৭৩০ হেক্টর জমিতে আগাম আনারস চাষ হয়েছে। মৌসুমের শেষ দিকে মোট হেক্টর জমিতে চাষ হলো সেটি নির্ধারণ করা যাবে।

তিনি আরও বলেন, আগাম আনারস চাষ হওয়ায় কৃষকরা ভালো লাভবান হচ্ছেন। পাইকারদের কাছে তারা এখন ৭ থেকে ৮ টাকা দরে আনারস বিক্রি করছেন। পাইকাররা বাইরে নিয়ে সেই আনারস ২০ থেকে ২২ টাকা দরে বিক্রি করছেন খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে। এখানকার আনারস এখন স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছে। এতে চাষিরা আনারস চাষে ঝুঁকছেন।


প্রান্ত রনি/এনএ