ছবি : সংগৃহীত

এই প্রশ্নটা অতিশয় কঠিন। এমনকি আমার জিহ্বায় বা হাতে সরস্বতীর অধিষ্ঠান আছে ভাবলেও প্রশ্নটার একটা উত্তর তৈরি করার জন্য জিহ্বাখানা যতখানি লম্বা থাকা দরকার (কিংবা হাত যতখানি লম্বা হওয়া দরকার) তার ধারে কাছেও আমার নেই। ফলে আমাকে এই প্রশ্ন করা প্রায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগার মতো। আর যেহেতু আমার হাত (বা জিহ্বা) লম্বা না তাই পেঁচিয়ে-ঘুরিয়ে উত্তর দেবারই চেষ্টা করব। কিছুতেই সোজাসুজি বলব না।

আচ্ছা, এটা তো আপনারা লক্ষ্য করেছেন যে, অ্যান্টিজেন পরীক্ষা সামগ্রী (টেস্টিং কিট) বাসাবাড়িতে যাতে না-পাওয়া যায় তার জন্য কী পরিমাণ নজরদারি চলছে? এই নজরদারি সরকার করছেন নাকি সরকারের ভ্রাতৃপ্রতিম ব্যবসায়ী সংগঠন করছেন তা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। কারণ উভয়ের করাকরি আসলে বিভিন্ন নয়। তারা একত্রেই করে চলেছেন যা করার কথা আমাদেরকে। তাছাড়া সরাসরি সরকারের নাম মুখে নেওয়ার যে বিপদ তাও এড়ানো গেল এই ভাববাচ্যীয় প্রশ্ন উত্থাপনের মাধ্যমে। কিন্তু বিষয়টা কেমন অদ্ভুত না? যেখানে নাগরিকদের হরেদরে পরীক্ষা করতে পারার সুযোগটাই জনগণ নিয়ে দুশ্চিন্তিত সরকারের পয়লা মনোযোগ পাওয়ার কথা! তারও আগে, এখন থেকে বছর দুই আগেই যে স্থানীয় চিকিৎসা-বিজ্ঞানী প্রতিষ্ঠান বলছিলেন, টেস্টিং কিট অত্যন্ত স্বল্পমূল্যে দেশেই বানানো সম্ভব, সেটাও নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে!

অনেকেই ভেবেছিলেন এবং যতটা গলার স্বর নামানো যায় নামিয়ে বলেছিলেন যে, ওই বিজ্ঞানী প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধারের সাথে সরকারের সম্বন্ধের ইতিহাসের কারণেই তাদের এই উদ্যোগটা নিয়ে সরকার বাহাদুর আগ্রহ দেখায়নি। আমি তখন থেকেই এই ব্যাখ্যাটি বিশেষ পছন্দ করিনি। আংশিক বাস্তবতা এটা হতে পারে। কিন্তু মূলত পুরনো-শত্রুতার কারণে সরকার-বণিক আঁতাত এই আপত্তি করেননি। করেছেন সম্পূর্ণ নতুন বাণিজ্য-সম্ভাবনার কারণে।

আচ্ছা, ঠিক আছে গণস্বাস্থ্য না হয় সরকারের জন্য গণশত্রুসম, বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের বিজ্ঞানী-চিকিৎসকেরা তো তা নন! করোনার চিকিৎসা বিষয়ে তারা (ও আরও কেউ কেউ) যা বলেছিলেন, তা বলেছিলেন সেই প্রাচীন কালে। এতদিন পর, সারা বিশ্বে, কী এমন ভিন্ন চিকিৎসা চালু হয়েছে? হয়নি তো! তাহলে তাদের উৎসাহ না দেওয়ার কারণ ভাবলেই তো পরিষ্কার হতে পারি আমরা যে কী ঘটছে।

এখনো আপনারা বুঝতে পারছেন না যে, কেন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় তথা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই কেবল বন্ধ থাকছে? শপিং মল খোলা থাকলে উন্নয়নের মূল যে অর্থকড়ি তা নাচানাচি করতে থাকে। কিন্তু স্কুল-কলেজ খুললে নাচানাচি করবে শিশু-কিশোরবৃন্দ। সেই নাচানাচি থেকে মুদ্রা উত্তোলন সম্ভব হবে না।

এখন আপনি যখন বিদেশ ভ্রমণে যাবেন, তখন টিকেটের টাকার উপরে হাজার তিনেক টাকা খরচ করলেই আপনি আপনার কোভিডহীনতার সনদ বের করতে পারছেন। এমনকি যদি কোনো বিদেশযাত্রা নাও থাকে, কেবল যদি অফিসে ছুটির দরখাস্তের পাশাপাশি আপনার একটা কোভিড রিপোর্ট দেখাতে হয়, এই কাছাকাছি টাকাই আপনার খরচ করতে হবে। কারণ, কোনো ‘রাষ্ট্রীয় অনুমোদিত ডায়াগনস্টিক কোম্পানিই’ এর থেকে কম টাকায় আপনাকে এই বস্তু দেবে না।

মোটামুটি আড়াই থেকে সাড়ে চার হাজারের সীমানাতে এই ডায়াগনস্টিক দোকানগুলো ফি নিয়ে থাকে। এর থেকেও দামি টেস্ট ঢাকায় থাকতে পারে। আমার বিদ্যার বাইরে তা। একটা অ্যান্টিজেন টেস্ট, হয়তো বাসাতে ৫০ টাকাতেই হতে পারতো, সেটাও এসব দোকানে নেবে ৭০০ থেকে ১০০০ টাকা। এবং আপনাকে কোনো মুদ্রিত দলিল দেবে না। অর্থাৎ এটা দিয়ে দাপ্তরিক কোনো কাজ করতে পারবেন না।

তাহলে কী দাঁড়াল? টাকা আর টাকা। উন্নয়নের অর্থ কী তা যারা এদ্দিনে বোঝেননি তারা এর অর্থ, অর্থকড়ি ছিটাছিটির মধ্য দিয়ে বুঝতে পারছেন এ দফা। না বুঝলেও ঘাড় ধরে বোঝানোর মতো লোকজন চারপাশে তৈরি আছেন।

যে ভবনে থাকি আমি সেখানকার একজন ড্রাইভারের আলাপ শুনছিলাম। বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি করতে গিয়ে বাবা-মায়ের অর্থাৎ তার ও তার স্ত্রীর জন্মনিবন্ধন লাগবে। ভালো কথা! এখন বাংলাদেশ ডিজিটাল! অনলাইনে ফর্ম ফিলাপ করবেন? করতে বসলেই দেখবেন এখন আবার আবেদনকারীর বাবা-মায়ের জন্মনিবন্ধন নম্বর জানানো এই ফর্মের জন্য আবশ্যিক (ম্যান্ডেটরি)। ফাজলামিরও তো একটা সীমা থাকে! এই নম্বর কোথা থেকে পাবেন তারা? আপনি পারবেন? তো এইসব লোকজন অন্য রাস্তা নিচ্ছেন। ওই গাড়িচালকের কাছ থেকেই জানলাম এলাকার ‘জনপ্রতিনিধির’ অনুচর যারা, তারা বলেছেন ৬০০ টাকা দিলেই করে দেবেন। ফলে আলোচ্য ওই গাড়িচালক পরিবারের জনপ্রতি ৬০০ টাকা করে জোগাড় করছেন যাতে ‘সন্তান’ স্কুলে যেতে পারেন।

আপনারা নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন জন্মনিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ৬০০ টাকা গুরুতর কোনো খরচ নয়। অন্যান্য যে কার্ডফার্ড আছে তার খরচাপাতি গুরুতরভাবে ভিন্ন। তাছাড়া এখন এসব কার্ড, পাসপোর্ট সবকিছুর ঠিকাদারি হয়। আর এসব ঠিকাদারি এমন গুরুতর সব প্রতিষ্ঠানের হাতে গেছে, গিয়ে থেকেছে, আরও আরও যেতে থাকবে সেসব প্রতিষ্ঠানের নাম মুখেও না-আনা ঠিক হবে।

শিশুদের স্বাস্থ্য বিষয়ে দুশ্চিন্তা? তাই নাকি? তাহলে আপনি তিন হাজারের টেস্টিং ব্যবস্থা চালু রাখেন? তাও কয়েকটা ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ‘অনুমোদন’ করার মাধ্যমে?

এখনো আপনারা বুঝতে পারছেন না যে, কেন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় তথা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই কেবল বন্ধ থাকছে? শপিং মল খোলা থাকলে উন্নয়নের মূল যে অর্থকড়ি তা নাচানাচি করতে থাকে। কিন্তু স্কুল-কলেজ খুললে নাচানাচি করবে শিশু-কিশোরবৃন্দ। সেই নাচানাচি থেকে মুদ্রা উত্তোলন সম্ভব হবে না।

শিশুদের স্বাস্থ্য বিষয়ে দুশ্চিন্তা? তাই নাকি? তাহলে আপনি তিন হাজারের টেস্টিং ব্যবস্থা চালু রাখেন? তাও কয়েকটা ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ‘অনুমোদন’ করার মাধ্যমে? তাহলে আপনি লাখের হিসাবে ভ্যাকসিন আনেন? আর সাফল্যের ঢোল ৪০ টিভি চ্যানেলে বাজান? তাহলে আপনি ভ্যাকসিন আনয়নকারী বণিককে কেবল ভ্যাকসিন হাতানোর জন্যই পয়সা আয়ের ব্যবস্থা করে দেন? তাহলে আপনি এখন পর্যন্ত একটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার রূপরেখা হাজির না করে থাকেন? তাহলে আপনি কেবল অমুক পার্টির লোকের বদনাম করার চাকরিতেই পার্টি-বুদ্ধিজীবীগুলোকে ব্যতিব্যস্ত রাখেন? তাহলে আপনি নতুন নতুন টেন্ডার যাতে কোতোয়ালে পেতে পারেন তার ব্যবস্থা করেন? তাহলে আপনি বিশ্বের সবচেয়ে দামি ব্রিজখানা (মাইল প্রতি হিসাবে) খালি বানাতেই থাকেন, বানাতেই থাকেন? (তোর সাবান কি স্লো নাকি রে!) লোকে ভয় পেতে পারেন! কিন্তু আপনার প্রজারা সব আহাম্মক ভাবার কোনোই কারণ ঘটেনি।

পাশের দেশে করোনা এসে বসত গাড়তে না গাড়তেই অনলাইন/পোর্টাল বিদ্যাকোম্পানিগুলো কিলবিল করে ব্যবসা শুরু করে দিয়েছে। ক্রিকেট দেখতে বসি বলে কয়েকটা নাম চোখস্থ হয়েছে—আনএকাডেমি, বাইজুস। অবশ্য কোনটা যে বিদ্যাকোম্পানি আর কোনটা যে জুয়াকোম্পানি ভুল হয়ে যায়। কারণ ওদের বিসিসিআই মহাধিপতি থেকে শুরু করে হেন বড় ক্রিকেটার নেই যারা ক্রিকেট জুয়ার সফটওয়্যার কোম্পানির মডেল নন।

ক্রিকেট চলতে থাকলে হয় গ্যাম্বলিং পোর্টাল না-হয় বিদ্যাকোম্পানির পোর্টালগুলোর বিজ্ঞাপন চলতে থাকে। ফলে মাথা আউলে যায় যে কোনটা কী কোম্পানি। কিন্তু একটু মন শান্ত হলে আলাদা করতে পারি অমুকটা হলো শিশুশিক্ষা বাণিজ্য সফটওয়্যার কোম্পানি, আর তমুকটা হলো অ্যাডাল্ট জুয়া সফটওয়্যার কোম্পানি। বাংলাদেশে এসবের কিছুই বিকশিত হয়নি এই দুই বছরে।

তবে বাংলাদেশ মোটের উপর মারাত্মক মূল্যবোধের দেশ। হয়তো ক্রীড়াভিত্তিক জুয়া এখানকার মূল্যবোধের চোটে ও চাপে দাঁড়াতে পারবে না। তবে শিশুশিক্ষার বিষয়ে এই দেশের প্রশাসকদের কোনোরকম অনীহা আছে তা প্রমাণ করা যাবে না। সেজন্য হয়তো শিশু ও কিশোরদের (ও তরুণ-তরুণীদের) শিক্ষাদানের জন্য শনৈঃ শনৈঃ সব সফটওয়্যার অপেক্ষা করে আছে।

ইউজিসি বলে অ্যাডাল্ট শিক্ষার্থীদের একটা প্রতিষ্ঠান আছে। হয়তো আপনারা জানেন। পুরা করোনার সময়টা ইউজিসি শিক্ষাদানে আধুনিক প্রযুক্তির আনয়নকারী হিসেবে গর্ববোধ করে গেছেন। আসলে করে চলেছেন। জুম বলে একটা সভাসমিতির সফটওয়্যার স্থানীয় দূত কর্তৃক ‘খরিদ’ বা ‘ভাড়া’ করেছেন বলে এই গর্ব তাদের। এটা এমনকি পাশ্চাত্যে প্রচলিত কোনো শিক্ষাদানকারী সফটওয়্যারও নয়।

যাহোক, তারা খরিদ করেছেন নাকি ভাড়া করেছেন তা বোঝা অতিশয় দুরূহ এক কাজ। বিডিরেন বলে স্থানীয় ওই কোম্পানিটার সাথে ইউজিসির কার কী সম্বন্ধ, কী চুক্তিতে কী কোথা থেকে কী রূপে কী-দামে খরিদ বা ভাড়া হচ্ছে—এসব বোঝার কদিন চেষ্টা করেছিলাম। খুবই কঠিন সেই গবেষণা! চালাতে পারিনি দীর্ঘক্ষণ।

হয়তো এসব ব্যবস্থার ঠিকঠাক মতো ঠিকাদার পাওয়া যাচ্ছে না বলেই এত দেরি! ঠিকাদার কথাটার মধ্যেই আছে ঠিকের সমাহার। ঠিক হয়ে যাবে নিশ্চয়ই শিগগিরই!

মানস চৌধুরী ।। অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়